রংপুরে ৪ খুন : পুলিশের এবারের ব্রিফিংয়ে বদলে গেল যেসব তথ্য

রংপুরের চার খুন নিয়ে আরএমপির ব্রিফিং। ছবি: আগামীর সময়
রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী ও তার স্ত্রী-সন্তানদের হত্যা ঘিরে পুলিশের নানা ভাষ্য ব্যাপক সমালোচিত হচ্ছে ফেসবুকে। লাশ উদ্ধারের পরদিনই আসামি গ্রেপ্তার ও রংপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের প্রেস ব্রিফিংয়ে ‘খুনের রহস্য উদঘাটনের’ বর্ণনা থেকেই আলোচনার সূত্রপাত। তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের একের পর এক তথ্যে পাল্টা প্রশ্ন ছুড়ে দিচ্ছিলেন ফেসবুকাররা।
এসবের মধ্যে ফের সংবাদ সম্মেলনে এলেন আরএমপির সদ্য বদলি হওয়া ‘আলোচিত’ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ। আজ সকালে ডাকা সংবাদ সম্মেলনে মূলত গ্রেপ্তার আসামিদের আদালতে দেওয়া জবানবন্দি তুলে ধরেছেন তিনি। পুলিশকে দেওয়া প্রাথমিক বর্ণনার সঙ্গে আদালতে আসামিদের দেওয়া জবানবন্দিতে কিছু অমিল আছে বলে জানালেন এই কর্মকর্তা।
আজ বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে সংবাদ সম্মেলনে ডাকে আরএমপি। কমিশনার আবদুল মাবুদ বললেন, ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক পরীক্ষায় গণপতির স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ও মেয়ে আগামী চক্রবর্তীকে ধর্ষণের আলামত মেলেনি। শ্বাসরোধেই হত্যা করা হয়েছে প্রত্যেককে।
এরপর আদালতে আসামি মুগ্ধ, সিদ্ধার্থ ও সাক্ষীদের দেওয়া জবানবন্দি তুলে ধরেন এই কর্মকর্তা। মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থের ‘নতুন বর্ণনা’ অনুযায়ী, গত ২০ আগস্ট বৃহস্পতিবার রাতে সীমান্তের বাসায় ঘুমাতে যান সিদ্ধার্থ। সীমান্তর বাসা গণপতির বাড়ির কাছেই।
রাত ১২টার পর বের হয়ে ইয়াবা কিনে মুগ্ধকে সঙ্গে নিয়ে সীমান্তের বাসায় ফেরেন সিদ্ধার্থ। সেখানে দুজন মিলে তিনটি ইয়াবা সেবন করেন।
রাত ৩টার দিকে আরও ইয়াবার জন্য তারা এলাকার মাদক কারবারি শান্তর সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করেন। দুজন গিয়ে আরও চারটি ইয়াবা সংগ্রহ করেন। বিনিময়ে নিজেদের মোবাইল ফোন শান্তর কাছে জমা রাখেন।
এরপর প্রথমে তারা গণপতির পাশের বাড়ির ছাদে ওঠেন। সেটি খোলামেলা থাকায় ইয়াবা সেবনের উপযোগী মনে হয়নি। দুজন তখন ছাদ টপকে গণপতির ছাদে এসে পানির ট্যাংকির আড়ালে বসে ইয়াবা সেবন করতে শুরু করেন। তখন প্রায় শুক্রবার ভোর।
গণপতি পায়চারি করতে বাড়ির ছাদে উঠলে মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থকে দেখে ‘বকাঝকা’ করেন। বিষয়টি জানাজানি হওয়ার শঙ্কায় তারা গামছা গলায় পেঁচিয়ে গণপতিকে হত্যা করেন। ধস্তাধস্তির আওয়াজে ছাদে চলে আসেন গণপতির স্ত্রী ও মেয়ে। তখন একই সময় মুগ্ধ প্রীতিলতাকে ও সিদ্ধার্থ আগামীকে হত্যার জন্য গলায় কাপড় পেঁচিয়ে ধরেন।
প্রীতিলতা মারা গেলেও আগামী তখনো বেঁচে ছিলেন। পরে ছাদে একটি রশি গলায় পেঁচিয়ে আগামীর মৃত্যু নিশ্চিত করেন সিদ্ধার্থ। গণপতির দেহ লুকানো হয় পানির ট্যাংকির পেছনে। তার স্ত্রী ও মেয়ের মরদেহ টেনে ছাদ থেকে সরিয়ে সিঁড়িঘরের দিকে নিয়ে রাখেন আসামিরা। তবে প্রথম ব্রিফিংয়ে পুলিশ বলেছিল, গণপতিকে হত্যার পর প্রথমে স্ত্রীকে ও পরে মেয়েকে সিঁড়িতে হত্যা করা হয়।
আরএমপি কমিশনার আজ বললেন, বাসায় সিসিটিভি ক্যামেরা থাকতে পারে- এই শঙ্কায় নিচতলায় নেমে বিদ্যুতের লাইন বিচ্ছিন্ন করেন আসামিরা। এরপর ঘটনাটিকে ডাকাতি হিসেবে দেখাতে গণপতির ঘরে ঢোকেন তারা। তখনই ঘুম থেকে উঠে সিদ্ধার্থকে দেখে ডাক দেন গণপতির ছোট ছেলে প্রিয়ম চক্রবর্তী। তাকেও গলায় কাপড় পেঁচিয়ে হত্যা করেন সিদ্ধার্থ।
প্রথম ব্রিফিংয়ে কমিশনার বলেছিলেন, শিশুটিকে ঘুমন্ত অবস্থায় বালিশচাপা দিয়ে হত্যা করা হয়।
আজ তিনি বললেন, এরপর আসামিরা আসবাবপত্র তছনছ করেন। কিছু স্বর্ণালংকার ও ১৫ হাজার টাকা সঙ্গে নেন। ঘরে বসে আবার ইয়াবা সেবন করেন দুজন। জুমার সময় ছাদ টপকে পালিয়ে যান তারা। স্বর্ণালংকার এলাকার আরেকটি বাড়ির পেছনে মাটির নিচে লুকিয়ে রাখেন। ১৫ হাজার টাকা ইয়াবা কারবারিকে দিয়ে নিজেদের মোবাইল ফোন ফেরত নেন।
মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ আদালতকে জানান, তারা সেদিন ৮/৯টি ইয়াবা সেবন করেছিলেন। এর আগে কখনো এক দিনে এত ইয়াবা তারা সেবন করেননি।
আরএমপি কমিশনার আরও কিছু নতুন তথ্য জানালেন আজ। আগেরবার হত্যার পেছনে কেবল ইয়াবা সেবনের কথা বলা হলেও আজ তিনি জানালেন, গণপতির এই বাড়ির জমিটি সিদ্ধার্থদের পরিবারের কাছ থেকে কেনা। সেই লেনদেনসংক্রান্ত কোনো ক্ষোভ সিদ্ধার্থের থাকতে পারে- এমন বিষয়ও তদন্ত করছে পুলিশ।
এ ছাড়া, ওই এলাকার বাসিন্দারা দাস বংশের। আর গণপতিরা ব্রাহ্মণ। এ কারণে এলাকার লোকজনের সঙ্গে তাদের সামাজিক দূরত্ব ছিল। হত্যার মোটিভ তদন্তে এসবও খতিয়ে দেখা হবে বলে জানাল আরএমপি।












