তিন বছরেও খোলেনি শান্তিনিবাসের তালা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
অসহায় প্রবীণ নারীদের নিরাপদ আশ্রয়স্থল হওয়ার কথা ছিল ভবনটি। থাকার ব্যবস্থা, চিকিৎসাসেবা, শরীরচর্চা, প্রার্থনা ও বই পড়ার জন্য ছিল আলাদা আয়োজন। কিন্তু নির্মাণ শেষ হওয়ার তিন বছর পেরিয়ে গেলেও সেখানে ঠাঁই হয়নি একজন নারীরও। উল্টো বিদ্যুৎ বিল বকেয়া থাকায় বিচ্ছিন্ন হয়েছে সংযোগ, বন্ধ লিফট। তালাবদ্ধ কক্ষগুলোতে ধুলার আস্তর জমেছে, অব্যবহৃত পড়ে থেকে নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছে আসবাব ও চিকিৎসা সরঞ্জাম। লালমনিরহাটে ৮ কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে নির্মিত ‘শান্তিনিবাস’ এখন যেন প্রবীণ নারীদের আশ্রয়কেন্দ্র নয়, অবহেলার এক নিদর্শন।
লালমনিরহাট শহরের ডিসি রোডের বালাটারী এলাকায় সরকারি শিশু পরিবার (বালিকা) ক্যাম্পাসে প্রায় ৩০ শতক জমির ওপর নির্মাণ করা হয়েছে তিনতলা ভবনটি। বাইরে থেকে দেখলে আধুনিক স্থাপত্যের দৃষ্টিনন্দন ভবন। ভেতরে রয়েছে লিফট, শয্যাকক্ষ, প্রার্থনার জায়গা, বই পড়ার কক্ষ, শরীরচর্চার যন্ত্রপাতি ও স্বাস্থ্যসেবার ব্যবস্থা। এখানে থাকার কথা ছিল ষাটোর্ধ্ব ২৫ জন অসহায় প্রবীণ নারীর। কিন্তু নির্মাণের তিন বছর পার হলেও চালু হয়নি প্রতিষ্ঠানটি।
স্থানীয়রা বলছেন, ভবনের সব কক্ষ তালাবদ্ধ। নিচতলার বড় ডাইনিং রুমে পড়ে আছে আসবাব। শরীরচর্চার যন্ত্রপাতি ও স্বাস্থ্যসেবা কর্নারের চিকিৎসা সরঞ্জাম অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। বিদ্যুৎ না থাকায় পুরো ভবনে বিরাজ করছে অন্ধকার। দীর্ঘদিন পরিচর্যা না হওয়ায় বিভিন্ন কক্ষে ধুলার আস্তর জমেছে। বাসা বেঁধেছে মাকড়সা ও পোকামাকড়।
শুধু অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকাই নয়, ভবনটির রক্ষণাবেক্ষণেও দেখা দিয়েছে সংকট। বিদ্যুৎ বিল বকেয়া থাকায় সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে। লিফট পরিচালনার চুক্তির মেয়াদও শেষ। প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় নিয়মিত পরিচর্যা ও কার্যক্রম পরিচালনার ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি। ফলে সরকারি অর্থে নির্মিত অবকাঠামোর পাশাপাশি সেখানে থাকা মূল্যবান সরঞ্জামও নষ্ট হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে।
জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের তথ্য বলছে, অসহায়, পরিত্যক্ত ও অবহেলিত প্রবীণ নারীদের নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করতে ২০২২ সালের ১৬ আগস্ট শান্তিনিবাস নির্মাণের কাজ শুরু হয়। ৮ কোটি ১ লাখ ৪১ হাজার ৩২৯ টাকা ব্যয়ে ২০২৩ সালে নির্মাণকাজ শেষ হয়। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের আওতায় সমাজসেবা অধিদপ্তরের একটি প্রকল্পের অংশ হিসেবে দেশের আটটি বিভাগে সরকারি শিশু পরিবারের অভ্যন্তরে আটটি শান্তিনিবাস নির্মাণ করা হয়। রংপুর বিভাগের শান্তিনিবাসটি নির্মিত হয়েছে লালমনিরহাটে। প্রকল্পটির উদ্দেশ্য ছিল অসহায় ও আশ্রয়হীন প্রবীণ নারীদের আবাসন এবং প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করা। তবে অবকাঠামো নির্মাণ শেষ হলেও প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় জনবল নিয়োগ করা হয়নি। ফলে প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্যই এখনো বাস্তবায়িত হয়নি।
শান্তিনিবাসের দেখভালের দায়িত্বে রয়েছেন লালমনিরহাট সরকারি শিশু পরিবারের (বালিকা) উপতত্ত্বাবধায়ক মোছা. হাওয়া বেগম। মূল দায়িত্বের পাশাপাশি অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে তাকে ভবনটির দেখভাল করতে হচ্ছে।
হাওয়া বেগমের ভাষায়, সরকারি শিশু পরিবারের ক্যাম্পাসে শান্তিনিবাসের ভবনটি নির্মিত হয়েছে। প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় এটি চালু করা সম্ভব হয়নি। তাই অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে তিনি ভবনটির দেখভাল করছেন।
জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক ফজলুল হকের ভাষ্য, শান্তিনিবাসের জন্য পদ সৃজনের কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে। তার আশা, পদ সৃজন হলে দ্রুত প্রতিষ্ঠানটি চালু করা যাবে। তবে কবে নাগাদ জনবল নিয়োগ সম্পন্ন হবে এবং প্রবীণ নারীদের জন্য আবাসন ও সেবা কার্যক্রম শুরু হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সময়সীমা জানাতে পারেননি তিনি।
নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার পরও প্রতিষ্ঠানটি চালু না হওয়ায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) লালমনিরহাট জেলা শাখার সহসভাপতি ও সহকারী অধ্যাপক আবু হাসনাত রানা। তিনি বললেন, ‘নির্মাণের তিন বছর পার হলেও প্রতিষ্ঠানটি চালু করা যায়নি।’ তার মতে, জনগণের করের টাকায় নির্মিত ভবন কেন ব্যবহার করা যাচ্ছে না, তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, অসহায় প্রবীণ নারীদের নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে নির্মিত শান্তিনিবাসটি কবে চালু হবে, তা এখনো অনিশ্চিত। জনবল নিয়োগের অপেক্ষায় থাকা এই ভবনে যতদিন কার্যক্রম শুরু না হবে, ততদিন অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থাকবে সরকারি অর্থে নির্মিত অবকাঠামো ও চিকিৎসা সরঞ্জাম।
যদিও শান্তিনিবাস চালুর বিষয়ে আশ্বস্ত করেছেন লালমনিরহাটের জেলা প্রশাসক রাশেদুল হক প্রধান। তার ভাষায়, শান্তিনিবাসের বিষয়টি তিনি অবগত আছেন। প্রয়োজনীয় জনবল চেয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হবে।




