পাহাড়ে মাছ চাষে নীরব বিপ্লবের কারিগর উদ্যোক্তা শাহজাহান

ছবি: আগামীর সময়
লম্বা, ছিপছিপে গড়ন। মুখে সব সময় লেগে থাকে সরল হাসি। তিনি খাগড়াছড়ি জেলার দীঘিনালা উপজেলার কবাখালী মুসলিমপাড়ার মাছচাষি মো. শাহজাহান। পাহাড়ি জনপদে মাছ চাষে তিনি যেন নীরব এক বিপ্লব ঘটিয়েছেন। কোনো প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছাড়াই উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তাদের পরামর্শে শুরু করেছিলেন মাছ চাষ। বর্তমানে তিনি একজন সফল মাছচাষি ও উদ্যোক্তা।
দীঘিনালা সদর থেকে সাজেকগামী সড়কে, দীঘিনালা সেনানিবাসের কিছুটা আগে কবাখালী মুসলিমপাড়ায় শাহজাহানের প্রায় ১০ বিঘা আয়তনের বড় পুকুরটি অবস্থিত। পুকুরের পানিতে নজর দিলেই বোঝা যায়, সেখানে মাছের প্রাচুর্য রয়েছে। এ ছাড়া তার আরও পাঁচটি ছোট পুকুর রয়েছে। মাছ চাষের পাশাপাশি তিনি রেণু উৎপাদন এবং পোনা বিক্রির কাজও করেন।
‘আগামীর সময়’-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে শাহজাহান জানিয়েছেন, প্রায় ২০ বছর আগে কোনো পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই তিনি মাছ চাষ শুরু করেছিলেন। উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তাদের পরামর্শই ছিল তার পথচলার মূল প্রেরণা। শুরুতে লাভ-লোকসান দুই-ই ছিল। একাধিকবার লোকসানের মুখে পড়লেও তিনি হাল ছাড়েননি। ধৈর্য ও পরিশ্রমের ফল হিসেবে বর্তমানে বছরে ৭৫ থেকে ৮০ লাখ টাকার মাছ ও পোনা বিক্রি করেন।
তিনি জানান, দীঘিনালা উপজেলায় তিনিই একমাত্র রেণুচাষি। প্রতি বছর ৪ থেকে ৫ কেজি রেণু সংগ্রহ করে তা থেকে পোনা উৎপাদন এবং বাজারজাত করেন।
তবে গত বছরের বন্যা তার জন্য বড় ধাক্কা হয়ে আসে। তিনি বলেছেন, ‘বন্যায় আমার চারটি পুকুর তলিয়ে যায়। এতে প্রায় ৬ থেকে ৭ লাখ টাকার মাছ ভেসে যায়। এরপর থেকে বড় আকারের মাছ চাষে ঝুঁকি বেড়ে গেছে। ইচ্ছা থাকলেও এখন আর বড় মাছ চাষ করতে পারছি না।’
শাহজাহান জানিয়েছেন, তিনি পুকুরের পাড় উঁচু করেছেন এবং চারদিকে জাল দিয়ে ঘিরে রেখেছেন। কিন্তু পুকুরের পাশ দিয়ে চলে যাওয়া একটি সড়ক দিয়ে বর্ষার সময় ঢলের পানি প্রবেশ করে পুকুর ভরে যায়। তখন মাছ রক্ষা করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে।
তিনি কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন উপজেলা মৎস্য অফিস, বিভিন্ন সময়ের ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান এবং উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের সহযোগিতার কথা। তাদের আন্তরিক সহায়তাই তাকে আজকের অবস্থানে পৌঁছাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে বলে তিনি জানান।
শাহজাহান, তার তিন ছেলে এবং আরও ছয় থেকে সাতজন শ্রমিক প্রতিদিন মাছ চাষের কাজে নিয়োজিত থাকেন। তবে বছরের একটি বড় সময় তাকে আর্থিক সংকটে পড়তে হয়। কারণ শ্রমিকের মজুরি, মাছের খাদ্য ও ওষুধের মূল্য নগদ পরিশোধ করতে হয়।
দীঘিনালা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা শরৎ কুমার ত্রিপুরা বলেছেন, ‘আমি কয়েক মাস আগে এখানে যোগদান করেছি। এরই মধ্যে দুবার শাহজাহানের খামার পরিদর্শন করেছি। তার মাছ চাষ অত্যন্ত পরিকল্পিত ও প্রশংসনীয়। আমার পূর্বসূরি মৎস্য কর্মকর্তা অবর্ণা চাকমাও তাকে বিভিন্নভাবে সহযোগিতা করেছেন।’
খাগড়াছড়ি জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. রাজু আহমেদ বলেছেন, ‘শাহজাহান একজন আদর্শ মাছচাষি। তার সাফল্যের স্বীকৃতি হিসেবে এ বছর তাকে পদক প্রদানের জন্য আমরা সুপারিশ করেছি।




