মরুর দুম্বায় সম্ভাবনার দুয়ার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার কাঁঠারিপাড়া গ্রামের একটি খামারে ঢুকতেই চোখে পড়ে অচেনা দৃশ্য। দল বেঁধে ঘুরে বেড়াচ্ছে একের পর এক দুম্বা। কোনোটি ঘাস খাচ্ছে, কোনোটি আবার ছায়ায় বসে আছে। মরুভূমির প্রাণী দুম্বার এমন উপস্থিতি গ্রামের মানুষের কাছেও এখন আর বিস্ময়ের নয়। কারণ, এই দুম্বা পালনের মধ্য দিয়েই নিজের জন্য নতুন সম্ভাবনার পথ তৈরি করেছেন উদ্যোক্তা রবিউল ইসলাম কাজল।
এখন অনেকেই তাকে চেনেন ‘দুম্বা কাজল’ নামে। শখ থেকে শুরু করা তার উদ্যোগ এখন বাণিজ্যিক সম্ভাবনার খামারে রূপ নিয়েছে। খামারে ছোট-বড় মিলিয়ে বর্তমানে ২৭টি দুম্বা রয়েছে। দুই বছর আগে ছয়টি তুর্কি জাতের দুম্বা দিয়ে কাজলের খামারের যাত্রা শুরু। কাজলের হিসাবে, এসব দুম্বার বাজার দাম ৩০-৩৫ লাখ টাকা। প্রতিটি দুম্বা বয়স, ওজন ও আকৃতি অনুযায়ী দেড় থেকে আড়াই লাখ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করা যায়। খামারের দুম্বাগুলোকে কাঁচা ঘাস, খড়, ভুসি, খৈল, গম, ভুট্টাসহ বিভিন্ন খাবার দেওয়া হয়। সাইলেজও ব্যবহার করা হয়। দুম্বার সঙ্গে দেশি ছাগলও পালন করছেন কাজল।
দুম্বা পালনের চিন্তা কাজলের মাথায় আসে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ভিডিও দেখে। কৃষিকাজে কাঙ্ক্ষিত সাফল্য না পাওয়ায় বিকল্প কিছু করার কথা ভাবছিলেন তিনি। এ সময় প্রবাসী বড় ভাই রেজাউল ইসলাম নয়নের পরামর্শ ও সহযোগিতা পান। ২০২৩ সালে ছয়টি তুর্কি জাতের দুম্বা কিনে শুরু করেন খামার। ছয় মাসের মধ্যেই সেগুলো বাচ্চা দিতে শুরু করে। এরপর দ্রুতই বাড়তে থাকে দুম্বার সংখ্যা।
দুম্বা পালনে বড় ধরনের রোগবালাইয়ের ঝুঁকি তুলনামূলক কম বলে জানিয়েছেন কাজল। তার ভাষ্য, আমাদের আবহাওয়া মরুর প্রাণী দুম্বা পালনে সহায়ক। বছরে দুইবার বাচ্চা দেয়। একটি পূর্ণবয়স্ক দুম্বার ওজন ৫০-১০০ কেজি পর্যন্ত হয়। নিয়মিত খাবার, টিকা ও পরিচর্যায় দ্রুত বেড়ে ওঠে। কোরবানির ঈদকে কেন্দ্র করে দুম্বার চাহিদাও বাড়ে। ফলে উৎপাদনের পাশাপাশি বিক্রির বাজার নিয়েও আশাবাদী তিনি।
তিনি জানালেন, গত বছর কোরবানি ঈদে ১০টি দুম্বা বিক্রি হয়েছে। শুধু তাই নয়, খামার করতে তার কাছে বিভিন্ন এলাকার মানুষ আসেন দুম্বা নিতে। গত ১ সেপ্টেম্বর দিনাজপুরের এক উদ্যোক্তা ১৩ লাখ টাকায় পাঁচটি দুম্বা নিয়েছেন। প্রতিদিনই ফোন, মেসেঞ্জার ও ইমোতে আগ্রহী ক্রেতাদের দুম্বা দেখাতে হচ্ছে।
নীলফামারী জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. রাশেদুল হকের ভাষায়, শিক্ষিত তরুণ রবিউল ইসলাম কাজল চাকরির পেছনে না ছুটে উদ্যোক্তা হয়েছেন। তাকে নিয়মিত কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
তবে কাজলের খামারের সম্ভাবনা শুধু তার নিজের ব্যবসার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। খামারটি দেখতে প্রতিদিনই বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ আসছেন। কেউ দুম্বা দেখছেন, কেউ খামার করার বিষয়ে খোঁজখবর নিচ্ছেন। আগ্রহীদের অনেকেই পরে দুম্বা কিনে নিজেরাও খামার করার পরিকল্পনা করছেন।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর রংপুর বিভাগীয় পরিচালক ডা. আব্দুল হাই সরকারের মতে, দুম্বার খামারটি নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি করেছে। ভবিষ্যতে এ ধরনের খামার বৃদ্ধি পেলে দেশে মাংসের চাহিদা পূরণে সহায়ক হবে।
রংপুর, গাইবান্ধা ও দিনাজপুরে এরই মধ্যে ১১টি খামার গড়ে উঠেছে। এসব খামারে দুম্বার সংখ্যা রয়েছে ২৮১টি। কোনো উদ্যোক্তা দুম্বার খামার গড়তে চাইলে তাকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়ার আশ্বাসও দিয়েছেন এই কর্মকর্তা।
দেশে মাংসের চাহিদা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রচলিত গরু, ছাগল ও ভেড়ার বাইরে নতুন প্রাণী পালনের সম্ভাবনাও তৈরি হচ্ছে। সৈয়দপুর উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আবু কায়েস বিন আজিজ বললেন, ‘কাজলের উদ্যোগ প্রচলিত খামার ব্যবস্থার বাইরে নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি করেছে। প্রাণিসম্পদ কার্যালয়ের পক্ষ থেকে তাকে প্রয়োজনীয় কারিগরি সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও তা অব্যাহত থাকবে।’



