বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধারের পরও লালন আখড়ায় ভক্তদের ঢল

তিন দিনব্যাপী স্মরণোৎসবের শেষ দিন সোমবার লালন ভক্ত-অনুসারী ও দর্শনার্থীদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। ছবি: আগামীর সময়
কুষ্টিয়ার ছেঁউড়িয়ায় বাউলসম্রাট ফকির লালন শাহের আখড়াবাড়ি থেকে টাইম বোমাসদৃশ একটি বস্তু ও দুই লিটার পেট্রল উদ্ধারের ঘটনায় সাময়িক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছিল। তবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতায় পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর আবারও উৎসবমুখর হয়ে উঠেছে আখড়াবাড়ি প্রাঙ্গণ। লালন শাহের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী স্মরণোৎসবের শেষ দিন আজ সোমবার সেখানে ভক্ত-অনুসারী ও দর্শনার্থীদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো।
স্থানীয়রা জানালেন, রবিবার রাত পৌনে ২টার দিকে আখড়াবাড়ির ভেতরে পুলিশ বক্সের কাছাকাছি একটি পরিত্যক্ত সাদা ব্যাগ দেখতে পান এক লালনভক্ত। ব্যাগের ভেতরে সন্দেহজনক বস্তু দেখে তিনি পুলিশকে খবর দেন। পরে সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে আখড়াবাড়িতে অবস্থানরত সাধুদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়।
সোমবার সকালে ঢাকা থেকে আসা পুলিশের বোমা নিষ্ক্রিয়করণ দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে বস্তুটি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে। পরে বোমাসদৃশ বস্তুটি নিষ্ক্রিয় করা হয়। এ সময় বোতলে রাখা দুই লিটার পেট্রলও উদ্ধার করা হয়।
কুমারখালী থানার ওসি জামাল উদ্দিন বললেন, বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধারের পর দ্রুত বিশেষজ্ঞ দল এনে সেটি নিষ্ক্রিয় করা হয়েছে। বর্তমানে আখড়াবাড়ির নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার রয়েছে। কারা বস্তুটি সেখানে রেখেছিল, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
কুষ্টিয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফয়সাল মাহমুদ বললেন, বোমা বিশেষজ্ঞ দল অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বস্তুটি নিষ্ক্রিয় করেছে। বর্তমানে ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রয়েছে।
এদিকে এমন ঘটনায় ভক্তদের মধ্যে সাময়িক আতঙ্ক তৈরি হলেও লালন শাহের প্রতি তাদের ভালোবাসায় ভাটা পড়েনি। উৎসবের শেষ দিনেও দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা ভক্ত-অনুসারীদের পদচারণে মুখর ছিল আখড়াবাড়ি।
পাবনা থেকে আসা লালনভক্ত আব্দুল মজিদ বললেন, প্রতিবছর লালন সাঁইয়ের স্মরণোৎসব ও তিরোধান দিবসে তিনি আখড়াবাড়িতে আসেন। এবার শেষ দিনে বোমাসদৃশ বস্তু উদ্ধারের খবর শুনে আতঙ্কিত হয়েছিলেন। সাঁইজির ধামে এমন ঘটনা দুঃখজনক বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
ফরিদপুর থেকে আসা লালনভক্ত আলিফ হোসেন বললেন, লালন সাঁইয়ের প্রতি ভালোবাসা থেকেই প্রতিবছর এখানে ছুটে আসেন তিনি। আখড়াবাড়ি ভক্তদের কাছে পবিত্র স্থান ও মিলনমেলা। এমন ঘটনায় মনে আঘাত লাগলেও তা লালনের প্রতি ভালোবাসাকে দমিয়ে রাখতে পারবে না। শেষ দিনেও বিপুল মানুষের উপস্থিতি সেই ভালোবাসারই প্রকাশ।
শেষ দিনে আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান
মরমি সাধক ফকির লালন শাহের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় ও জেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় লালন একাডেমি তিন দিনব্যাপী স্মরণোৎসবের আয়োজন করে। উৎসবের অংশ হিসেবে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও গ্রামীণ মেলার আয়োজন করা হয়। গত শনিবার বিকেলে সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী উৎসবের উদ্বোধন করেন। রোববার দুপুরে পুণ্যসেবার মধ্য দিয়ে সাধুসঙ্গের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়।
সোমবার সমাপনী আলোচনা সভায় সভাপতিত্ব করেন কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক ও লালন একাডেমির সভাপতি তৌহিদ বিন হাসান। এতে প্রধান অতিথি ছিলেন বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। মুখ্য আলোচক ছিলেন প্রাবন্ধিক অধ্যাপক ড. আহমেদ শাকিল হাসমী।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সাবেক সংসদ সদস্য ও বীর মুক্তিযোদ্ধা সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমী, সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য মোসা. ফরিদা ইয়াসমিন, সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার রাগীব রউফ চৌধুরী, কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার মো. আমিনুল ইসলাম এবং জেলা বিএনপির নেতারা। উৎসবে দেশ-বিদেশের বিপুলসংখ্যক লালনভক্ত, গবেষক ও দর্শনার্থী অংশ নেন।
সোমবার মধ্যরাতে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে তিন দিনব্যাপী এ স্মরণোৎসব শেষ হওয়ার কথা রয়েছে।



