ফুলবাড়িয়া
ফ্যামিলি কার্ডের প্রলোভনে টিপসই নিয়ে ভুয়া কাবিননামা, থানায় অভিযোগ

ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়ায় ফ্যামিলি কার্ড করে দেওয়ার কথা বলে এক বিধবা নারীর টিপসই নিয়ে এফিডেভিট ও ভুয়া কাবিননামা তৈরির অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় স্থানীয় দুই ব্যক্তি আব্দুছ ছাত্তার ও আব্দুল কদ্দুছের বিরুদ্ধে ফুলবাড়িয়া থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগী আছিয়া বেগম (৪৫)। অভিযোগ পাওয়ার পর শুক্রবার তদন্ত শুরু করেছে পুলিশ।
গত ৬ অক্টোবর ‘আগামীর সময়’ এ ঘটনায় সংবাদ প্রকাশের পর এলাকায় আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়। পরে বিষয়টি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। এর পর থেকে অভিযুক্ত দুজন গ্রাম ছেড়ে আত্মগোপনে রয়েছেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
অভিযোগকারী আছিয়া বেগম উপজেলার পুটিজানা ইউনিয়নের পাটুলী গ্রামের বাসিন্দা। প্রায় ১২ বছর আগে তার স্বামীর মৃত্যু হয়। পাঁচ সন্তানের জননী আছিয়ার তিন ছেলের বিয়ে হয়েছে। তার নাতি-নাতনিও রয়েছে। ছোট ছেলের বয়স ১৩ বছর। বিভিন্ন সময়ে বিয়ের প্রস্তাব এলেও তিনি তাতে রাজি হননি।
স্থানীয় সূত্র ও আছিয়া বেগমের অভিযোগ অনুযায়ী, তার দ্বিতীয় ছেলে আসাদুলের বিয়ের সময় প্রায় চার বছর আগে প্রতিবেশী আব্দুল কদ্দুছকে উকিল করা হয়। আত্মীয়তার সূত্রে কদ্দুছ প্রায়ই তাদের বাড়িতে যাতায়াত করতেন। একপর্যায়ে তিনি স্থানীয় জামায়াত নেতা আব্দুছ ছাত্তারের মাধ্যমে আছিয়াকে বিয়ের প্রস্তাব দেন। তবে প্রতিবারই তিনি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করেন।
আছিয়ার অভিযোগ, প্রায় দেড় মাস আগে ফ্যামিলি কার্ড করে দেওয়ার কথা বলে ছাত্তার তাকে কৌশলে নিজের দোকানে নিয়ে যান। সেখানে তার জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি ও পাসপোর্ট আকারের ছবি নেওয়া হয়। কয়েক দিন পর আবার দোকানে ডেকে নিয়ে সাদা কাগজে তার দুটি টিপসই নেওয়া হয়।
সম্প্রতি আছিয়া বেগম ও আব্দুল কদ্দুছের বিয়ে হয়েছে দাবি করে একটি এফিডেভিট ও কাবিননামা দেখিয়ে এলাকায় প্রচার করা হয়। বিষয়টি জানার পর আছিয়া স্থানীয় মসজিদে বিচার চান। গত সোমবার সন্ধ্যায় পাটুলী গ্রামে তার বাড়িতে সালিস বৈঠক হয়। সেখানে আছিয়ার বক্তব্য শোনেন উপস্থিত ব্যক্তিরা। অভিযুক্ত ছাত্তার উপস্থিত না থাকায় বুধবার আবারও বৈঠকের দিন ধার্য করা হয়। তবে সেদিনও তিনি উপস্থিত হননি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বিয়ের প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় আছিয়াকে ফ্যামিলি কার্ডের প্রলোভন দেখিয়ে তার জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি ও টিপসই সংগ্রহ করা হয়। পরে সেগুলো ব্যবহার করে এফিডেভিট ও কাবিননামা তৈরি করা হয়েছে। কাবিননামায় দেনমোহর ২ লাখ ৫০ হাজার টাকা নির্ধারণ এবং নগদ ৫০ হাজার টাকা পরিশোধের কথা উল্লেখ রয়েছে। এতে আব্দুল মান্নান ও সাইফুল ইসলামকে সাক্ষী হিসেবে দেখানো হয়েছে। তবে তাদের কেউই এ বিষয়ে জানেন না বলে স্থানীয় সূত্রে দাবি করা হয়েছে।
এ ঘটনায় ছাত্তারের পাশাপাশি আরেক জামায়াত নেতা আব্দুল হেকিম মাস্টারেরও সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় কয়েকজন। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
আছিয়া বেগম অভিযোগ করেছেন, এ ঘটনায় তার সামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়েছে। তিনি বলেন, ফ্যামিলি কার্ড করে দেওয়ার কথা বলে একদিন ছাত্তার আমার জাতীয় পরিচয়পত্রের ফটোকপি ও ছবি নেন। আরেক দিন ফোন করে তার দোকানে নিয়ে কাগজে দুটি টিপসই নেন। এখন গ্রামে প্রচার করা হচ্ছে, কদ্দুছ আমাকে বিয়ে করেছেন। আমার পাঁচ সন্তান ও নাতি-নাতনি রয়েছে। গ্রামে মানুষের সামনে মুখ দেখাতে পারছি না। এ ঘটনায় দুজনকে আসামি করে থানায় অভিযোগ দিয়েছি। তাঁদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।
ফুলবাড়িয়া পৌরসভার ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের নিকাহ রেজিস্ট্রার মো. গোলাম মোস্তফা দাবি করেছেন, কাবিননামায় তার নম্বর, সিল ও স্বাক্ষর জাল করা হয়ে থাকতে পারে। এ বিষয়ে তিনি কিছুই জানেন না।
উপজেলা জামায়াতে ইসলামীর আমির মাওলানা ফজলুল হক শামীম বলেছেন, অভিযুক্ত ছাত্তারের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামীর কোনো সম্পর্ক নেই। নির্বাচনের সময় অনেকে দাঁড়িপাল্লার পক্ষে কাজ করেছেন, ছাত্তারও হয়তো তাঁদের একজন ছিলেন।
অভিযুক্ত আব্দুছ ছাত্তার আত্মগোপনে থাকায় তার বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে তিনি দাবি করেছেন, ফ্যামিলি কার্ডের কথা বলে বিধবা নারীর কাবিননামা তৈরির সঙ্গে তিনি জড়িত নন। তাকে ফাঁসানো হয়েছে। অভিযুক্ত আব্দুল কদ্দুছের মুঠোফোনও বন্ধ পাওয়া গেছে।
ফুলবাড়িয়া থানার ওসি রাশেদুল হাসান বলেছেন, ফ্যামিলি কার্ড করে দেওয়ার কথা বলে এক বিধবা নারীর টিপসই নিয়ে কাবিননামা তৈরির অভিযোগে আছিয়া বেগম দুই ব্যক্তির বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। তদন্ত শেষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



