বৃষ্টিতে ফিকে কৃষকের ঈদ
- পাঁচ বছরে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত
- ৩০ শতাংশ ধান এখনো পানির নিচে
- রোদ না থাকায় পচছে কাটা ধান
- দিশাহারা প্রায় দেড় লাখ চাষি

এ সময়ে হাসি থাকার কথা ছিল কৃষকের মুখে। ব্যস্ত সময় পার করার কথা ধান কাটা, মাড়াই ও শুকাতে। কিন্তু বৃষ্টি যেন বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে উত্তরের জেলা কুড়িগ্রামের কৃষকদের সামনে। কৃষকদের কথা— একদিকে ধানের দাম নেই, অন্যদিকে বৃষ্টির কারণে ধান কাটা ও মাড়াইয়ের খরচও বেশি। সব মিলিয়ে দিশাহারা জেলার প্রায় দেড় লাখ বোরোচাষি।
জেলার রাজারহাট উপজেলার কৃষি আবহাওয়া তথ্যকেন্দ্র বলছে, চলতি মাসের দ্বিতীয় সপ্তাহ থেকে শুরু হয় টানা বৃষ্টি। এতে বড় ধরনের ক্ষতি হয়েছে কৃষকের। নিচু জমির ধান নষ্ট হয়েছে জমিতেই। খড় হিসেবে গরুকে খাওয়ানোর মতো অবস্থা নেই, পচে গেছে সব। এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস, ভারী থেকে অতিভারী বৃষ্টিপাতের। মাঠে পড়ে আছে এখনো প্রায় ৩০ শতাংশ ধান।
জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের ভাষ্য, চলতি মৌসুমে জেলায় ১ লাখ ১৭ হাজার ৩৫০ হেক্টর জমিতে হয়েছে বোরোর আবাদ। প্রায় অর্ধেক জমির ধান কাটা হলেও এখনো ৩০ ভাগ রয়ে গেছে পাকা ধান। ভারী বৃষ্টিপাতে এসব জমির ধানগাছের গলা পর্যন্ত জমে গেছে পানি। খড় পচে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে বৃষ্টিতে। যেসব জমির ধান কাটা হয়েছে, ভালো আবহাওয়া না থাকায় পচে যাচ্ছে সেগুলোও।
গত এক সপ্তাহে জেলায় ধান কাটার হার ছিল ভালো। কিন্তু এখনো প্রায় ৩০ ভাগ বোরো ধান রয়ে গেছে জমিতেই। সেখানে থাকা বেশিরভাগ ধান কাটার উপযুক্ত হলেও আবারও বৃষ্টি শুরু হয়েছে। তাই কাটা সম্ভব হচ্ছে না। বৃষ্টিতে অনেক জমিতে ধানের শিষের কাছাকাছি পর্যন্ত জমে গেছে পানি। নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা ডুবে যাওয়া পাট ও সবজি ক্ষেত— জানায় অধিদপ্তর।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যের সঙ্গে মিল পাওয়া গেল সদর উপজেলার আরডিআরিএস বাজারের কৃষক মামুনুর রশিদ কাজলের কথায়। এবার তিনি ৩ একর জমিতে আবাদ করেছেন বোরো ধান। তবে দেড় একর জমির ধান কাটলেও মাঠে রয়েছে প্রায় দেড় একরের ধান। হতাশ কণ্ঠে তিনি বললেন, ‘এবার মনে হয় এই দেড় একর জমির ধান পাচ্ছি না। পানির নিচে ধান। যে ধান কেটেছি, রোদের অভাবে সেটাও ভালোমতো শুকাতে পারছি না। আবহাওয়া ড্যাম থাকলে ধান থেকে গাছ বের হয়। আবাদ নষ্ট হলে ফলন ভালো পাওয়া যায় না।’ ঈদ নিয়ে প্রশ্ন করতেই তার হতাশা, ‘আবাদ নাই, আর কীসের ঈদ।’
জেলার অন্তত ২০ কৃষকের সঙ্গে কথা বলেছেন প্রতিবেদক। তাদের প্রত্যেকের কথা প্রায় একই, ধান নিয়ে বিপাকে তারা।
সদর উপজেলার যাত্রাপুর ইউনিয়নের কৃষক ময়নাল। তার কিছু ক্ষেত প্রায় পানির নিচে। জমিতে নেমে তিনি দেখেছেন ধানের পচন। মন্তব্য করেন, ‘ধানের মণ ৮০০ টাকা, হামার খরচই আছে ৯০০ টাকার মতো। বৃষ্টিতে কাটা-মাড়াইর খরচ বেশি। আর হামার ঈদ, হামার কপালোত ঈদ নাই।’
সড়কের পাশে ধান শুকাতে ব্যস্ত মরিয়ম খাতুন। তারও দুশ্চিন্তার কারণ বৃষ্টি। বললেন, ‘দেওয়ার (আকাশ) কোনো ঠিক আছে, কহন যে নামে কে জানে। আইজ তিন দিন ধরি দান শুকাই। এই বৃষ্টি আসে, এই যায়।’
কথা হয় কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক (শস্য) মেহেদী হাসানের সঙ্গে। তিনি জানালেন, মাঠে এখনো ৩০ ভাগ জমির ধান রয়ে গেছে। পরামর্শ দিলেন, দ্রুত পাকা ধান কেটে ফেলার।
উপপরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুনের শঙ্কা, ‘পেকে গেছে প্রায় সব জমির ধান। পানি নেমে গেলে সেসব কাটা যাবে। বৃষ্টি থেমে গেলে করা যাবে ক্ষতির পরিমাণ। কিছু ক্ষতি হয়তো হবে। প্রতিনিয়ত মাঠ পরিদর্শন করছি, অনেক কৃষকের আধা শুকনো খড় আবারও ভিজে গেছে। খড় পচে গেলে প্রাণী খাদ্যের সংকট হতে পারে।’ শিগগিরই পরিস্থিতি ভালো হওয়ার সুযোগ নেই বলে জানালেন রাজারহাট কৃষি আবহাওয়া পর্যবেক্ষণাগারের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা সুবল চন্দ্র সরকার।






