উন্নয়ন এলো ‘অভিশাপ’ হয়ে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
উন্নয়ন যখন অপরিকল্পিত হয়, তখন তা সাধারণ মানুষের জন্য আশীর্বাদের বদলে কতটা অভিশাপ হয়ে দাঁড়াতে পারে— এর নির্মম দৃষ্টান্ত যশোরের অভয়নগর উপজেলার চেঙ্গুটিয়া গ্রাম। মেগা এক প্রকল্পের জন্য আটকে গেছে এই জনপদের প্রাকৃতিক জলপ্রবাহ। ফলে দুই মাস ধরে বিষাক্ত, দুর্গন্ধযুক্ত ও কালচে পানিতে বন্দি হয়ে চরম মানবেতর জীবনযাপন করছেন গ্রামের দুই শতাধিক পরিবারের হাজারো মানুষ।
বসতঘরে হাঁটুপানি, উঠানে কোমর সমান। রান্নাঘর থেকে শুরু করে শৌচাগার, মসজিদ, কবরস্থান, স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও রাস্তাঘাট— তলিয়ে আছে সবই। চুলা জ্বলে না, তাই দিনে একবার কোনো রকমে রান্না করে তিনবেলা খাচ্ছেন দুর্গতরা। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে স্থানীয় কারখানার বিষাক্ত বর্জ্য।
জানা যায়, অভয়নগরের প্রেমবাগ ইউনিয়নের চেঙ্গুটিয়া, মহাকাল, প্রেমবাগ, বালিয়াডাঙ্গা, আমডাঙ্গা, আরাজি বাহিরঘাট, মাগুরা ও রাজাপুর মৌজায় ৫০২ দশমিক ৯০৬ একর জমিতে করা হচ্ছে যশোর রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ এলাকা (ইপিজেড)। জাতীয় ও স্থানীয় অর্থনীতির জন্য এটি নিঃসন্দেহে বড় খবর; কিন্তু এই প্রকল্পের জন্য বিল ও জলাশয় ভরাট করতে গিয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে যুগ যুগ ধরে চলে আসা এলাকার পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ। বিকল্প কোনো ড্রেনেজ ব্যবস্থা না রেখেই অপরিকল্পিতভাবে বালু ভরাটের খেসারত দিচ্ছেন চেঙ্গুটিয়াবাসী।
বাসিন্দা মিজানুর রহমান বললেন, ‘ইপিজেডের কাজ শুরু হওয়ার আগে আমাদের গ্রামে কখনো পানি জমত না। বড় একটা ড্রেন ছিল, তা দিয়েই আশপাশের কয়েক গ্রামের পানি নেমে যেত; কিন্তু ইপিজেডের বালু ভরাট আমাদের সব শেষ করে দিয়েছে। পানি নামার কোনো জায়গাই আর রাখা হয়নি।’
ভোগান্তির কথা শোনান কাঠমিস্ত্রি মনিরুল ইসলাম (৪৫), ‘দুই মাস ধরে পানিবন্দি আছি। রান্নাঘর, টয়লেট সব পানির নিচে। বৃষ্টি হলে মনে হয় ভাসিয়ে নিয়ে যাবে। হাজারো মানুষ কষ্ট পাচ্ছে। কিন্তু পানি সরানোর কোনো গরজ নেই কারও।’
এ বিষয়ে অভয়নগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শেখ সালাউদ্দিন দিপু তার অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরে বললেন, ‘চেঙ্গুটিয়া গ্রামের পাশ দিয়ে নওয়াপাড়া পৌরসভার একটি ড্রেন আছে। আমরা সেটি পরিষ্কার রাখছি। সেচযন্ত্র দিয়ে পানি ভৈরব নদে ফেলা হচ্ছে; কিন্তু তাতেও কাজ হচ্ছে না। জলাবদ্ধতা দূর করতে আমরা ইপিজেড কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করছি।’
স্থানীয় পরিবেশবিদের দাবি, দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির জন্য ইপিজেড প্রয়োজন। কিন্তু সেই উন্নয়নের চাকায় পিষ্ট হয়ে যদি হাজারো মানুষের বেঁচে থাকার ন্যূনতম অধিকার— শুকনো মাটি, পরিষ্কার পানি আর স্যানিটেশন কেড়ে নেওয়া হয়, তবে সেই উন্নয়ন কতটা টেকসই? চেঙ্গুটিয়া গ্রামের এই মানবিক বিপর্যয় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়, সম্পূর্ণ মানবসৃষ্ট ও প্রশাসনিক অদূরদর্শিতার ফল। অবিলম্বে ইপিজেড কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসন সমন্বিত উদ্যোগ না নিলে এই জনপদ ভয়াবহ স্বাস্থ্য ও মানবিক বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। সরকারের উচ্চ মহলের এখনই এদিকে দৃষ্টি দেওয়া জরুরি।




