সেন্টমার্টিনে পর্যটক ওঠানামার জেটি ঝুঁকিপূর্ণ, মেরামত হয়নি পন্টুনও
- ১ নভেম্বর শুরু হচ্ছে পর্যটন মৌসুম
- প্রতিদিন যেতে পারবেন সাড়ে ৩ হাজার পর্যটক

সেন্টমার্টিনে নামছেন পর্যটকরা। ফাইল ছবি
পন্টুনের বিভিন্ন অংশে মরিচা ধরেছে। কোথাও কোথাও তৈরি হয়েছে গর্ত। জাহাজ ভেড়ানোর এই কাঠামোর বেহাল দশা নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন সেন্টমার্টিন দ্বীপের বাসিন্দা ও পর্যটন ব্যবসায়ীরা। তাদের আশঙ্কা, ঝুঁকিপূর্ণ পন্টুন দিয়ে পর্যটকদের ওঠানামা করাতে গিয়ে যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। অথচ আগামী ১ নভেম্বর থেকে দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপটিতে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল শুরুর কথা। পর্যটন মৌসুম সামনে রেখে হোটেল-রিসোর্টগুলো প্রস্তুত করা হলেও যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা কাটেনি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, জেটির পন্টুনের বিভিন্ন স্থানে মরিচা ধরে গর্ত তৈরি হয়েছে। পর্যটন মৌসুমে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক মানুষের যাতায়াতের চাপ সামলাতে হলে কাঠামোটি দ্রুত মেরামত করা প্রয়োজন। তাদের মতে, পর্যটকদের জন্য দ্বীপের দুয়ার খোলার আগে জেটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।
দ্বীপের বাসিন্দা তৈয়ব উল্লাহ বললেন, ‘দীর্ঘদিন পর পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল শুরু হতে যাচ্ছে। কিন্তু জাহাজ ভেড়ানোর পন্টুনের অবস্থা ভালো নয়। পর্যটন মৌসুম শুরুর আগেই এটি মেরামত করা দরকার।’ জেটি নির্মাণের কাজেও অনিয়ম হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান ফয়েজুল ইসলামের আশঙ্কা, ‘দ্বীপের দুই শতাধিক হোটেল, মোটেল ও রেস্তোরাঁয় মেরামত ও সাজসজ্জার কাজ চলছে। আগামী ১ নভেম্বর জাহাজ চলাচল শুরুর আগেই জেটির পন্টুন মেরামত করা জরুরি। তা না হলে পর্যটকদের ওঠানামার সময় দুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকে যাবে।’
কক্সবাজার জেলা পরিষদের সহকারী প্রকৌশলী মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন বলছেন, প্রায় সাত কোটি টাকা ব্যয়ে জেটি নির্মাণের কাজ চলছে। আগামী ডিসেম্বরে কাজ শেষ হওয়ার কথা। কিছু কাজ এখনো বাকি থাকলেও পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল শুরুর আগেই প্ল্যাটফর্মের কাজ শেষ করার চেষ্টা করা হবে, যাতে পর্যটকদের ভোগান্তি না হয়। জেটি নির্মাণে অনিয়মের অভিযোগও খতিয়ে দেখা হবে।
পর্যটন চালু, প্রতিদিন যেতে পারবেন সাড়ে ৩ হাজার মানুষ
সরকারের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী ১ নভেম্বর থেকে ২০২৭ সালের ১৫ মার্চ পর্যন্ত সেন্টমার্টিনে পর্যটক যাতায়াতের অনুমতি দেওয়া হয়েছে। এ সময়ে প্রতিদিন সর্বোচ্চ সাড়ে ৩ হাজার পর্যটক দ্বীপে যেতে পারবেন। প্রত্যেক পর্যটককে দিতে হবে ১০০ টাকা পরিবেশ সংরক্ষণ ফি। এ ছাড়া দ্বীপে রাত্রিযাপনের সুযোগও থাকছে।
গতকাল রবিবার পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের পরিবেশ-২ শাখা থেকে জারি করা এক চিঠিতে সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে এ সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের নির্দেশ দেওয়া হয়। সিনিয়র সহকারী সচিব সাবরীনা রহমান স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বলা হয়, গত ১২ অক্টোবর পরিবেশমন্ত্রী আবদুল আউয়াল মিন্টুর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত আন্তমন্ত্রণালয় সভায় এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, কক্সবাজার শহরের নুনিয়ারছড়া ঘাট থেকে অনুমোদিত পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল করবে। পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন ছাড়া বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ও নৌপরিবহন অধিদপ্তর সেন্টমার্টিনে চলাচলের জন্য কোনো নৌযানকে অনুমতি দিতে পারবে না। পরিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইসিএ) ব্যবস্থাপনা বিধিমালার ২৬ বিধি অনুযায়ী পরিবেশ সংরক্ষণ ফি আদায় করবে পরিবেশ অধিদপ্তর। ২০২৫ সালের ২২ অক্টোবর জারি করা প্রজ্ঞাপনের অন্যান্য নির্দেশনাও বহাল থাকবে।
আগের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, নভেম্বরে দিনে গিয়ে দিনে ফেরার ব্যবস্থা ছিল। ডিসেম্বর ও জানুয়ারিতে রাত্রিযাপনের সুযোগ এবং প্রতিদিন সর্বোচ্চ দুই হাজার পর্যটক যাওয়ার বিধান ছিল। ফেব্রুয়ারি থেকে বছরের বাকি সময় পর্যটন বন্ধ রাখার নির্দেশনাও ছিল। নতুন সিদ্ধান্তে পর্যটন মৌসুম ১৫ মার্চ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে এবং দৈনিক পর্যটকের সীমা দুই হাজার থেকে বাড়িয়ে সাড়ে তিন হাজার করা হয়েছে।
পর্যটন ঘিরে নতুন আশায় ব্যবসায়ীরা
পর্যটন চালুর সিদ্ধান্তে দ্বীপের ব্যবসায়ীদের মধ্যে নতুন করে আশার সঞ্চার হয়েছে। দীর্ঘদিন পর্যটকের প্রবেশ সীমিত থাকা এবং রাত্রিযাপনের সুযোগ বন্ধ থাকায় হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ ও নৌপরিবহন ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের আয় কমে যায়। নতুন মৌসুম সামনে রেখে দ্বীপের আবাসিক হোটেল ও রিসোর্টগুলোতে চলছে মেরামত, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও সাজসজ্জার কাজ।
সেন্টমার্টিনের একটি রিসোর্টের পরিচালক ও পর্যটন ব্যবসায়ী খায়রুল আলম জানালেন, দীর্ঘদিন পর্যটন কার্যক্রম বন্ধ থাকায় তার রিসোর্টের কাঠের কাঠামো ও ছাউনি ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। দীর্ঘ সময় ব্যবহার না করায় বিভিন্ন স্থাপনাও নষ্ট হয়েছে। এখন সেগুলো মেরামত করা হচ্ছে।
খায়রুল আলম বললেন, ‘পর্যটন মৌসুমের আয় দিয়ে আমাদের সারা বছর চলতে হয়। রাত্রিযাপনের অনুমতি ও সময় বৃদ্ধির কারণে আমরা খুশি। আমরা ইতিমধ্যে বুকিংয়ের সাড়া পাচ্ছি।’
দ্বীপের গলাচিপা এলাকার একটি রিসোর্টের সাজসজ্জার জন্য জনবল নিয়োগের আবেদন করেছেন ঢাকার মিরপুরের ব্যবসায়ী আমিনুল ইসলাম। তিনি বলছেন, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় রিসোর্টের বাঁশের ছাউনি ও বেড়া পরিবর্তন করতে হচ্ছে। পাশাপাশি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার কাজও চলছে। পর্যটন মৌসুম সামনে রেখে প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে। ইতিমধ্যে বুকিংও পাওয়া যাচ্ছে।
স্থানীয় প্রশাসন সূত্র জানিয়েছে, হোটেল-মোটেল ও রেস্তোরাঁর সংস্কারকাজের জন্য শ্রমিক নিয়োগের অনুমতি চেয়ে চলতি মাসে টেকনাফ উপজেলা প্রশাসনে তিন শতাধিক আবেদন জমা পড়েছে। যাচাই-বাছাই করে এসব আবেদনের বিষয়ে অনুমতি দেওয়া হচ্ছে। দ্বীপে ছোট-বড় মিলিয়ে দুই শতাধিক আবাসিক হোটেল রয়েছে।
সেন্টমার্টিন হোটেল মালিক-ব্যবসায়ী সমিতির নেতা আব্দুর রহমানের মতে, পর্যটকদের আগমন শুরু হলে দ্বীপের ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি ফিরবে। এতে পর্যটননির্ভর স্থানীয় মানুষের মধ্যেও স্বস্তি ফিরে আসবে বলে তারা আশা করছেন।
পরিবেশ রক্ষার চ্যালেঞ্জ
পর্যটন চালুর পাশাপাশি দ্বীপের পরিবেশ সংরক্ষণেও প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয় প্রশাসনের কর্মকর্তারা। টেকনাফের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম অনীক চৌধুরী বলেছেন, পর্যটন মৌসুমে দ্বীপের পরিবেশ রক্ষায় ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে। পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমসহ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কামরুল হাসান বললেন, পর্যটন মৌসুমে সেন্টমার্টিনের পরিবেশ যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সে জন্য সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখা হবে। পর্যটকেরা যাতে পলিথিনসহ পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর পণ্য দ্বীপে বহন না করেন, সে বিষয়েও তাদের নিরুৎসাহিত করা হবে।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) কক্সবাজারের সাংগঠনিক সম্পাদক এইচ এম নজরুল ইসলামের মতে, সেন্টমার্টিন শুধু পর্যটনের আকর্ষণ নয়, সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যেরও গুরুত্বপূর্ণ আবাসস্থল। অতিরিক্ত পর্যটকের চাপ, দুর্বল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও অনিয়ন্ত্রিত নৌযান চলাচল দ্বীপটির পরিবেশের জন্য উদ্বেগের কারণ।
এইচ এম নজরুল ইসলাম দাবি করেন, পর্যটকের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও পরিবেশ সংরক্ষণ ফি চালুর পাশাপাশি নিয়মের কার্যকর প্রয়োগ, নিরাপদ জেটি এবং বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি।
পর্যটননির্ভর মানুষের জীবিকা ও প্রবাল দ্বীপের ভঙ্গুর পরিবেশের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জের সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে যাত্রীদের নিরাপত্তার প্রশ্ন। আগামী ১ নভেম্বর পর্যটকদের জন্য দ্বীপের দুয়ার খোলার আগে জেটির পন্টুনের মেরামত কতটা নিশ্চিত করা যায়, সেটিই এখন স্থানীয় বাসিন্দা ও ব্যবসায়ীদের প্রধান উদ্বেগ।



