সুন্দরগঞ্জের পানি শোধনাগার
পানির সংকটে ৬০০ পরিবার
- ব্যয় ৪ কোটি ৫৩ লাখ ৬৫ হাজার ৪৭৩ টাকা
- ১২০০ পরিবারের মধ্যে সংযোগ পেয়েছে ৬০০
- উদ্বোধনের কয়েক মাসের মধ্যেই অচল
- এক মাসের মধ্যে চালুর আশ্বাস কর্তৃপক্ষের

ছবি: আগামীর সময়
গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ পৌরবাসীর জন্য নিরাপদ পানি সরবরাহের লক্ষ্যে সাড়ে ৪ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত আধুনিক পানি শোধনাগারটি অচল হয়ে পড়েছে উদ্বোধনের কয়েক মাসের মধ্যেই। ফলে দীর্ঘদিন ধরে বিশুদ্ধ পানির সংকটে ভুগছে পৌরসভার পাঁচটি ওয়ার্ডের অন্তত ৬০০ পরিবার। সরকারি অর্থে নির্মিত এই গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো অকেজো থাকায় ক্ষোভ ও হতাশা বাড়ছে স্থানীয়দের মধ্যে।
জানা গেছে, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির (এডিপি) আওতায় প্রায় ২০০ ঘনমিটার ধারণক্ষমতার একটি ভূগর্ভস্থ পানি শোধনাগারের নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০২২ সালে। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয় ৪ কোটি ৫৩ লাখ ৬৫ হাজার ৪৭৩ টাকা। দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে নির্মাণকাজ সম্পন্ন হয় ২০২৪ সালের জুন মাসে। একই বছরের জুলাই মাসে সেটি সুন্দরগঞ্জ পৌরসভার কাছে হস্তান্তর করে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর (ডিপিএইচই)।
প্রকল্পের আওতায় পৌরসভার প্রায় ১ হাজার ২০০ পরিবারকে নিরাপদ পানি সরবরাহের পরিকল্পনা থাকলেও বাস্তবে সংযোগ দেওয়া হয় ৬০০ পরিবারকে। তবে উদ্বোধনের মাত্র দুই মাস পরই বন্ধ হয়ে যায় পানি সরবরাহ। এরপর থেকে কার্যত অচল অবস্থায় পড়ে আছে শোধনাগারটি।
স্থানীয়দের পক্ষ থেকে জানা গেছে, পৌরসভায় চলমান নগর পরিচালনা ও অবকাঠামো উন্নয়ন (আইইউজিআইপি) প্রকল্পের আওতায় রাস্তা ও ড্রেন নির্মাণকাজের সময় ব্যাপক ক্ষতি হয় পানি সরবরাহ লাইনের। বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মিঠু হোটেল গলি থেকে পৌরসভার পেছনের অংশ পর্যন্ত প্রায় ৪০টি সংযোগ, পৌর বাজার থেকে উপজেলা স্কাউট ভবন পর্যন্ত আরও ১০টি সংযোগ এবং কলেজ মোড়, উপজেলা পরিষদ ও পৌর ভবন সড়কের প্রায় ২০টি সংযোগ। ফলে ভেঙে পড়ে পুরো পানি সরবরাহ ব্যবস্থা। ক্ষতিগ্রস্ত লাইন দীর্ঘদিন মেরামত না হওয়ায় পানি জমে শ্যাওলা পড়ে যায় শোধনাগারের ট্যাংকে। অকেজো হয়ে পড়ে আধুনিক যন্ত্রপাতিও। বর্তমানে পুরো স্থাপনাটি রয়েছে অনেকটা পরিত্যক্ত অবস্থায়।
সরেজমিন দেখা গেছে, বিশুদ্ধ পানির অভাবে ঝুঁকিপূর্ণ নলকূপ ও অপরিশোধিত পানির ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছেন স্থানীয়রা। কোনো কাজে আসছে না কোটি টাকা ব্যয়ে সরকারি প্রকল্পটি। স্থানীয়দের অভিযোগ, পৌরসভার দায়িত্ব ছিল রাস্তা ও ড্রেন নির্মাণের সময় ক্ষতিগ্রস্ত সংযোগগুলো দ্রুত মেরামত করা; কিন্তু কয়েক মাস পেরিয়ে গেলেও কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি কর্তৃপক্ষ। পৌরসভার এ অবহেলার খেসারত দিচ্ছে সাধারণ মানুষ।
স্থানীয় আব্দুল কাদের ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন, ‘সরকার কোটি কোটি টাকা খরচ করে আমাদের জন্য পানি শোধনাগার নির্মাণ করেছে; কিন্তু কয়েক মাসও ঠিকমতো চালু রাখা গেল না। এখন আমরা আবার আগের মতো নলকূপের পানির ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হচ্ছি।’
শঙ্কা প্রকাশ করে আরেক বাসিন্দা রহিমা বেগম বললেন, ‘বিশুদ্ধ পানি পেয়ে খুব খুশি হয়েছিলাম; কিন্তু হঠাৎ পানি বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর অনেক কষ্টে দিন পার করছি। এতে শিশু ও বয়স্কদের স্বাস্থ্যঝুঁকিও বেড়েছে।’
জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকির কথা তুলে ধরে সুন্দরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সার্জন ডা. মেহেদী হাসান বলেছেন, ‘বর্তমানে অগভীর নলকূপ ও অপরিশোধিত পানির ওপর নির্ভর করছে অনেক পরিবার। এতে বাড়তে পারে ডায়রিয়া, আমাশয় ও অন্যান্য পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি। নিরাপদ পানি সরবরাহ আবার দ্রুত চালু না হলে জনস্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।’
এ বিষয়ে উপজেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী খোকন রানা বললেন, ‘পানি সরবরাহ লাইনের ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো মেরামতের কাজ চলমান রয়েছে। এর মধ্যে অনেক বিচ্ছিন্ন লাইন ঠিক করা হয়েছে। যতগুলো সংযোগ বিচ্ছিন্ন আছে, সেগুলো আবার সচল করার চেষ্টা করছি। আগামী এক মাসের মধ্যে সংযোগগুলো দ্রুত চালু করতে পারব।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক ইফফাত জাহান তুলি আশ্বাস দেন, সমস্যাটি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত পানি সরবরাহ ব্যবস্থা আবার চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আশা করছি, অল্প সময়ের মধ্যেই পৌরবাসী আবারও বিশুদ্ধ পানি পাবে।




