ঈদে মুখর বিনোদনকেন্দ্র
- লোকারণ্য ছিল চট্টগ্রামের পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত। ভিড় ছিল ডিসি পার্ক, বোট ক্লাব, ভাটিয়ারিতেও
- রাজশাহীর মানুষের প্রিয় জায়গা পদ্মাপাড় ছিল সব ছুটির দিনের মতোই মুখর

ঈদের ছুটিতে পরিবার-পরিজন নিয়ে চিড়িয়াখানায় ভিড় করেন দর্শনার্থীরা। জিরাফের খাঁচার সামনে শিশু-কিশোর ও অভিভাবকদের উপস্থিতিতে মুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা। ছবিটি শুক্রবার মিরপুরে বাংলাদেশ জাতীয় চিড়িয়াখানা থেকে তোলা - শামীম-উস-সালেহীন
রোজার ঈদের তুলনায় কোরবানির ঈদে ব্যস্ততা কিছুটা বেশি থাকে। পশু কোরবানি, মাংস বিলি, রান্না-খাওয়া নিয়ে চলে নানা তোড়জোড়। কাজের চাপ কমলেই ধুম পড়ে ঘুরে বেড়ানোর। এবার ঈদের পর তিন দিন সরকারি ছুটি মেলায়, বিনোদন ও পর্যটনকেন্দ্রগুলো ছিল দর্শনার্থী মুখর। দেশের প্রায় সব পর্যটনকেন্দ্রেই দেখা গেছে উপচেপড়া ভিড়।
চট্টগ্রাম
বন্দরনগরীর মানুষের কাছে সবচেয়ে পছন্দের জায়গা পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত। প্রতিবারের মতো এবারও সেখানে ছিল মানুষের ঢল। কেবল পতেঙ্গাই নয়, একই এলাকার বোট ক্লাব থেকে শুরু করে সীতাকুণ্ডের ফৌজদারহাটে অবস্থিত ডিসি পার্ক পর্যন্ত পথজুড়ে গড়ে ওঠা বিনোদন কেন্দ্রগুলো মিটিয়েছে নগরবাসীর মনের খোরাক।
প্রতিদিন বিকাল হতেই পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে ভিড় করতে শুরু করেন দর্শনার্থীরা। সমুদ্রের ঢেউ, দূরে দাঁড়ানো সারি সারি জাহাজ আর সূর্যাস্ত দেখতে যান তারা। সেই সঙ্গে পরিবার-বন্ধুদের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটানো, চটপটি-ফুচকা কিংবা নেভালের বিখ্যাত কাঁকড়া আর ছোট পেঁয়াজু খেতে প্রতিদিনই ভিড় করেন অনেকে। তবে ঈদের ছুটিতে ভিড় বেড়ে হয়েছে কয়েক গুণ।
পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকত-লাগোয়া চট্টগ্রাম আউটার রিং রোড। পথের এক পাশে বঙ্গোপসাগরের জলরাশি ও দিগন্ত বিস্তৃত নীল আকাশ দর্শনার্থীদের কাছে দারুণ আকর্ষণীয়। সমুদ্রের কোল ঘেঁষে চলা এই সড়কে তাই গাড়ি নিয়েও ঘুরতে পছন্দ করেন অনেকে।
এই পথের অন্যতম আকর্ষণ কর্ণফুলী নদীর তলদেশে নির্মিত টানেল। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে প্রথম নদীর তলদেশে নির্মিত এই টানেল চালু হওয়ার পর থেকেই এটি পর্যটকদের কাছে নতুন আকর্ষণ হয়ে উঠেছে। ঈদের ছুটিতে অনেকেই শুধু টানেলের ভেতর দিয়ে যাতায়াতের অভিজ্ঞতা নিতে পরিবার নিয়ে ঘুরতে যাচ্ছেন। প্রায় ৩ দশমিক ৩২ কিলোমিটার দীর্ঘ এই টানেল চট্টগ্রাম নগরী ও আনোয়ারাকে সংযুক্ত করেছে।
ফৌজদারহাটের ডিসি পার্কেও ছিল দর্শনার্থীদের ঢল। বিশাল উন্মুক্ত পরিবেশ, লেক, ফুলবাগান এবং শিশুদের খেলার নানা ব্যবস্থা থাকায় পরিবার নিয়ে এখানে ঘুরতে যেতে পছন্দ করেন অনেকে।
এ ছাড়া রানী রাসমণি ঘাট, কর্ণফুলী নদীর তীর, নদীর পাড়ঘেঁষা ঝাউবাগান, চিটাগং বোট ক্লাব, গানার্স ট্রেনিং এরিয়াও এখন পর্যটকদের পছন্দের স্থান।
রাজশাহী
ঈদের ছুটি শেষ হলেও রাজশাহীতে যেন কাটেনি উৎসবের আমেজ। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুললে পুরোদমে স্বাভাবিক জীবনে ফিরবে রাজশাহী। তার আগপর্যন্ত নগরীর বিনোদন কেন্দ্রগুলোয় থাকবে ভিড়। বিশেষ করে পদ্মার পাড়, শিশুপার্কের মতো স্থানগুলো বিকাল হতেই হয়ে উঠবে মুখর।
গতকাল রবিবার সরকারি ছুটির শেষ দিনে সব পর্যটনকেন্দ্রে ছিল ভীষণ ভিড়। বিকাল গড়াতেই পদ্মা নদীর পাড়, কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানা, লালন শাহ মুক্তমঞ্চ, শহীদ জিয়া শিশুপার্ক, ভদ্রা শিশুপার্ক ও সীমান্ত নোঙর এলাকায় সৃষ্টি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। ব্যস্ত জীবনের ফাঁকে সবাই এসেছিলেন কিছুটা মুক্ত বাতাস উপভোগ করতে, আর বন্ধু-স্বজনদের সঙ্গে সময় কাটাতে।
সবচেয়ে বেশি দর্শনার্থীর সমাগম দেখা গেছে পদ্মা নদীর পাড়ে। বিশেষ করে বড়কুঠি এলাকা, টি-বাঁধ ও নদীতীরের হাঁটার পথগুলোতে বিকালের পর মানুষের ঢল নামে। পরিবার নিয়ে হাঁটাহাঁটি, বন্ধুদের আড্ডা, নৌকা ভ্রমণ কিংবা সূর্যাস্ত উপভোগ— সব মিলিয়ে পদ্মাপাড় যেন হয়ে ওঠে মানুষের মেলা। শিশু থেকে শুরু করে প্রবীণ; সব বয়সী মানুষের উপস্থিতি ছিল সমান চোখে পড়ার মতো। কাউকে দেখা গেল নদীর তীরে বসে গল্প করতে, কাউকে ছবি তুলতে। আর কেউ কেউ নৌকায় চড়ে উপভোগ করছিলেন পদ্মার সৌন্দর্য।
পদ্মাপাড়ে ঘুরতে আসা মাজেদ আলী বললেন, ‘চাকরির কারণে পরিবারকে খুব বেশি সময় দেওয়া হয় না। তাই ঈদের ছুটিকে কেন্দ্র করে সবাইকে নিয়ে বের হয়েছি। ছুটি শেষ হলেও আরও কিছু সময় পরিবারকে দিতে চেয়েছি। তবে মানুষের ভিড় এত বেশি যে, অনেক জায়গায় দাঁড়ানোই কঠিন।’
নগরীর কেন্দ্রীয় উদ্যান ও চিড়িয়াখানায়ও ছিল শিশু-কিশোরদের ব্যাপক উপস্থিতি। শালবাগান এলাকার বাসিন্দা আব্দুস সালাম বলছিলেন, ‘সন্তানদের প্রাণী দেখাতে এনেছি। বড় প্রাণী না থাকলেও তারা খুব আনন্দ করছে। খোলা জায়গায় খেলাধুলা করতে পারছে, এটিই সবচেয়ে বড় বিষয়।’
ঈদের ছুটিতে ব্যবসা ভালো হয়েছে, জানালেন স্থানীয় ফুচকা ও ভেলপুরি বিক্রেতা রফিকুল ইসলাম। এই সাত দিনে তার আয় প্রায় তিন গুণ হয়েছে।
চা দোকানি আজিজুল হক বলছিলেন, সাধারণ দিনে যেখানে দুই থেকে তিন হাজার টাকা বিক্রি হয়, ঈদের ছুটিতে সেখানে ছয় থেকে সাত হাজার টাকার মতো বিক্রি হচ্ছে।
বিকালের পর চিড়িয়াখানায় এত বেশি মানুষ আসে যে, অনেক সময় দাঁড়ানোর জায়গাও থাকে না— বলছিলেন আইসক্রিম বিক্রেতা নাজমুল হোসেন। তবে ভিড় হলেও তাতে দুঃখ নেই তার, কারণ এই ভিড়ই এনে দেয় ব্যবসা।
শুধু খাবার বা খেলনার ব্যবসাই নয়, শিশুপার্ক ও লালন শাহ মুক্তমঞ্চ এলাকায় স্থাপিত বিভিন্ন রাইড ব্যবসাও ছিল জমজমাট। নাগরদোলা, ট্রেন রাইড, দোলনা ও অন্যান্য যান্ত্রিক রাইডে চড়তে শিশুদের দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে দেখা গেছে।






