হিমাগার মালিকরা বেকায়দায়, লোকসানে আলু উত্তোলনে আগ্রহ নেই কৃষকের

ছবি: আগামীর সময়
আলু উৎপাদনে খরচ হয়েছে কেজিপ্রতি ১৭ টাকা। এর মধ্যে কেজিপ্রতি প্রায় ৭ টাকা হিমাগার ভাড়া দিতে হচ্ছে। সব মিলিয়ে প্রতি কেজি আলুতে খরচ হয়েছে ২৪ টাকা। অথচ হিমাগার থেকে বের করে বিক্রি করতে হচ্ছে সর্বোচ্চ ১২ টাকায়। ফলে লোকসানের ভয়ে হিমাগারে রাখা আলু তুলতেও সাহস পাচ্ছেন না অনেক কৃষক। রংপুরের ৪২টি হিমাগারে এখনো প্রায় দেড় লাখ মেট্রিক টন আলু মজুত রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে বড় অঙ্কের টাকা লোকসানের আশঙ্কা করছেন হিমাগারমালিকেরাও।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, রংপুরের ৪২টি হিমাগারের মোট ধারণক্ষমতা চার লাখ ৭০ হাজার ৬০০ মেট্রিক টন। এর বিপরীতে চলতি মৌসুমে আলু সংরক্ষণ করা হয়েছে চার লাখ ৮৮ হাজার ৬৩৮ মেট্রিক টন। এর মধ্যে খাবার আলু তিন লাখ ২৪ হাজার ৯৪৮ মেট্রিক টন এবং বীজ আলু এক লাখ ৬৩ হাজার ৬৯০ মেট্রিক টন। গত ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত হিমাগার থেকে প্রায় আড়াই লাখ মেট্রিক টন খাবার আলু এবং ছয় হাজার মেট্রিক টন বীজ আলু বের হয়েছে। গত জুন মাস থেকে গড়ে প্রতি মাসে ৫০ হাজার মেট্রিক টন খাবার আলু উত্তোলন করা হয়েছে বলেও সূত্র জানায়।
কৃষকেরা জানান, রংপুরে চলতি মৌসুমে আলু চাষ করে আবারও লোকসানের মুখে পড়েছেন তারা। উৎপাদন খরচের তুলনায় বাজারদর অনেক কম হওয়ায় সংরক্ষিত আলু বিক্রি করে খরচের অর্ধেকও তুলতে পারছেন না অনেকে। গত বছর লোকসান গুনেছেন—এমন অনেক কৃষক এবার ঋণ করে ভালো দামের আশায় আলু হিমাগারে রেখেছিলেন। কিন্তু বাজারের পরিস্থিতি বদলায়নি। বরং লোকসানের বোঝা আরও বাড়ছে।
তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, এ বছর বীজ, সার, কীটনাশক, সেচ ও শ্রমিকের মজুরিসহ আলু উৎপাদনে খরচ বেড়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে হিমাগারের ভাড়া ও সংরক্ষণ খরচ। কিন্তু বাজারে আলুর পাইকারি দাম কমে যাওয়ায় উৎপাদন খরচের তুলনায় অনেক কম দামে বিক্রি করতে হচ্ছে তাদের।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বর্তমানে হিমাগার গেটে প্রতি কেজি আলু বিক্রি হচ্ছে সর্বোচ্চ ১২ টাকা দরে। খুচরা বাজারে তা বিক্রি হচ্ছে ১৮ থেকে ২০ টাকায়। এর মধ্যে চলতি মাসের শেষ দিকে বাজারে আসতে শুরু করবে নতুন আলু। ফলে সংরক্ষিত আলুর দাম আরও কমে যাওয়ার আশঙ্কা করছেন কৃষকেরা। এ অবস্থায় অনেকেই হিমাগার থেকে আলু উত্তোলন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
রংপুরের গঙ্গাচড়ার চেংমারী এলাকার কৃষক শওকত আলী জানান, গত বছরও আলু চাষ করে লোকসান গুনেছেন তিনি। এবার ভালো দাম পাওয়ার আশায় ঋণ করে হিমাগারে আলু রেখেছিলেন। কিন্তু বর্তমান বাজারদরে আলু উত্তোলন করলে গাড়িভাড়া ও হিমাগারের ভাড়াই উঠবে না। উল্টো নিজের পকেট থেকে টাকা দিতে হবে। তাই হিমাগারে রাখা আলু পড়ে থাকার উপক্রম হয়েছে।
রংপুর নগরীর রঘুবাজার এলাকার কৃষক ভুপাল চন্দ্র রায় বর্তমানে হিমাগার থেকে আলু তোলা বন্ধ রেখেছেন। কারণ, এ মুহূর্তে আলু উত্তোলন করলে প্রতি কেজিতে তাঁর লোকসান হবে কমপক্ষে ১২ টাকা। তিনি জানান, নগরীর সবুজ বাংলা ও অপু মুন্সী হিমাগারে মোট ৫০০ বস্তা আলু রেখেছেন। বর্তমানে হিমাগার গেটে প্রতি কেজি আলু বিক্রি হচ্ছে ১২ টাকায়। অথচ উৎপাদন খরচ, হিমাগার ভাড়া, বস্তা প্যাকিং ও বহনসহ অন্যান্য খরচ মিলিয়ে প্রতি কেজিতে খরচ পড়েছে অন্তত ২৪ টাকা। এমন পরিস্থিতিতে শুধু তিনি নন, তার এলাকার অনেক কৃষকই হিমাগার থেকে আলু উত্তোলন প্রায় বন্ধ রেখেছেন। গত বছরও শেষ পর্যন্ত তিনি আলু উত্তোলন করেননি। এতে তার প্রায় আট লাখ টাকা লোকসান হয়েছিল বলে জানান তিনি।
মিঠাপুকুরের পায়রাবন্দ বেলতলী এলাকার কৃষক হায়দার আলী জানান, কিছুদিন আগে তিনি হিমাগার থেকে ২৫০ বস্তা আলু তুলে বিক্রি করেছেন। প্রতি কেজি আলু বিক্রি করেছেন ১৫ টাকা দরে। বর্তমানে আলুর দাম ১২ টাকায় নেমে আসায় অবশিষ্ট ৫০০ বস্তা আলু থেকে কত টাকা উঠবে, তা নিয়ে দুশ্চিন্তায় আছেন তিনি। বড় অঙ্কের টাকা লোকসানের আশঙ্কায় শেষ পর্যন্ত বাকি আলু আর তুলবেন না বলে সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
রংপুর কৃষি বিপণন অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, জেলার ৪২টি হিমাগারে প্রায় পাঁচ লাখ মেট্রিক টন আলু সংরক্ষণ করেন কৃষক ও ব্যবসায়ীরা। কিন্তু উৎপাদন খরচের তুলনায় বর্তমান বাজারে দাম কম হওয়ায় আলু উত্তোলনে অনীহা দেখা দিয়েছে সংরক্ষণকারীদের মধ্যে। ৩১ অক্টোবর পর্যন্ত প্রায় দেড় লাখ মেট্রিক টন আলু হিমাগারগুলোতে মজুত আছে বলেও সূত্র জানায়।
এদিকে কৃষকেরা আলু উত্তোলন না করায় বিপাকে পড়েছেন হিমাগারমালিকেরাও। অনেক হিমাগার কর্তৃপক্ষ কৃষকদের আলু উত্তোলনের জন্য নোটিশ দিলেও তাঁরা আলু নিতে চাইছেন না। বদরগঞ্জের শাহজালাল হিমাগার এবং গঙ্গাচড়ার এমএনটি হিমাগারের ব্যবস্থাপক সুভাস মুখার্জি বলেন, হিমাগার দুটির ধারণক্ষমতা ২৪ হাজার মেট্রিক টন। সংরক্ষিত আলুর ৫০ শতাংশ এখনো পড়ে আছে। হিমাগার গেটে বর্তমানে সর্বোচ্চ ১২ টাকায় বিক্রি হওয়ায় লোকসানের ভয়ে কৃষকদের আলু উত্তোলনে আগ্রহ নেই। এতে হিমাগারমালিকদেরও লোকসানে পড়তে হবে বলে জানান তিনি।



