বস্তা সংকটে শরণখোলায় ধান সংগ্রহে ধীরগতি, বিপাকে চাষিরা

ছবি: আগামীর সময়
বাগেরহাটের শরণখোলায় বস্তা সংকটের কারণে প্রায় এক সপ্তাহ ধরে ব্যাহত হচ্ছে সরকারি ধান সংগ্রহ কার্যক্রম।
চলতি বোরো মৌসুমে উপজেলায় ৭৩০ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হলেও কার্যক্রম শুরুর ১৫ দিন পরও সংগ্রহ হয়েছে মাত্র ৫৬ দশমিক ১২০ মেট্রিক টন। এতে উৎপাদিত ধান নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন কৃষকরা।
গত ২৪ মে সরকারি ধান সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু হয়। তবে গুদামে বস্তা সংকট, সংরক্ষণের সীমাবদ্ধতা এবং সরকারি মানদণ্ড পূরণের জটিলতায় ধান বিক্রি করতে হিমশিম খাচ্ছেন কৃষকরা। মাঠ ও বাড়ির উঠানে কাদা-পানি থাকায় অনেককে সড়কের ওপর ধান শুকাতে হচ্ছে। শুকানোর পরও সংরক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা না থাকায় বাধ্য হয়ে কম দামে ফড়িয়াদের কাছে ধান বিক্রি করছেন তারা।
কৃষকদের অভিযোগ, সরকারি গুদামে ধান সরবরাহ করতে নির্ধারিত আর্দ্রতা, পরিচ্ছন্নতা ও মানসংক্রান্ত বিভিন্ন শর্ত পূরণ করতে হয়। এসব শর্ত মেনে ধান প্রস্তুত করতে অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় হয়। এর মধ্যে গুদামে বস্তা না থাকায় কয়েকদিন ধরে ধান গ্রহণ কার্যক্রমও বন্ধ রয়েছে। বৃষ্টির কারণে ধান শুকানো ও সংরক্ষণ আরও কঠিন হয়ে পড়েছে।
রায়েন্দা ইউনিয়নের আমতলী গ্রামের কৃষক বিপুল মাঝি এ বছর প্রায় ২০০ মণ ধান উৎপাদন করেছেন। ধানসাগর ইউনিয়নের রাজাপুর গ্রামের কৃষক সঞ্জয় চৌকিদারের উৎপাদন হয়েছে ২৫০ মণ। তারা জানান, সরকারি নিয়ম মেনে ধান বিক্রি করতে গেলে সময় ও অর্থ দুটোই বেশি ব্যয় হয়। আবার দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করে রাখার মতো পর্যাপ্ত জায়গাও নেই। ফলে বাধ্য হয়ে কম দামে ফড়িয়াদের কাছে ধান বিক্রি করতে হচ্ছে।
খোন্তাকাটা ইউনিয়নের তালতলী গ্রামের কৃষক মো. সুজন বললেন, আমি এক হাজার ৪৪০ টাকা মণ দরে এখন পর্যন্ত ৫৭ মণ ধান সরকারি গুদামে বিক্রি করেছি। এখনো ৭৫ মণ ধান রয়েছে। এর মধ্যে বেশ কিছু ধান গুদামে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত করে রাখা হয়েছে, কিন্তু বস্তা না থাকায় দিতে পারছি না। আবহাওয়া খারাপ থাকায় বাকি ধানও শুকাতে পারছি না।
বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের শরণখোলা উপজেলা শাখার সভাপতি মুহাম্মদ ছরোয়ার হুসাইন বাদল বলছিলেন, আমি নিজেও একজন কৃষক। তিন একর জমিতে বোরো চাষ করে প্রায় ২০০ মণ ধান উৎপাদন করেছি। সব ধানই সরকারিভাবে বিক্রির পরিকল্পনা ছিল। অধিকাংশ ধান গুদামে দেওয়ার জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। কিন্তু বস্তা সংকটের কারণে জমা দিতে পারছি না। অন্যদিকে জায়গার অভাবে বাড়িতেও রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। বৃষ্টির কারণে ধানের মান ধরে রাখাও সম্ভব হচ্ছে না। এখন ধান নিয়ে উভয় সংকটে পড়েছি।
তিনি আরও বললেন, গত পাঁচ-ছয় দিন ধরে খাদ্য গুদামে বস্তা সংকট চলছে। অথচ সংকট নিরসনে দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ নেই। বর্ষা মৌসুম সামনে, তাই সময়মতো ধান সংগ্রহ করা না গেলে সরকারের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন ব্যাহত হবে। পাশাপাশি কৃষকদেরও বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হবে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা দেবব্রত সরকার জানান, চলতি মৌসুমে শরণখোলা উপজেলায় ৬ হাজার ৫৩৫ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। উৎপাদন হয়েছে প্রায় ৩৫ হাজার মেট্রিক টন ধান। অনুকূল আবহাওয়া ও রোগবালাইয়ের আক্রমণ কম থাকায় ফলন সন্তোষজনক হয়েছে।
তিনি বলেন, খাদ্য গুদামে বস্তা সংকটের কারণে ধান বিক্রিতে ধীরগতি দেখা দিয়েছে। সময়মতো ধান বিক্রি করতে না পারলে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। এ সুযোগে ফড়িয়ারা কম দামে ধান কিনে নিচ্ছেন। উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য না পেলে ভবিষ্যতে বোরো চাষে কৃষকদের আগ্রহ কমে যেতে পারে।
তিনি আরও বলেন, প্রত্যেক উপজেলায় ধান সংরক্ষণের জন্য আধুনিক গুদাম ও ড্রায়ার মেশিন থাকলে কৃষকদের এমন সমস্যায় পড়তে হতো না। শরণখোলায় এ ধরনের একটি প্রকল্প বাস্তবায়নের জন্য কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সঙ্গে যোগাযোগ চলছে।
শরণখোলা খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আশরাফুল ইসলাম উল্লেখ করেন, বস্তা সংকটের কারণে ধান সংগ্রহে সাময়িক সমস্যা দেখা দিয়েছে। বিষয়টি খুলনা আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রণ কার্যালয়কে জানানো হয়েছে। বস্তা পাওয়া গেলে পুনরায় পূর্ণোদ্যমে ধান সংগ্রহ কার্যক্রম শুরু করা হবে।




