বস্তির ছোট্ট ঘরে বদলে যাচ্ছে শিশুদের স্বপ্ন

ছবি: আগামীর সময়
রাজশাহী নগরীর ভদ্রা এলাকা। আরডিএ পার্কের ঠিক বিপরীতে রেলওয়ে কলোনির বস্তি। ঘিঞ্জি ঘর। সরু গলি। অভাবের সংসার। প্রতিদিনের জীবন চলে সংগ্রাম করে।
কেউ ভিক্ষা করেন। কেউ অন্যের বাড়িতে গৃহকর্মীর কাজ করেন। কেউ শহরের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে ভাঙারি সংগ্রহ করেন। দিন শেষে যা আয় হয়, তা দিয়েই চলে সংসার।
এই বস্তিতে স্কুল ছিল না। ছিল না শিশুদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সুযোগও। ফলে অনেক শিশুর শৈশব কেটে যেত জীবিকার সংগ্রামে। কেউ বাবা-মায়ের সঙ্গে ভাঙারি সংগ্রহে যেত। কেউ ঘরের কাজে সহযোগিতা করত। আবার কেউ জড়িয়ে পড়ত নানা অনানুষ্ঠানিক শ্রমে।
তবে সেই বাস্তবতা এখন বদলাচ্ছে। বস্তির ছোট্ট একটি ঘরে জ্বলেছে শিক্ষার আলো। সেখানে গড়ে উঠেছে ‘বিকল্প পাঠশালা’। ‘সম্পর্ক সমাজকল্যাণ সংস্থা’র উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত এই স্কুলে বিনা পারিশ্রমিকে পড়াচ্ছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও রাজশাহী কলেজের একদল তরুণ।
প্রায় অর্ধশত শিশু এখন নিয়মিত এই স্কুলে আসে। শনিবার থেকে বৃহস্পতিবার। সপ্তাহে ছয় দিন চলে ক্লাস। প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত দেওয়া হয় প্রাথমিক শিক্ষা। স্কুলটির আয়তন মাত্র ১০০ বর্গফুট। জায়গা ছোট। কিন্তু স্বপ্নগুলো বড়। কেউ শিখছে যোগ-বিয়োগ। কেউ বানান। কেউ হাতের লেখা। আবার কেউ রঙ-পেনসিল হাতে আঁকছে নিজের কল্পনার পৃথিবী।
শিশু শ্রেণির শিক্ষার্থী কামরুলের কাছে এই স্কুল যেন আনন্দের নতুন ঠিকানা। সে বলেছে, ‘অনেক কিছু শেখায়। যোগ, বিয়োগ, ড্রয়িং আর বানান- সবকিছুই এই স্কুল থেকে শেখানো হচ্ছে।’
তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী জেসমিনও বদলে যাওয়া সময়ের কথা বলে। তার ভাষায়, ‘আমাগো এই বস্তিতে কোনো স্কুল ছিল না। এখন ভার্সিটির ভাইয়েরা নিয়মিত পড়াশোনা করান। সপ্তাহে ছয় দিন আমরা স্কুলে আসি।’
এই পরিবর্তনের পেছনে রয়েছেন একদল তরুণ স্বেচ্ছাসেবী। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদের গ্রাফিকস ডিজাইন বিভাগের শিক্ষার্থী তাসনুভা আমিন তাদের একজন। নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি তিনি নিয়মিত শিশুদের ক্লাস নেন।
তাসনুভা বললেন, ‘এই এলাকাটি খুবই অবহেলিত। এখানকার মানুষ অন্যের বাড়িতে কাজ করেন। কেউ রাজমিস্ত্রি, কেউ কেয়ারটেকার। তাদের শ্রমেই অনেক পরিবারের জীবন চলে। অথচ তাদের সন্তানরাই সবচেয়ে বেশি অবহেলিত।’
এই স্বপ্নের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বয়স্কদের শিক্ষাও। প্রতি শুক্রবার চালু হয়েছে বয়স্ক শিক্ষা কার্যক্রম। ফলে একই বস্তিতে শিশুদের পাশাপাশি বড়রাও শিখছেন পড়তে ও লিখতে।
সম্পর্ক সমাজকল্যাণ সংস্থার সভাপতি গোপালদেব শর্মা বলেন, সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার আওতায় আনতেই এই স্কুল প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। বর্তমানে ৪৫ থেকে ৫০ জন শিশু নিয়মিত পড়াশোনা করছে। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় ১৫ জন শিক্ষার্থী স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে ক্লাস নিচ্ছেন।
তাদের পরিকল্পনা শুধু শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বস্তিবাসীর স্বাস্থ্যসচেতনতা ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিয়েও ভবিষ্যতে কাজ করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এই ছোট্ট স্কুলটিও এখন অনিশ্চয়তার মুখে।
বস্তিবাসী ও স্কুল পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের দাবি, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ বস্তি উচ্ছেদের জন্য নোটিস দিয়েছে। এতে ঘর হারানোর পাশাপাশি শিশুদের পড়াশোনাও বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
রোজিনা বেগম বলেন, ‘আমাদের এই বস্তিতে কোনো স্কুল ছিল না। বিশ্ববিদ্যালয়ের মামারা স্কুল চালু করে ছেলে-মেয়েদের পড়াশোনার ব্যবস্থা করেছে। এখন শুনছি বস্তি ভেঙে দেওয়া হবে। তাহলে আমরা কোথায় যাব? সন্তানদের পড়াশোনাই বা কোথায় হবে?’
জেসমিন আক্তারও একই দুশ্চিন্তার কথা বলেন। তার পরিবার এখানে বসবাস করছে ৩০ থেকে ৪০ বছর ধরে। নিজেরাই ঠিকমতো খেতে পারেন না। সন্তানদের পড়াশোনার খরচ বহন করাও কঠিন।
তিনি বলেন, ‘এই স্কুল আমাদের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে। এখন যদি বস্তি ভেঙে দেওয়া হয়, তাহলে আমরা যাব কোথায়? আর আমাদের সন্তানদের পড়াশোনা হবে কোথায়?’
বস্তির বাসিন্দাদের দাবি, এখানে প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ পরিবারের বসবাস। স্থানীয়দের অনেকেই তিন-চার দশক ধরে এখানে থাকছেন। তাদের অধিকাংশই নিম্ন আয়ের মানুষ।
রাজশাহী মহানগর বিপ্লবী দলের সদস্যসচিব মো. ফয়সাল শেখ বলেন, বস্তিতে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ শিশু নিয়মিত পড়াশোনা করছে। তাদের অনেকের বাবা-মা ভিক্ষা করেন, গৃহকর্মী হিসেবে কাজ করেন কিংবা ভাঙারি সংগ্রহ করেন।
তার মতে, এমন একটি এলাকায় স্কুল প্রতিষ্ঠা করা গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। এর সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজ শিক্ষার্থীদের স্বেচ্ছাসেবী কার্যক্রমও প্রশংসার দাবি রাখে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষক ড. মো. ফজলুল হক বলেন, পিছিয়ে পড়া শিশুদের শিক্ষার মূলধারায় ফিরিয়ে আনতে এমন উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। শিক্ষা শুধু পড়তে-লিখতে শেখায় না। এটি আত্মবিশ্বাস তৈরি করে। ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানের পথ খুলে দেয়। বাড়ায় সামাজিক মর্যাদাও।
তবে তার মতে, এই উদ্যোগ টিকিয়ে রাখতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। বস্তি উচ্ছেদের কোনো সিদ্ধান্ত হলে তার আগে বাসিন্দাদের পুনর্বাসন নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে শিশুদের শিক্ষার ধারাবাহিকতাও রাখতে হবে। কারণ একটি শিশুকে স্কুলে আনা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, তাকে স্কুলে ধরে রাখা তার চেয়েও বেশি জরুরি।
রেলওয়ে কলোনির এই বস্তিতে হয়তো এখনো অভাব আছে। আছে অনিশ্চয়তা। আছে উচ্ছেদের ভয়ও। তবু ১০০ বর্গফুটের ছোট্ট ঘরটিতে প্রতিদিন যে শিশুরা বই খুলে বসে, তাদের চোখে সেই ভয়কে ছাপিয়ে উঠছে অন্য এক ছবি।
কেউ হতে চায় শিক্ষক। কেউ বড় কর্মকর্তা। কেউ শুধু চায়- ভালোভাবে পড়াশোনা করে নিজের জীবনটা বদলাতে।
ছোট্ট পাঠশালাটি তাই শুধু একটি স্কুল নয়, এটি বস্তির শিশুদের জন্য স্বপ্ন দেখার একটি জায়গা। আর সেই স্বপ্নটুকু বাঁচিয়ে রাখাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
বস্তি উচ্ছেদের বিষয়ে জানতে বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক ফরিদ আহমেদকে একাধিকবার কল করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
এই বাস্তবতা তাকে নাড়া দিয়েছে। তাই সুযোগ পেলেই তিনি ছুটে আসেন বস্তির ছোট্ট স্কুলটিতে। তার বিশ্বাস, এই শিশুরাও সমাজেরই অংশ।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা বিভাগের শিক্ষার্থী কামরুল হাসানও মনে করেন, সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের শিক্ষার আওতায় আনা সামাজিক দায়িত্ব। তার ভাষায়, ‘শুধু বস্তির শিশু বলে তাদের অবহেলা করা যায় না। তারাও সমাজের অংশ। তারা শিক্ষার আলো থেকে দূরে থাকবে- এটা আমরা চাই না।’
স্কুল পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাও দেখছেন পরিবর্তন
স্কুল কমিটির উপদেষ্টা ও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. গোলাম সারোয়ার বলেন, এখানকার অনেক শিশু ১০-১২ বছর বয়সেই কাজে যুক্ত হয়ে যায়। তাদের সেই বাস্তবতা থেকে বের করে শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত করাই এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য।
তার মতে, স্কুলটি চালুর পর বস্তিবাসীর মধ্যেও আশার জন্ম হয়েছে। এখন তারা স্বপ্ন দেখছেন, তাদের সন্তানরাও পড়াশোনা শিখবে। একদিন ভালো জায়গায় যাবে।





