যে বাড়িতে ফিরতেন তোফায়েল, সেখানে আজ স্মৃতির ভিড়

ছবি: আগামীর সময়
বাড়ির সামনে সেই চেনা পথ। বসার ঘরে সাজানো আসবাবপত্র, দেয়ালে টাঙানো ছবি আর জীবনের নানা স্মৃতি আজও আগের মতোই রয়েছে। তবু কোথাও যেন গভীর শূন্যতা। কারণ, নেই সেই মানুষটি, যার উপস্থিতিতে বছরের পর বছর প্রাণচাঞ্চল্যে মুখর থাকত পুরো বাড়ি, গ্রাম ও আশপাশের জনপদ।
ভোলা সদর উপজেলার দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের কোড়ালিয়া গ্রামের সেই বাড়িতেই জন্ম হয়েছিল বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, সাবেক শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রী এবং টানা নয়বারের সংসদ সদস্য তোফায়েল আহমেদের। সোমবার তার মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই বাড়িটি পরিণত হয়েছে শোকাহত মানুষের মিলনমেলায়।
দুপুরের পর থেকেই গ্রামের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ ভিড় করতে শুরু করেন বাড়ির সামনে। কেউ পারিবারিক কবরস্থানের পাশের খোলা মাঠে দাঁড়িয়ে স্মৃতিচারণ করছেন, কেউ নীরবে বসে আছেন গভীর বিষণ্নতায়। আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও ছুটে আসছেন প্রিয় নেতার বাড়িতে। তাদের অনেকের চোখে জল, কণ্ঠে আবেগ।
গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা শাহে আলম বলছিলেন, ছোটবেলা থেকে তাকে দেখেছি। এত বড় নেতা হয়েও গ্রামের মানুষের খোঁজখবর নিতে ভুলতেন না। আজ মনে হচ্ছে আমরা পরিবারের একজন অভিভাবককে হারালাম।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. সিরাজ স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি জানান, যখনই এলাকায় আসতেন, সবার সঙ্গে কথা বলতেন। আমাদের সুখ-দুঃখের খবর নিতেন। এমন মানুষ আর হবে না।
বাড়ির সামনে দাঁড়িয়ে থাকা আওয়ামী লীগের এক কর্মী বললেন, আমরা শুধু একজন নেতাকে হারাইনি, একজন অভিভাবককে হারিয়েছি। তার নির্দেশনা আর সাহস আমাদের রাজনৈতিক জীবনের বড় শক্তি ছিল।
স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। কেউ এলাকার উন্নয়নে তার অবদানের কথা বলছেন, কেউ শোনাচ্ছেন ব্যক্তিগত স্মৃতির গল্প। তাদের কথায় বারবার উঠে আসছে একজন সহজ-সরল, জনবান্ধব ও মানুষের প্রতি নিবেদিতপ্রাণ রাজনীতিকের প্রতিচ্ছবি।
১৯৪৩ সালের ২২ অক্টোবর ভোলার কোড়ালিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন তোফায়েল আহমেদ। ছাত্রজীবন থেকেই রাজনীতিতে সক্রিয় হয়ে ওঠেন তিনি। ১৯৬৯ সালের গণঅভ্যুত্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে জাতীয় রাজনীতিতে পরিচিতি লাভ করেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনিষ্ঠ সহচর হিসেবে স্বাধীনতা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধেও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে শিল্প ও বাণিজ্যমন্ত্রীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করলেও নিজের জন্মভূমি ভোলার প্রতি তার ছিল গভীর টান। শিক্ষা, নদীভাঙন প্রতিরোধ, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন এবং বিভিন্ন সামাজিক উদ্যোগের মাধ্যমে জেলার উন্নয়নে তিনি রেখে গেছেন উল্লেখযোগ্য অবদান।
সন্ধ্যা নেমে এলেও কোড়ালিয়ার সেই বাড়িতে মানুষের আনাগোনা থামেনি। কেউ নীরবে দাঁড়িয়ে আছেন, কেউ ফিরে যাচ্ছেন স্মৃতির পাতায়। আর বাড়ির প্রতিটি কোণ যেন নিঃশব্দে জানিয়ে দিচ্ছে, সবকিছুই আছে, শুধু তিনি নেই।




