কালের সাক্ষী মনোহরগঞ্জের শরীফপুর মসজিদ, পর্যটনের সম্ভাবনা

কুমিল্লা জেলার মনোহরগঞ্জ উপজেলার বাইশগাঁও ইউনিয়নের শরীফপুর গ্রামে অবস্থিত এই ঐতিহাসিক মসজিদটি দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসেন বহু মানুষ। ছবি : আগামীর সময়
সবুজ শ্যামল গাঁয়ের বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে তিন গম্বুজবিশিষ্ট ঐতিহাসিক বড় শরীফপুর মসজিদ। প্রায় পৌনে ৪০০ বছরের পুরোনো এই মুঘল স্থাপত্যশৈলীর নিদর্শনটি আজও তার প্রাচীন সৌন্দর্য ও মহিমা নিয়ে টিকে রয়েছে।
কুমিল্লা জেলার মনোহরগঞ্জ উপজেলার বাইশগাঁও ইউনিয়নের শরীফপুর গ্রামে অবস্থিত এই ঐতিহাসিক মসজিদটি দেখতে এবং এর শান্ত-স্নিগ্ধ পরিবেশে একটু সময় কাটাতে প্রতিদিন দূর-দূরান্ত থেকে ছুটে আসেন বহু মানুষ।
শরীফপুর শাহী জামে মসজিদটি ১৬২০ থেকে ১৬২৫ সালের মধ্যবর্তী সময়ে নির্মিত হয়েছিল বলে ধারণা করা হয়। মসজিদের সামনের দেওয়ালে ফার্সি ভাষায় লেখা শিলালিপি রয়েছে। যা পুরোপুরি পড়া না গেলেও স্থানীয়দের মতে, তৎকালীন কোতোয়াল হায়াতে আব্দুল করিম এটি নির্মাণ করেন। কোতোয়ালের নির্মিত হওয়ায় স্থানীয়ভাবে এটি ‘কোতোয়ালি মসজিদ’ নামেও পরিচিত।
হায়াতে আব্দুল করিমের পরিচয় নিয়ে দুটি মত প্রচলিত আছে। একটি মতে, তিনি রাজা নাটেশ্বরের অধীনে কর্মরত ছিলেন। অন্য মতে, তিনি প্রখ্যাত দরবেশ সৈয়দ শাহ শরীফ বাগদাদির মুরিদ বা অনুসারী ছিলেন।
১৯৫৯ সাল থেকে এই মসজিদটিকে সংরক্ষিত স্থাপনা হিসেবে ঘোষণা করে সরকারের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর। পরবর্তীতে ১৯৬০-এর দশকে এবং এরপরেও বিভিন্ন সময়ে এর সংস্কারকাজ পরিচালনা করা হয়।
চুন-সুরকি আর টালি ইটের নিখুঁত গাঁথুনিতে তৈরি এই আয়তাকার মসজিদটি মুঘল স্থাপত্যের এক অনন্য উদাহরণ। যা বাংলাদেশের ঐতিহাসিক ৩৬০টি মসজিদের একটি হিসেবে স্বীকৃত। এর বাইরের দৈর্ঘ্য ১৪ দশমিক ৪৮ মিটার এবং প্রস্থ ৫ দশমিক ৯৪ মিটার।
মসজিদের পূর্ব দেওয়ালে রয়েছে তিনটি খিলানযুক্ত প্রবেশপথ বা দরজা। যার মধ্যে মাঝখানের বা কেন্দ্রীয় দরজাটি অপেক্ষাকৃত বড়। এই দরজাগুলোর ঠিক বিপরীত দিকে পশ্চিম দেওয়ালে রয়েছে তিনটি মিহরাব। এখানেও কেন্দ্রীয় মিহরাবটি অন্য দুটির চেয়ে বড়।
মসজিদের চারকোণে চারটি বড় অষ্টভুজাকার মিনার বা বুরুজ রয়েছে এবং কেন্দ্রীয় প্রবেশপথের ওপরেও দুটি ছোট অষ্টভুজাকার মিনার শোভা পাচ্ছে। মসজিদের ছাদে থাকা তিনটি গম্বুজের মধ্যে কেন্দ্রীয় গম্বুজটি বড়। গম্বুজগুলোর ভেতরের অংশে চমৎকার পাতার নকশা এবং বাইরের অংশে চক্রনকশার কাজ রয়েছে। গম্বুজের চূড়ায় রয়েছে পদ্মফুলের কারুকাজ।
মনোহরগঞ্জ উপজেলায় মসজিদটির অবস্থান হলেও এই ঐতিহাসিক এলাকাটি মূলত তিন জেলার (কুমিল্লা, চাঁদপুর ও নোয়াখালী) মোহনায় অবস্থিত। এর পাশেই চাঁদপুরের শাহরাস্তি উপজেলা এবং দক্ষিণে নোয়াখালীর চাটখিল উপজেলা।
মসজিদের ঠিক পেছনেই রয়েছে সুবিশাল ‘নাটেশ্বর দীঘি’। রাজা নাটেশ্বর তার নিজের নামানুসারে এই দীঘিটি খনন করেছিলেন, যা বর্তমানে কুমিল্লা জেলার সবচেয়ে বড় দীঘি হিসেবে পরিচিত।
দীঘিটির মোট আয়তন নিয়ে দুটি তথ্য পাওয়া যায়। একদিকে এর সুবিশাল পরিধি ৩৫ দশমিক ২৯ একর বলা হলেও অন্য সূত্রে এটি ২৭ একর জমির ওপর খনন করা হয়েছে বলে উল্লেখ রয়েছে।
মজার বিষয় হলো, দীঘিটি পড়েছে চাঁদপুর জেলার শাহরাস্তি উপজেলার চিতোষী ইউনিয়নের সর্বশেষ সীমান্তে। এর মালিকানাও কুমিল্লা ও চাঁদপুরের স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে বণ্টিত এবং এটি দুই জেলার সীমান্তবর্তী স্থানে অবস্থিত। প্রায় আট বছর আগে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর এই দীঘি এলাকাটি অধিগ্রহণ করে পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করে।
দীঘির দক্ষিণ-পূর্ব কোণে অবস্থিত পীর হযরত শাহ শরীফ বাগদাদি (রহ.)-এর মাজার ও দরগাহ। প্রতি বছর এই মাজারে বিশাল ওরস ও ওয়াজ মাহফিলের আয়োজন করা হয়। দীঘির দক্ষিণ পাশে রয়েছে একটি বিশাল মাঠ এবং পশ্চিম পাড়ে রাজা নাটেশ্বরের প্রতিষ্ঠিত ‘রায়েরবাগ’ গ্রাম। আর মসজিদের পূর্ব পাশ দিয়ে এঁকেবেঁকে বয়ে গেছে ডাকাতিয়া নদী।
ঐতিহাসিক এই মসজিদের উত্তর-পশ্চিম কোণে গড়ে উঠেছে পীর শাহ শরীফ হাফেজিয়া মাদ্রাসা ও আয়েশা হালিম এতিমখানা। এই মাদ্রাসার শিক্ষক ও ছাত্ররাই মূলত এখন মসজিদের দেখভাল ও তত্ত্বাবধান করছেন।
মসজিদের ইমাম মাওলানা মোহাম্মদ সামছুদ্দোহা জানান, প্রতিদিনই অনেকে এই ঐতিহাসিক মসজিদটি দেখতে আসেন। বিশেষ করে শুক্রবার জুমার নামাজ পড়তে পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন জেলা ও তিন উপজেলার মানুষ এখানে সমবেত হন। আমরা সাধ্যমতো এর সৌন্দর্য ধরে রাখার চেষ্টা করছি।
তবে মসজিদের পরিচালনা কমিটির সহ-সভাপতি মোতাহের হোসেন চৌধুরী জানান, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ইমাম-মুয়াজ্জিনের বেতনসহ সার্বিক বিষয় দেখাশোনা করলেও প্রায় ছয় বছর ধরে এখানে কোনো সংস্কারকাজ হয়নি। বর্তমানে মসজিদের সৌন্দর্য রক্ষায় জরুরি কিছু সংস্কার প্রয়োজন হলেও প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের আইনি নিষেধাজ্ঞা থাকায় কমিটি নিজস্ব উদ্যোগে কোনো কাজ করতে পারছে না। বিষয়টি ইতোমধ্যে অধিদপ্তরকে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে।




