ভিডিও গেমে ফুটবলের তিন দশক

তিন দশক আগে যে ভিডিও গেম ছিল স্রেফ পর্দায় কিছু রঙিন বিন্দুর নড়াচড়া, আজ সেই ফুটবল গেম বিলিয়ন ডলারের বিশাল ইন্ডাস্ট্রি। শুধু বিনোদন নয়; বরং ফুটবল সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ এখন। লিখেছেন এহতেশাম শোভন
মনে আছে সেই নব্বইয়ের দশকের বিকালগুলোর কথা? স্কুল থেকে ফিরে
টিভির সামনে বসে কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে দল বেঁধে ভিডিও গেমের দোকানে যাওয়ার সেই চেনা
আনন্দ? তখন চারকোনা বাক্সের মতো বল আর কাগজের মতো চ্যাপ্টা খেলোয়াড়দের স্ক্রিনে দৌড়াতে
দেখেই আমাদের উত্তেজনার শেষ ছিল না। আর আজ? প্লেস্টেশন বা এক্সবক্সের সামনে বসলে মনে
হয় সত্যি সত্যি স্টেডিয়ামের গ্যালারিতে বসে আছি। ঘাসের রঙ থেকে শুরু করে খেলোয়াড়দের
কপালের ঘাম— সবকিছুই এত আসল যে, চোখ ফেরানো দায়। মাত্র ৩০ বছরে আমাদের শৈশবের সেই সাদামাটা
গেম কীভাবে আজকের এই জাদুকরী দুনিয়ায় রূপ নিল, চলুন সে গল্পটাই
একটু জেনে নেওয়া যাক।
নব্বইয়ের দশক: পিক্সেলের বল আর ফুটবল গেমের শুরুটা
১৯৯০-এর দশকের শুরুতে যারা গেম খেলতেন, তাদের কাছে ফুটবল গেমের দুনিয়াটা ছিল ভীষণ সরল। ১৯৯৩ সালের শেষের দিকে বাজারে আসে ‘ফিফা ইন্টারন্যাশনাল সকার’। গেমটি ফুটবল গেমিংয়ের চেহারা বদলে দেয়। এর আগে গেমগুলো শুধু ওপর থেকে দেখা যেত; কিন্তু ফিফা প্রথমবার কোনাকুনি কোণ থেকে খেলা দেখার সুযোগ করে দেয়। ওই সময় চারকোনা পিক্সেলের বল আর সামান্য কিছু বোতাম টিপে গোল দেওয়ার যে আনন্দ, তা আজকের কোনো হাই-গ্রাফিকস গেমের চেয়ে কম ছিল না।
১৯৯৮ সালের দিকে গেমগুলো চ্যাপ্টা রূপ ছেড়ে কিছুটা ত্রিমাত্রিক বা থ্রিডি হতে শুরু করে। ‘ফিফা ৯৮’ গেমে যখন প্রথমবার খেলোয়াড়দের নাম আর চমৎকার সব গান যোগ করা হলো, তখনকার ফুটবল গেমপ্রেমীদের মনে হতো সত্যি বুঝি বিশ্বকাপের মাঠে নেমে পড়েছেন!
২০০০-এর দশক: ফিফা নাকি পেস?
নতুন শতাব্দীতে পা দেওয়ার পর সকার গেমের গ্রাফিকস আর খেলার ধরনে এক বিশাল পরিবর্তন আসে। এ সময়টা ছিল মূলত বন্ধুদের আড্ডায় ‘ফিফা ভালো নাকি পেস ভালো’— তা নিয়ে তুমুল তর্কের যুগ। ২০০০-০৬ সাল পর্যন্ত কোনামির ‘পেস’ গেমারদের মনে রাজত্ব করেছিল। কারণ পেসে ড্রিবলিং করা বা গোল দেওয়া মোটেও সহজ ছিল না, একদম আসল ফুটবলের মতোই মাথা খাটিয়ে খেলতে হতো।
অন্যদিকে, ইএ স্পোর্টসের ‘ফিফা’ গেমপ্লের দৌড়ে কিছুটা পিছিয়ে থাকলেও ২০০৮ সালের পর তারা এক দুর্দান্ত চাল চালে। নিয়ে আসে ‘আলটিমেট টিম’ মোড। ফলে গেমাররা নিজেদের পছন্দের খেলোয়াড়দের কিনে স্বপ্নের দল সাজানোর এবং অনলাইনের মাধ্যমে অন্য বন্ধুদের সঙ্গে খেলার সুযোগ পেল।
২০১০-এর দশক: আসল ম্যাচের অভিজ্ঞতা
২০১০ সালের পর থেকে গেম কোম্পানিগুলো গেমটিকে যতটা সম্ভব বাস্তবসম্মত করার চেষ্টায় মন দিল। নতুন সব প্রযুক্তির কল্যাণে খেলোয়াড়দের মুখাবয়ব, জার্সি আর স্টেডিয়ামের আলো-ছায়ার খেলা একদম হুবহু টিভির লাইভ ম্যাচের মতো দেখাতে শুরু করল।
২০২০ থেকে বর্তমান: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আর নতুন যুগের জাদু
গত কয়েক বছরে ফুটবল গেমের দুনিয়ায় এসেছে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন। প্রযুক্তির দিক থেকে এ যুগে যুক্ত হয়েছে ‘হাইপারমোশন’ প্রযুক্তি। বড় বড় তারকার শরীরে বিশেষ স্যুট পরিয়ে তাদের দৌড়ানো, শট নেওয়া বা ট্যাকল করার নিখুঁত নড়াচড়া রেকর্ড করে সরাসরি গেমে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে।
আজকের গেমগুলোতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এতটাই উন্নত যে, ভার্চুয়াল খেলোয়াড়রা মাঠের ফাঁকা জায়গা নিজে থেকেই বুঝে নেয় এবং আসল ফুটবলারদের মতোই আচরণ করে। এ ছাড়া কোনামির ‘ইফুটবল’ বা নতুন আসতে যাওয়া ‘ইউএফএল’-এর মতো গেমগুলো এখন বিনামূল্যে খেলা যায়।




