হুইলচেয়ারে আদালত চত্বরে ভুক্তভোগী, তিন মাসেও অধরা প্রধান আসামি

ছবি: আগামীর সময়
তিন মাস আগে পূর্বশত্রুতার জেরে সুজন মুন্সি (৩০) নামে এক যুবককে ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে হাত-পা বিচ্ছিন্ন করে প্রতিপক্ষের লোকজন। এ ঘটনায় দীর্ঘদিন চিকিৎসা নিলেও আজও পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠেননি তিনি।
এমনকি গ্রেপ্তার হয়নি প্রধান আসামিও৷ অন্য দুজন আসামি আদালতে জামিন নিতে এলে তাদের জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে সাক্ষী দিতে একটি হুইলচেয়ারে বসে আদালতে আসতে হয়েছে তাকে।
এরই মধ্যে হারিয়েছেন একটি হাত-পাসহ গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ। কেটে ফেলা হয়েছে ডান পা এবং ডান হাত। দুর্বিষহ এক জীবন বয়ে বেড়াতে হচ্ছে এখন তার।
আজ সোমবার দুপুরে ফরিদপুর জজ কোর্টের চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের প্রথম আদালতের বারান্দায় দেখা মেলে সুজন মুন্সির। তিনি ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলা সদরের ফাজেলখার ডাঙ্গী এলাকার মৃত ধলা মুন্সির ছেলে।
জানা যায়, গত ২৬ এপ্রিল সন্ধ্যায় বাড়ি ফেরার পথে ধারালো অস্ত্র চাপাতি ও রামদা দিয়ে সুজনকে কুপিয়ে মারাত্মক জখম করে প্রতিপক্ষের লোকজন। এ ঘটনায় প্রাণে বেঁচে গেলেও তার ডান হাত ও ডান পা কেটে বিচ্ছিন্ন করা হয়। এ ছাড়া শরীরের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ঘটনার পরদিন চরভদ্রাসন থানায় চারজনের নাম উল্লেখ করে মামলা করেন মা নিরু বেগম।
আসামিদের মধ্যে রয়েছে- ফাজেলখার ডাঙ্গী এলাকার নূর ইসলাম মণ্ডলের ছেলে কালাম মণ্ডল (৪০), ইউসুফ মণ্ডলের ছেলে সাত্তার মণ্ডল (৩৫), বারেক মণ্ডলের ছেলে শাহ বরাত মণ্ডল (২৪) ও বালিয়াডাঙ্গী গ্রামের আক্কাস মণ্ডলের ছেলে শামীম মণ্ডল (৩০)।
আসামিদের মধ্যে প্রধান আসামি কালাম মণ্ডল ধরাছোঁয়ার বাইরে। এ ছাড়া সাত্তার ও শাহ বরাত গত বৃহস্পতিবার চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটের প্রথম আদালতে (চরভদ্রাসন কোর্ট) আদালতে জামিন নিতে এলে জামিন নামঞ্জুর করে কারাগারে পাঠিয়ে দেন বিচারক।
এদিন বিচ্ছিন্ন হাত-পায়ে সাদা ব্যান্ডেজ জড়িয়ে হুইলচেয়ারে আদালতে আসেন সুজন মুন্সি। তার সঙ্গে আসেন মা নিরু বেগম, স্ত্রী বেবী বেগম ও ভাই হায়দার মুন্সি।
একপর্যায়ে তার সাক্ষ্য নেন বিচারক। এ সময় মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা আসামিদের তিন দিনের রিমান্ডের আবেদন করেন। বিচারক এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
বাদীপক্ষের আইনজীবী হাবিবুর রহমান বললেন, দুজন আসামি আদালতে জামিন চাইলে বিচারক জামিন না মঞ্জুর করেছেন। আজ তাদের শুনানি ছিল এবং ন্যায়বিচার ও অস্ত্র উদ্ধারে প্রত্যেককে এক দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করা হয়েছে। পরে তাদের কারাগারে পাঠানো হয়।
এদিকে তিন মাসেও প্রধান আসামিকে গ্রেপ্তার না করা ও বিচার না পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়ে পুরো পরিবার। এ ঘটনায় তারা দ্রুত প্রধান আসামিসহ অন্যদের গ্রেপ্তার ও ন্যায়বিচার চেয়েছে। পাশাপাশি ছোট্ট চার সন্তানের সংসারে মানবেতর জীবনযাপনের কথা জানান স্ত্রী বেবী বেগম।
তিনি বললেন, আমার ছোট্ট চারজন বাচ্চা, আমি ওদের নিয়ে কীভাবে বাঁচব। আমার স্বামীকে যারা চিরতরে পঙ্গু করে দিয়েছে আমি তাদের ফাঁসি চাই। আমার স্বামী থাকতেও যেন মৃত অবস্থায় আছে। সারাক্ষণ যন্ত্রণায় চিৎকার করে। একা একা খেতেও পারে না। আমি ন্যায়বিচার চাই।
এ সময় মা নিরু বেগম ঘটনার বর্ণনা দিয়ে বললেন, এভাবে মানুষ মানুষকে কোপাতে পারে না। আমি মা হয়ে কেমনে সহ্য করব। পুলিশও আসামি ধরে নাই। তাই আমি আদালতের কাছে সঠিক বিচার চাই।
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা চরভদ্রাসন থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মোজাম্মেল হক জানিয়েছেন, দ্বিতীয় তদন্তকারী হিসেবে গত ১০ দিন আগে মামলাটির দায়িত্ব পেয়েছি। দায়িত্ব নেওয়ার পরেই তারা জামিন নিতে এলে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। এ মামলায় এজাহারনামীয় দুজনসহ তিনজন গ্রেপ্তার হয়েছে। প্রধান আসামিসহ বাকিদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত।




