নিলামের শর্ত ভেঙে পদ্মার তলদেশ থেকে বালু উত্তোলন, হুমকিতে ৫ হাজার একর ফসলি জমি

ছবি: আগামীর সময়
শরীয়তপুরের নড়িয়ায় পদ্মার চরে স্তূপ করা বালু অপসারণের সরকারি নিলামের শর্ত লঙ্ঘন করে নদীর তলদেশ থেকে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন চলছে। প্রায় ৪০টি ড্রেজার দিয়ে অপরিকল্পিতভাবে বালু তোলার কারণে নদী তীরবর্তী বসারচর ও চরআত্রা মৌজায় তীব্র ভাঙন দেখা দিয়েছে। বিলীন হওয়ার আশঙ্কায় পড়েছে অন্তত ৫ হাজার একর তিন ফসলি কৃষিজমি।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, নড়িয়া উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ফরিদ আহমেদ রয়েলের নেতৃত্বে একটি প্রভাবশালী চক্র আইন অমান্য করে এই বালু বাণিজ্য চালিয়ে যাচ্ছে। যদিও তিনি দাবি করেছেন, উপজেলা প্রশাসনের মাধ্যমে নিলামে কেনা বালুই অপসারণ করছেন তিনি।
শরীয়তপুর পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) ও উপজেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, ২০১৩ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত পদ্মার ভয়াবহ ভাঙনে নড়িয়ার ২৫ হাজার পরিবার গৃহহীন হয়। বিলীন হয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ অসংখ্য সরকারি-বেসরকারি স্থাপনা। এরপর নড়িয়াকে রক্ষায় ২০১৯ সালে ১ হাজার ৪১৭ কোটি টাকা ব্যয়ে ১০.২ কিলোমিটার ডান তীর রক্ষা বাঁধ ও ৫.৫ কিলোমিটার নদী খনন করা হয়, যার কাজ শেষ হয় ২০২৪ সালের মার্চে।
পাউবো সূত্র জানায়, ড্রেজিংয়ের সময় নদী থেকে উত্তোলিত ৮০ কোটি ঘনফুট বালু বসারচর মৌজার ফসলি জমিতে স্তূপ করে রাখা হয়েছিল। সেখান থেকে ১০ কোটি ঘনফুট বালু বিক্রির জন্য গত বছরের মার্চে নিলাম বিজ্ঞপ্তি দেয় উপজেলা প্রশাসন। ৫ কোটি ৮৮ লাখ টাকায় সেই বালু কিনে মেসার্স তাসিন তাহান কনস্ট্রাকশন, যার পক্ষে নিলামে অংশ নেন বিএনপি নেতা ফরিদ আহমেদ রয়েল। গত বছর পাঁচ মাস বালু তোলার পর বিভিন্ন অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে প্রশাসন তা বন্ধ করে দেয়। কিন্তু সম্প্রতি সেই নিলামের কাগজ দেখিয়ে আবারও ৪০টি ড্রেজার বসিয়ে বালু উত্তোলন শুরু করেছে ওই চক্র।
সরেজমিনে বসারচর এলাকায় দেখা গেছে, নদীর তীর থেকে প্রায় ৫০০ মিটার ভেতরের তলদেশ থেকে ড্রেজার দিয়ে বালু তোলা হচ্ছে। সেখান থেকে বাল্কহেড বোঝাই করে বালু চলে যাচ্ছে ঢাকা, মুন্সিগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ ও মাদারীপুরসহ বিভিন্ন জেলায়। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ড্রেজার শ্রমিক জানান, সকাল ৬টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত কোনো বাধা ছাড়াই টানা বালু তোলা হচ্ছে এবং প্রতিটি ড্রেজার প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০টি বাল্কহেড বোঝাই করছে।
এই অবৈধ ড্রেজিংয়ে সর্বস্বান্ত হচ্ছেন স্থানীয় কৃষকরা। ২০১৭ সালে ভাঙনে ঘরবাড়ি হারানো কৃষক সালাউদ্দিন মোল্যা জানান, তিন-চার বছর পর জেগে ওঠা ৮ একর জমিতে গত মৌসুমে ২৫০ মন ধান পেয়েছিলেন তিনি। কিন্তু অবৈধ ড্রেজিংয়ের কারণে শেষ সম্বলটুকুও এখন নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যাচ্ছে বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি।
অভিযোগের বিষয়ে ফরিদ আহমেদ রয়েল দাবি করেন, 'আমি নিলামের মাধ্যমে ১০ কোটি ঘনফুট বালু কিনেছি। গত বছর অর্ধেক নিতে পেরেছি, বাকিটা এখন নিচ্ছি। নদীর তলদেশ থেকে কোনো বালু কাটা হচ্ছে না, বাল্কহেড চলাচলের জন্য তীরের কাছে শুধু চ্যানেল করা হচ্ছে।'
নড়িয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আব্দুল কাইয়ুম স্পষ্ট করেন, 'নিলাম গ্রহীতাদের শর্ত অনুযায়ী শুধু তীরে স্তূপ করা বালু নেওয়া যাবে। কোনো অবস্থাতেই নদী থেকে বালু উত্তোলন করা যাবে না। নদী থেকে বালু উত্তোলনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ এখনও আসেনি, তবে বিষয়টি খতিয়ে দেখে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।' এ বিষয়ে শরীয়তপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য শফিকুর রহমান কিরণের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোনে পাওয়া যায়নি এবং হোয়াটসঅ্যাপ বার্তারও কোনো সাড়া মেলেনি।






