মুক্ত আইভীতে সরগরম না.গঞ্জ

সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী
৩৯১ দিন কারাভোগের পর নারায়ণগঞ্জের দেওভোগের ‘চুনকা কুটিরে’ ফিরেছেন সাবেক মেয়র ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। তার মুক্তিকে ঘিরে সমর্থকদের মধ্যে উচ্ছ্বাস দেখা গেলেও রাজনৈতিক অঙ্গনে শুরু হয়েছে নতুন আলোচনা ও বিতর্ক। এরই মধ্যে আইভীর সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে চাকরি হারানোর অভিযোগ তুলে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের কর্মচারী টরিক আহমেদ। একই সঙ্গে আইভীর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ, আগামী সিটি নির্বাচন এবং
তার বাড়িকে ঘিরে বাড়তি পুলিশি নজরদারি নিয়ে সরগরম হয়ে উঠেছে নারায়ণগঞ্জ।
টরিকের দাবি, জামিনে মুক্ত হয়ে বাড়ি ফেরার পর গত বুধবার রাতে আইভীর সঙ্গে দেখা করতে যান তিনি। সে সময় তোলা একটি ছবি ফেসবুকে পোস্ট করার পরদিন তাকে সিটি করপোরেশনে ডেকে পাঠানো হয়।
টরিকের অভিযোগ, প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খান তাকে আইভীর বাসায় যাওয়া এবং ছবি তোলার বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। পরে তাকে করা হয় চাকরিচ্যুত। তবে এই অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছেন সিটি করপোরেশনের প্রশাসক সাখাওয়াত হোসেন খান। তিনি বলেছেন, ‘সাবেক মেয়র আইভীর সঙ্গে দেখা করায় নয়, অফিসে হাজিরা দিয়ে কর্মস্থল ত্যাগ করার কারণে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে তাকে।’
গত ৩ জুন রাতে গাজীপুরের কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পান ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভী। রাত সাড়ে ১২টার দিকে নারায়ণগঞ্জের নিজ বাসভবন চুনকা কুটিরে পৌঁছান তিনি। তার ফেরার খবরে বাড়ির সামনে ভিড় করেন সমর্থক ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা। দীর্ঘ কারাবাস শেষে আইভীর প্রত্যাবর্তনকে ঘিরে একদিকে তার অনুসারীদের মধ্যে উৎসাহ তৈরি হয়েছে, অন্যদিকে স্থানীয় রাজনীতিতেও শুরু হয়েছে নতুন হিসাব-নিকাশ।
আইভীর আইনজীবী ও ন্যাপ নেতা অ্যাডভোকেট আওলাদ হোসেন বলেছেন, ‘মানুষের প্রত্যাশা তিনি সামনের নির্বাচনে লড়বেন, আবারও নির্বাচিত হবেন। তবে আপাতত তিনি বিশ্রামে আছেন, পরিবারকে সময় দিচ্ছেন। সবার সঙ্গে আলোচনা করেই তিনি ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেবেন; প্রস্তুতি নেবেন নির্বাচনের।’
কারামুক্তির পর গণমাধ্যমে খুব বেশি কথা বলেননি আইভী। বাড়িতে পৌঁছে তিনি শুধু বলেছেন, ‘বর্তমান সরকার বলেছে তারা মানবিক সরকার গঠন করবে। আমি চাই সবাইকে নিয়ে মানবিক সরকার গঠিত হোক। জেলে আমার মতো আরও অনেক মা আছেন, তারা নিরপরাধ। আশা করি সরকার তাদের প্রতিও সদয় হবে।’
আইভীর সম্ভাব্য রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্রশাসক ও মহানগর বিএনপির আহ্বায়ক সাখাওয়াত হোসেন খান বলেছেন, ‘সেলিনা হায়াৎ আইভী নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের দায়িত্ব নেবেন কি না, সেটা তার বিষয়। তবে আওয়ামী লীগ যেহেতু নিষিদ্ধ, কাউকে নারায়ণগঞ্জে পুনর্বাসনের সুযোগ দেওয়া হবে না। যদি এ ধরনের কোনো কর্মকাণ্ডে তিনি জড়িত হন, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে তাহলে প্রশাসন।’
একই ধরনের প্রতিক্রিয়া এসেছে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) থেকেও। দলের নারায়ণগঞ্জ মহানগরের সদস্য সচিব আশিকুর রহমান চৌধুরী বলেছেন, ‘ডা. সেলিনা হায়াৎ আইভীর মুক্তিকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ ও তাদের সমর্থকদের মধ্যে যে উচ্ছ্বাস দেখা যাচ্ছে, তা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনার পরিপন্থী। আদালতের জামিন কোনো ব্যক্তিকে রাজনৈতিকভাবে দায়মুক্ত করে না। আসন্ন সিটি নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যদি নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের রাজনীতি পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা হয়, তাহলে গণতান্ত্রিক উপায়ে তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হবে।’
তবে বিষয়টি আইনি দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার আহ্বান জানিয়েছে জামায়াতে ইসলামী। নারায়ণগঞ্জ মহানগর জামায়াতের আমির মাওলানা আব্দুল জব্বার বলেছেন, ‘আদালত আইনের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত দিয়েছেন। দেশের প্রতিটি নাগরিকের ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার রয়েছে। তার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ রয়েছে, সেগুলোর সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ বিচার হওয়া প্রয়োজন। কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নন।’
এদিকে আইভীর মুক্তির পর তার বাড়ির সামনে নজরদারি বাড়িয়েছে জেলা পুলিশ। অতিরিক্ত সিসি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে এবং সাদা পোশাকে পুলিশ সদস্যদের টহলও জোরদার করা হয়েছে। জেলা পুলিশের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) তারেক আল মেহেদী বলেছেন, ‘তিনি একজন সাবেক মেয়র। তার নিরাপত্তার বিষয়টি আমরা বিবেচনায় রেখেছি। পাশাপাশি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। জামিনে থাকা অবস্থায় তিনি স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারবেন, তবে নিষিদ্ধ কোনো সংগঠনের ব্যানারে রাজনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারবেন না। সেক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব আমরা। সার্বিক বিষয়েই নজরদারি থাকবে আমাদের।’
সিসি ক্যামেরা বসানোর খবর ছড়িয়ে পড়লে আইভীর বাড়িতে মানুষের যাওয়া-আসা কমে যায়। তবে আইভীর ঘনিষ্ঠজনরা জানিয়েছেন, তারা দেখা করতে গেলে আইভী তাদের নিজের জেলজীবনের অভিজ্ঞতা শুনিয়েছেন।
চব্বিশের পাঁচ আগস্ট গণঅভ্যুত্থানের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হয়। এরপর ১৮ আগস্ট সেলিনা হায়াৎ আইভীকে মেয়রের পদ থেকে অপসারণ করে তৎকালীন অন্তর্বর্তী সরকার। ২০২৫ সালের ৮ মে রাতে গ্রেপ্তার হন তিনি।




