সাতক্ষীরায় লবণাক্ত ঘেরের পাড়ে তরমুজের চাষ

সাতক্ষীরায় লোনা পানির মাছের ঘেরের পাড়ে চাষ হচ্ছে তরমুজ। ছবি: আগামীর সময়
সাতক্ষীরায় লোনা পানির মাছের ঘেরের পাড়ে চাষ হচ্ছে তরমুজ, করলা, বরবটি ও শসা। একসময় অনাবাদি পড়ে থাকা এসব জমি এখন কৃষকদের বাড়তি আয়ের উৎস হয়ে উঠেছে। জলবায়ু পরিবর্তন, মাটির লবণাক্ততা ও মিঠা পানির সংকটের মধ্যেও এ অঞ্চলের কৃষকরা ঘেরের উঁচু পাড়ে অসময়ের তরমুজ ও সবজি চাষ করে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে সাতক্ষীরার সাতটি উপজেলায় প্রায় ১৪১ হেক্টর জমিতে অসময়ের তরমুজ চাষ হয়েছে। গত মৌসুমের তুলনায় এ বছর চাষের পরিমাণ বেড়েছে প্রায় ৬৫ হেক্টর। কৃষি বিভাগের পরামর্শ ও আধুনিক প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে লবণাক্ত উপকূলের অনাবাদি জমিতে এখন বিভিন্ন জাতের তরমুজ ও সবজি উৎপাদন করছেন কৃষকরা।
তালা উপজেলার নগরঘাটা ইউনিয়নে ঘুরে দেখা গেছে, মাছের ঘেরের পাড়ে মাচা তৈরি করে তরমুজ ও বিভিন্ন সবজি চাষ করছেন কৃষকরা। তারা জানালেন, চৈত্র-বৈশাখ মাসে কোনো কোনো এলাকায় পানির লবণাক্ততা ১২ থেকে ১৫ পিপিটি পর্যন্ত পৌঁছায়। এমন পরিস্থিতিতে প্রচলিত পদ্ধতিতে ফসল উৎপাদন কঠিন হলেও উন্নত জাতের বীজ ও আধুনিক পরিচর্যা পদ্ধতি ব্যবহার করে সাফল্য পাচ্ছেন।
কৃষক নিরঞ্জন বলেছেন, লোনা পানির ঘেরের পাড়ে ফসল উৎপাদন করা সম্ভব, এমন ধারণা আগে কারও ছিল না। কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শে উন্নত জাতের বীজ ও পরিচর্যা পদ্ধতি অনুসরণ করে তরমুজের পাশাপাশি করলা, বরবটি ও ঢেঁড়সের ভালো ফলন পেয়েছি।
আরেক কৃষক কৃষ্ণ মণ্ডল মাছ চাষের পাশাপাশি ঘেরের পাড়ে তরমুজ আবাদ করে এরই মধ্যে প্রায় এক লাখ টাকার তরমুজ বিক্রি করেছেন। জমিতে থাকা অবশিষ্ট ফসল থেকে আরও দেড় লাখ টাকা আয়ের আশা করছেন তিনি।
কৃষি কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, সমতল জমিতে প্রতি বিঘা তরমুজ চাষে খরচ হয় ৪০ থেকে ৪৫ হাজার টাকা। বাজারদর ভালো থাকলে উৎপাদিত তরমুজ বিক্রি করে দেড় থেকে দুই লাখ টাকা পর্যন্ত আয় হতে পারে। সাতক্ষীরার বিভিন্ন এলাকায় বর্তমানে সুপ্রিম হানি, ব্ল্যাক বেবি, তৃপ্তি, সুগারকুইন ও বাংলা লিংক জাতের তরমুজ চাষ হচ্ছে।
এ চাষে যুক্ত হয়েছেন স্থানীয় নারীরাও। চারা রোপণ, মাচা তৈরি ও ফল সংগ্রহসহ বিভিন্ন কাজে তাদের অংশগ্রহণ রয়েছে। ঘেরের পাড়ে তরমুজ চাষ বাড়ায় স্থানীয় শ্রমিকদেরও কাজের সুযোগ তৈরি হয়েছে। এক দিনমজুর জানিয়েছেন, এ কাজে প্রতিদিন প্রায় ৫০০ টাকা মজুরি পাচ্ছেন তিনি।
তালা উপজেলার তেঁতুলিয়া ইউনিয়নেও ছড়িয়ে পড়েছে অসময়ের তরমুজ চাষ। বেসরকারি সংস্থা উন্নয়ন প্রচেষ্টার কৃষিবিদ নয়ন হোসেন জানিয়েছেন, পিকেএসএফের সহযোগিতায় পরিচালিত প্রকল্পের আওতায় ২১ জন কৃষক ২৮ বিঘা জমিতে আধুনিক মালচিং পদ্ধতিতে তরমুজ চাষ করছেন। এতে তারা লাভবান হচ্ছেন।
সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) কৃষিবিদ ইকবাল আহমেদ জানিয়েছেন, ২০২০ সাল থেকে প্রদর্শনী ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে গ্রীষ্মকালীন তরমুজ চাষ সম্প্রসারণে কাজ করছে কৃষি বিভাগ। তবে অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও আবহাওয়ার আকস্মিক পরিবর্তন এ চাষের জন্য ঝুঁকি তৈরি করছে। এসব ঝুঁকি মোকাবিলায় টেকসই সেচব্যবস্থা ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।




