এমপিপুত্র ডিভি হেফাজতে
৫ আগস্টের পর বেপরোয়া

এমপিপুত্র খাইরুল ইসলাম সজীব
চব্বিশের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরপরই নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ ও সিদ্ধিরগঞ্জ এলাকায় চাঁদাবাজি, দখলদারিত্বসহ নানান অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন সদ্য বহিষ্কৃত যুবদল নেতা খাইরুল ইসলাম সজীব। এই এমপিপুত্রের বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ ছিল আগে থেকেই। কিন্তু প্রভাব-প্রতিপত্তির কারণে এলাকার মানুষ কখনোই সাহস করেনি তার বিরুদ্ধে মুখ খোলার। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর সবমিলিয়ে বেপরোয়া হয়ে ওঠেন সজীব— এমনটাই বলছেন স্থানীয়রা। আর গত ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে বাবা আজহারুল ইসলাম সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর তার অপরাধ সাম্রাজ্যের বাড়বাড়ন্ত চরমে পৌঁছায়।
ভুক্তভোগীদের ভাষ্য, সিদ্ধিরগঞ্জের আদমজী ইপিজেড, কাঁচপুরের বিসিক, সোনারগাঁ এলাকার ইকোনমিক জোন, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, হাট-ঘাট-মাঠ সবক্ষেত্রে এমপি পিতার প্রভাব আর যুবদলের পদের বদৌলতে দখলে নেন সজীব ও তার লোকজন। সর্বশেষ গত ১৯ জুন সিদ্ধিরগঞ্জে জেলা বিএনপির কার্যালয়ের দখল নিয়ে সেখানে টানানো হয় এমপি আজহারুল ইসলাম মান্নানের ব্যক্তিগত কার্যালয় স্থাপনের সাইনবোর্ড। যেখানে নারায়ণগঞ্জের পাঁচটি সংসদীয় এলাকার এমপিদের ছবি টানানো ছিল। পরে এ নিয়ে বিতর্ক উঠলে কেন্দ্রের নির্দেশে পরদিনই আবার সাটানো হয় জেলা বিএনপির সাইনবোর্ড।
সোনারগাঁয়ের একাধিক বাসিন্দা জানালেন, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর সোনারগাঁয়ের মেঘনা টোল প্লাজায় ৩০ লাখ টাকা লুটপাটের মধ্য দিয়ে আলোচনায় আসেন খাইরুল ইসলাম সজীব। এর পর থেকেই একের পর এক অপরাধে জড়ান তিনি। বিদ্যুৎকেন্দ্রসহ ওই এলাকার অন্তত ৪৩টি বৃহৎ শিল্প প্রতিষ্ঠান থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে সজীব ও তার ক্যাডার বাহিনীর বিরুদ্ধে। সোনারগাঁয়ের বহু কারখানার ঝুট কোনো দাম না দিয়েই নিয়ে যায় এই সজীবের লোকজন। মেঘনা নদীতে প্রায় রাতেই ১৪-১৮টি ড্রেজার লাগিয়ে বালু তোলে তার লোকজন। সোনারগাঁ লোক ও কারুশিল্প ফাউন্ডেশন এবং সোনারগাঁ উপজেলার বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ করেন সজীব। এ ছাড়া উপজেলার অর্ধশত অবৈধ চুনা কারখানা তার নিয়ন্ত্রণে। স্থানীয়দের ভাষ্য, চব্বিশের ৫ আগস্টের পর ‘মামলা বাণিজ্যে’র মাধ্যমেও অঢেল টাকা কামিয়েছেন এই এমপিপুত্র।
মেঘনা নদীতে পলিথিন জাকিরের মাধ্যমে নৌপথের চাঁদাবাজি একাই নিয়ন্ত্রণ করেন সজীব।
৫ আগস্টের পর সোনারগাঁয়ের প্রতিটি ইউনিয়নের মেম্বারদের বিপুল অর্থের বিনিময়ে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করার নেপথ্যে ছিলেন তিনি। সজীবের এসব অপরাধমূলক কাজে বাহিনীর অন্যতম নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করেন বি এম ডালিম, মাসুম বিল্লাহ, পিএস সেলিম হোসেন দিপু ও গোলজার হোসেন। সংসদ নির্বাচনের পর সিদ্ধিরগঞ্জ অংশে এককভাবে ট্রাকস্ট্যান্ড, ট্যাক্সিস্ট্যান্ড, বাস টার্মিনাল, কাঁচপুর ল্যান্ডিং স্টেশন, আদমজী ইপিজেড, পদ্মা-মেঘনা তেলের ডিপো, সাইলোসহ সব কিছুর নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠেন সজীব।
ক্ষমতাসীন দল বিএনপিরই একাধিক নেতার অভিযোগ, নির্বাচনের আগে দলের জ্যেষ্ঠ নেতাদের তুচ্ছতাচ্ছিল্য করে বক্তব্য দেন সজীব। নারায়ণগঞ্জ জেলা পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যান অধ্যাপক মামুন মাহমুদকে নিয়েও নানা কটূক্তি করেন। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর থেকে এমপি মান্নান ও তার ছেলে একক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে সোনারগাঁ-সিদ্ধিরগঞ্জের বিএনপি নেতাদের কোণঠাসা করতে নানা কৌশল করেন। বিএনপি নেতা এবং যুবদলের স্থানীয় কর্মীরাও ক্ষুব্ধ ছিলেন এমপিপুত্রের কর্মকাণ্ডে।




