‘বউত কিছু হাইয়্যো, দইজ্জা ন হাইয়্যো’

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত মানেই বালিয়াড়ি, ঢেউ আর সাগরলতার বিস্তৃত সবুজ। জোয়ার-ভাটার সঙ্গে এই বালিয়াড়ির সম্পর্ক শুধু সৌন্দর্যের নয়, উপকূলের সুরক্ষারও। কিন্তু সেই বালিয়াড়ির বুকেই এখন ফেলা হচ্ছে মাটি। বসানো হচ্ছে সড়ক নির্মাণের সামগ্রী। তৈরি হচ্ছে চার লেনের স্থায়ী সড়ক।
কক্সবাজার শহরের সুগন্ধা সৈকতে প্রতিবেশ সংকটাপন্ন এলাকার (ইসিএ) বালিয়াড়ি ভরাট করে চলছে ৬৩ কোটি ৫০ লাখ টাকার ‘শহর রক্ষা বাঁধ’ প্রকল্প। জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা জাইকা’র অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন প্রকল্পটির প্রথম ধাপে সুগন্ধা সৈকত থেকে কলাতলী পর্যন্ত ১ দশমিক ২ কিলোমিটার সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে। সড়কটির প্রস্থ হবে ২৮ মিটার।
সৈকতের বালিয়াড়ি ভরাট করে এভাবে স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ উচ্চ আদালতের নির্দেশনার সঙ্গে সাংঘর্ষিক। এমন অভিযোগ তুলে ইতিমধ্যে নড়েচড়ে বসেছেন পরিবেশবাদী ও আইনজীবীরা। নির্মাণকাজ বন্ধ না হলে আদালত অবমাননার মামলা করার হুঁশিয়ারিও এসেছে।
সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী ও ‘হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ’ এইচআরপিবি’র চেয়ারম্যান মনজিল মোরসেদ কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান, পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আদনান চৌধুরী, প্রকল্প পরিচালক এ এস এম রাশেদুর রহমান এবং জাইকার বাংলাদেশ প্রতিনিধি তাকাহাসকি জানকোর কাছে আদালত অবমাননার নোটিশ পাঠিয়েছেন।
নোটিশে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নির্মাণকাজ বন্ধ করতে বলা হয়েছে। অন্যথায় সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার মামলা করার কথা জানানো হয়েছে।
প্রকল্পটির নাম ‘শহর রক্ষা বাঁধ’। তবে বাস্তবে এটি কেবল বাঁধ নয়, নির্মিত হচ্ছে ২৮ মিটার প্রশস্ত চার লেনের সড়ক। প্রথম ধাপে সুগন্ধা সৈকত থেকে দক্ষিণ দিকে কলাতলী পর্যন্ত ১ দশমিক ২ কিলোমিটার অংশ নির্মাণের কাজ চলছে। এই অংশ শেষ হলে দ্বিতীয় ধাপে সায়মান বিচ রিসোর্ট থেকে আরও দক্ষিণে বেলি হ্যাচারি পর্যন্ত ১ দশমিক ৬ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে বেসরকারি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট ইঞ্জিনিয়ার্স (এনডিই)। অর্থায়ন করছে জাইকা। প্রকল্পের প্রথম ধাপেই ব্যয় ধরা হয়েছে ৬৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
কিন্তু যে জায়গায় এই অবকাঠামো তৈরি হচ্ছে, সেটিই বিতর্কের মূল কারণ। সৈকতের বালিয়াড়ি ভরাট করে সড়ক নির্মাণের ফলে উপকূলের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য বদলে যাওয়ার পাশাপাশি পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের ওপর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন পরিবেশবাদীরা।
তাঁদের ভাষ্য, বালিয়াড়ি সমুদ্রের ঢেউ ও জলোচ্ছ্বাসের আঘাত শোষণ করে উপকূলকে সুরক্ষা দেয়। সেই প্রাকৃতিক ঢাল সরিয়ে সেখানে কংক্রিটের অবকাঠামো তৈরি করলে শহর রক্ষার বদলে ভবিষ্যতে ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে।
সুগন্ধা সৈকতে সড়ক নির্মাণের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে উচ্চ আদালতের পুরোনো নির্দেশনা ঘিরে। কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের বালিয়াড়িতে বিভিন্ন স্থাপনা নির্মাণের মাধ্যমে সৈকতের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও বৈশিষ্ট্য নষ্ট করার অভিযোগে ২০১১ সালে জনস্বার্থে রিট করেছিল এইচআরপিবি। ওই রিটের শুনানি শেষে আদালত কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য ও সৌন্দর্য রক্ষা এবং বালিয়াড়িতে স্থাপনা নির্মাণ না করার নির্দেশ দেন। পরবর্তী সময়ে আদালতের আদেশে বালিয়াড়িতে নির্মিত বিভিন্ন স্থাপনাও দুই দফায় অপসারণ করা হয়।
মনজিল মোরসেদের দাবি, সেই আদালতের নির্দেশনার পরও সুগন্ধা সৈকতের বালিয়াড়ি ভরাট করে স্থায়ী সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে। তাঁর মতে, এটি আদালতের আদেশের লঙ্ঘন এবং পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যের জন্যও হুমকি। এ কারণেই জেলা প্রশাসক, পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, প্রকল্প পরিচালক এবং জাইকার বাংলাদেশ প্রতিনিধিকে আইনি নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
সৈকতের বালিয়াড়িতে সড়ক নির্মাণের বিষয়টি নিয়ে শুধু আইনজীবীরাই প্রশ্ন তুলছেন না, পরিবেশ অধিদপ্তরও প্রকল্পের বিষয়ে পৌরসভা কর্তৃপক্ষের কাছে কৈফিয়ত চেয়েছে। গত শনিবার পাঠানো নোটিশে প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট নথিপত্র উপস্থাপনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিন কার্যদিবসের মধ্যে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দিতে বলা হয়েছে। অর্থাৎ একই সময়ে একাধিক দিক থেকে প্রকল্পটির পরিবেশগত ও আইনগত ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
তবে কক্সবাজার পৌরসভা বলছে, প্রকল্পটি নিয়ম মেনেই হচ্ছে। পৌরসভার সহকারী প্রকৌশলী রোমেল বড়ুয়া বলেছেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র নিয়েই সুগন্ধা সৈকতে শহর রক্ষা বাঁধের কাজ চলছে। প্রকল্পটি আগেই একনেকে অনুমোদিত হয়েছে। এর আগে জরিপ, নকশা ও গবেষণাও করা হয়েছে। ফলে পরিবেশের তেমন ক্ষতি হবে না বলে দাবি তাঁর।
তবে ছাড়পত্র থাকা মানেই আদালতের নির্দেশনার প্রশ্নের অবসান হয়েছে কি না, এ বিষয়েই এখন মূল বিতর্ক। পরিবেশবাদীরা বলছেন, বালিয়াড়ি ভরাট করে সড়ক নির্মাণ হলে এসব প্রাণী ও উদ্ভিদের আবাসস্থল নষ্ট হবে। একই সঙ্গে ক্ষতিগ্রস্ত হবে বালিয়াড়ির স্বাভাবিক গঠন। তাঁদের আশঙ্কা, সড়কটি স্থায়ীভাবে টিকিয়ে রাখাও কঠিন হবে। কারণ সমুদ্রের ঢেউ ও জোয়ারের ধাক্কায় উপকূলের বালু সরে যায়। ফলে বালিয়াড়ির ওপর তৈরি অবকাঠামো ভবিষ্যতে ভাঙন ও ক্ষয়ের মুখে পড়তে পারে।
পরিবেশবাদীদের কেউ কেউ অতীতে নির্মিত মেরিন ড্রাইভের বিভিন্ন অংশের ক্ষয় ও ভাঙনের উদাহরণও টেনে বলছেন, সমুদ্রের স্বাভাবিক গতিপ্রকৃতিকে উপেক্ষা করে অবকাঠামো নির্মাণ দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নাও হতে পারে।
সুগন্ধা সৈকতের প্রকল্প নিয়ে পরিবেশবাদীদের ক্ষোভ এখন প্রকাশ্য। বৃহস্পতিবার দুপুরে কক্সবাজার পৌরসভা ভবন চত্বরে মানববন্ধন ও প্রতিবাদ সমাবেশ করেন পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক কয়েকটি সংগঠনের কর্মীরা। ‘ইকো-ডেমোক্রেটিক মুভমেন্ট কক্সবাজার’এর ব্যানারে আয়োজিত কর্মসূচিতে বিভিন্ন সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। এতে ব্যানারে লেখা ছিলো ‘বউত কিছু হাইয়্যো, দইজ্জা ন হাইয়্যো’।
সমাবেশে ক্লাইমেট জাস্টিস বাংলাদেশের মুখপাত্র মো. জাবেদ নূর শান্ত বলেন, কক্সবাজারের উন্নয়ন তাঁরা চান। তবে প্রতিবেশ সংকটাপন্ন সৈকতের বালিয়াড়ি ভরাট বা দখল করে নয়।
তাঁর প্রশ্ন, সামান্য বৃষ্টিতেই যখন কক্সবাজার শহরের বিভিন্ন এলাকা জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে, তখন শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর প্রকল্প না নিয়ে কেন সৈকতের বালিয়াড়িতে সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে?
সমাবেশ শেষে নির্মাণকাজ জরুরি ভিত্তিতে স্থগিত এবং প্রকল্পের নকশা পুনর্মূল্যায়নের দাবি জানিয়ে প্রকল্প পরিচালকের কাছে স্মারকলিপি দেওয়া হয়।
সুগন্ধা সৈকতের বালিয়াড়িতে সড়ক নির্মাণের বিরোধিতা করে এরই মধ্যে একাধিক পরিবেশবাদী ও আইনজীবী সংগঠন মাঠে নেমেছে। বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছে। সেখানে নির্মাণকাজ বন্ধের দাবি জানানো হয়।
অন্যদিকে বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) পরিবেশ আইন লঙ্ঘন এবং উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে ইসিএ এলাকায় সড়ক নির্মাণ কেন বন্ধ করা হবে না, তা জানতে দুই সচিবসহ আট সরকারি কর্মকর্তাকে আইনি নোটিশ দিয়েছে। নোটিশ পাওয়ার পাঁচ দিনের মধ্যে গৃহীত পদক্ষেপ জানাতে বলা হয়েছে। এর পাশাপাশি পরিবেশ অধিদপ্তরও প্রকল্পের নথিপত্র চেয়ে পৌরসভাকে নোটিশ দিয়েছে। সবশেষে এইচআরপিবির আদালত অবমাননার নোটিশে ২৪ ঘণ্টার সময়সীমা দেওয়া হয়েছে। ফলে ৬৩ কোটি ৫০ লাখ টাকার এই প্রকল্প এখন শুধু উন্নয়ন প্রকল্প নয়; হয়ে উঠেছে পরিবেশ, আইন ও নগর পরিকল্পনা নিয়ে বড় বিতর্কের কেন্দ্র।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজারের সাংগঠনিক সম্পাদক এইচ এম নজরুল ইসলামের ভাষ্য, কক্সবাজার শহরকে সমুদ্রের জলোচ্ছ্বাস, জোয়ার ও উপকূলীয় দুর্যোগ থেকে রক্ষার প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন নেই। কিন্তু সেই সুরক্ষার অবকাঠামো নির্মাণে সৈকতের প্রাকৃতিক প্রতিরোধব্যবস্থা নষ্ট করা হচ্ছে কি না, সেটিই এখন মূল প্রশ্ন। কারণ, বালিয়াড়ি উপকূলের প্রাকৃতিক ঢাল। এটি সমুদ্রের ঢেউয়ের শক্তি কমাতে ভূমিকা রাখে। বালিয়াড়ির ওপর সড়ক নির্মাণ মানে শুধু একটি রাস্তা তৈরি করা নয়; এর সঙ্গে বদলে যেতে পারে সৈকতের স্বাভাবিক ভূপ্রকৃতি।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজার জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক কলিম উল্লাহর ভাষায়, কক্সবাজারে উন্নয়ন দরকার। পর্যটন শহর হিসেবে যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত করা, জলাবদ্ধতা কমানো, শহরকে জলোচ্ছ্বাস থেকে রক্ষা করা—সবই জরুরি। কিন্তু সেই উন্নয়নের মাপকাঠিতে সৈকতের প্রাকৃতিক পরিবেশের মূল্য কতটা রাখা হচ্ছে, সেটিই এখন গুরুত্বপূর্ণ।







