সুজানগর
স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে আড়াই ঘণ্টা অবরুদ্ধ করে রাখলেন যুবদল নেতা!

সংগৃহীত ছবি
পাবনার সুজানগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সুপ্রভা রানীকে তার কার্যালয়ে আড়াই ঘণ্টার বেশি সময় অবরুদ্ধ করে রাখার অভিযোগ উঠেছে উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক সিদ্দিকুর রহমান পিন্টুর বিরুদ্ধে।
এ সময় তাকে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও অভিযোগ করেছেন চিকিৎসক। ঘটনার পর নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন দাবি করে তিনি কর্মস্থলে যাওয়া বন্ধ রেখেছেন।
গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এ ঘটনা ঘটে। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের টেন্ডার প্রক্রিয়ায় অনিয়ম ও কঠিন শর্ত জুড়ে দেওয়ার অভিযোগ তুলে ওই চিকিৎসককে টেন্ডার বাতিল করে পুনরায় দরপত্র আহ্বানের জন্য চাপ দেওয়া হয়।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন যুবদল নেতা সিদ্দিকুর রহমান পিন্টু। তার দাবি, টেন্ডার প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। এ বিষয়ে কথা বলতে তারা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়েছিলেন। কাউকে অবরুদ্ধ করা বা প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়নি।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. সুপ্রভা রানী জানান, গত ১০ সেপ্টেম্বর ই-জিপি পদ্ধতিতে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের এমএসআর খাতের ছয়টি প্যাকেজে ৮০ লাখ ৭৬ হাজার টাকার দরপত্র আহ্বান করা হয়। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পরামর্শ ও ই-জিপি নীতিমালা অনুসরণ করে অনলাইনে দরপত্র মূল্যায়ন শেষে গত ২ নভেম্বর চারটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়। এরপর স্থানীয় কয়েকজন নেতা শর্ত কঠিন হওয়ার অভিযোগ তুলে দরপত্র বাতিলের জন্য চাপ দিতে থাকেন।
তিনি বলেন, মঙ্গলবার কনফারেন্স রুমে সভায় ব্যস্ত থাকার সময় সিদ্দিকুর রহমান পিন্টুর নেতৃত্বে আট থেকে দশজনের একটি দল তার দাপ্তরিক কক্ষের বিদ্যুৎসংযোগ বিচ্ছিন্ন করে এবং সিসি ক্যামেরা ঘুরিয়ে দেয়। পরে কক্ষে ঢুকে ছিটকিনি লাগিয়ে দরপত্র বাতিলের জন্য চাপ দেওয়া হয়।
ডা. সুপ্রভা রানীর অভিযোগ, তাকে নিয়মবহির্ভূতভাবে পুনরায় দরপত্র আহ্বানের জন্য চাপ দেওয়া হয়। রাজি না হওয়ায় ভয়ভীতি দেখানোর পাশাপাশি অফিসের বাইরে দেখে নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। এ ঘটনায় তিনি চরম নিরাপত্তাহীনতায় রয়েছেন। বিষয়টি মৌখিকভাবে স্থানীয় প্রশাসনকে জানিয়েছেন। সিভিল সার্জনের কাছে লিখিত অভিযোগ দেওয়ার প্রস্তুতিও নিচ্ছেন।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে হাসপাতালের কয়েকজন অফিস সহকারী ও কর্মচারী জানান, দুই ঘণ্টার বেশি সময় ধরে স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে তার কক্ষে আটকে রেখে দরপত্র বাতিলের জন্য চাপ দেওয়া হয়। তবে নিরাপত্তার কারণে তারা প্রকাশ্যে কথা বলতে রাজি হননি।
হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. ওয়াসিম খান বলেছেন, যারা দরপত্র পাননি। তারা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশ্ন করছিলেন এবং চিৎকার-চেঁচামেচি করছিলেন। তিনি কক্ষে গিয়ে সিসি ক্যামেরা উল্টানো অবস্থায় দেখতে পান। পরে থানায় খবর দিলে পুলিশ কর্মকর্তা সেখানে আসেন।
দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, তিনি মূল্যায়ন কমিটির সদস্য হলেও প্রক্রিয়ার বিস্তারিত তাকে জানানো হয়নি। কোনো অনিয়ম হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো যেত। তবে হাসপাতালে এভাবে চিৎকার-চেঁচামেচি করা প্রত্যাশিত নয়।
অভিযোগ অস্বীকার করে যুবদল নেতা সিদ্দিকুর রহমান পিন্টু বলেছেন, দরপত্র প্রক্রিয়ায় ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতি হয়েছে। বৈধ ঠিকাদারি লাইসেন্স থাকা সত্ত্বেও স্থানীয় কাউকে কাজ না দিয়ে গোপনে ঝিনাইদহ থেকে লোক এনে কমিটি করা হয়েছে। এ ছাড়া বিশেষ শর্ত জুড়ে দেওয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য কর্মকর্তার যোগসাজশে তার স্বামীর মাধ্যমে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার জন্য দরপত্রে অনিয়ম করা হয়েছে বলে তার অভিযোগ।
তিনি আরও বলেন, তারা শুধু নিয়মের বিষয়টি জানাতে গিয়েছিলেন। স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে অবরুদ্ধ করা বা প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়নি। সেখানে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাও উপস্থিত ছিলেন। নিজের দুর্নীতি আড়াল করতেই স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মিথ্যা অভিযোগ করছেন।
পাবনার সিভিল সার্জন আবুল কালাম আজাদ বলেন, সুজানগরে নিয়ম মেনেই দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে বলে তিনি জানেন। সম্প্রতি দরপত্র না পেলে বিভিন্ন দপ্তরে এ ধরনের হেনস্তা ও হয়রানিমূলক আচরণের ঘটনা ঘটছে। এর আগে নিজেও এমন পরিস্থিতির শিকার হয়েছেন বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, আপাতত ওই স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে কয়েক দিন নিরাপদে থাকতে বলা হয়েছে। এ বিষয়ে দ্রুত প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
সুজানগর থানার ওসি মোজাফফর হোসেন বলেন, ঘটনার দিন হাসপাতাল থেকে ফোন পেয়ে তিনি সেখানে যান। কয়েকজনকে দেখতে পেলেও স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে অবরুদ্ধ করে রাখার অভিযোগ তিনি তাকে জানাননি। পরে নামাজ পড়তে যাওয়ার পর স্বাস্থ্য কর্মকর্তা চলে গেছেন বলে জানতে পারেন। এ ঘটনায় এখনো কোনো লিখিত বা মৌখিক অভিযোগ পাননি। অভিযোগ পেলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।





