জীবননগর
কদর বেড়েছে পাটকাঠির

ছবি: আগামীর সময়
সোনালি আঁশের রূপালি কাঠিতে আশার আলো দেখছেন চাষিরা। আবহমানকাল থেকে রান্নার জ্বালানি, ঘরের বেড়া, পানের বরজ, গৃহস্থালী সামগ্রীসহ বিভিন্ন শৌখিন পাটজাত পণ্য তৈরিতে পাটকাঠির জুড়ি নেই। বর্তমানে বিভিন্ন ধরনের পার্টিকেল বোর্ড তৈরি ছাড়াও কলকারখানায় পাটকাঠি ব্যবহার হচ্ছে। ফলে পাটকাঠির মূল্য ক্রমশ বেড়েই চলেছে। একসময় পাটকাঠি শুধু জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার হতো। এখন এর বহুমুখী ব্যবহারের কারণে কদর বেড়েছে কয়েক গুণ। পাটের আঁশের পাশাপাশি পাটখড়িও কৃষকের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ কৃষিপণ্য হয়ে উঠেছে।
সরেজমিন দেখা যায়, জীবননগরের একতারপুর বাওড়, বেনীপুর বাওড়, রায়পুর বিল, ভৈরব নদসহ বিভিন্ন খাল-বিল অঞ্চলে রাস্তার দুই পাশে বাঁশ দিয়ে আড়া তৈরি করে তার ওপর অসংখ্য পাটকাঠি শুকাতে দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া কয়েকটি পাটকাঠি একত্র করে আঁটি বেঁধে শুকানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন পাটচাষিরা। এ বছর পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত হওয়ায় ডোবা, পুকুর, খাল-বিলে পাট জাগ দেওয়ার পর আঁশের রং ভালো হয়েছে। পাশাপাশি পাটকাঠির মানও ভালো হয়েছে।
রান্নার জ্বালানি সংগ্রহ করতে ভোরে বিভিন্ন এলাকার নারী-পুরুষ পাটচাষিদের কাছ থেকে পাট চেয়ে নিয়ে আঁশ ছাড়াতে সহায়তা করছেন। বিনিময়ে টাকা না নিয়ে তারা নিচ্ছেন পাটকাঠি। জীবননগর উপজেলার গয়েশপুর, হরিয়াননগর, বেনীপুর ও সদরপাড়া গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, খাল-বিল ও নদীর ধারে শত শত নারী পাট থেকে আঁশ ছাড়াচ্ছেন। দিন শেষে পারিশ্রমিক হিসেবে তারা পাটকাঠি নিচ্ছেন। পরে ভ্যানে করে সেগুলো নিজেদের বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছেন।
বেনীপুর গ্রামের জবেদা খাতুন জানান, জ্বালানির সংকট থাকায় তিনি পাটের আঁশ ছাড়াতে এসেছেন। বিনিময়ে পাটকাঠি সংগ্রহ করছেন।
সদরপাড়া গ্রামের শহিদুল ইসলাম বলেন, পাটের আঁশ ছাড়ানোর কাজে অসংখ্য নারী কাজ করছেন। তাদের কাজের বিনিময়ে পাটকাঠি দেওয়া হচ্ছে। এতে পাট চাষে বিনিয়োগ করা অর্থের একটি বড় অংশ উঠে আসছে।
মনোহরপুর গ্রামের পাটচাষি রশিদ মিয়া বলেন, পাট চাষের ব্যয় কমাতে আঁশ ছাড়াতে আসা কৃষাণী ও কৃষকদের টাকা না দিয়ে পাটকাঠি দেওয়া হচ্ছে।
মৃগমারি গ্রামের পাটচাষি মোতালেব হোসেন বলেন, এক বিঘা জমিতে পাট চাষ করতে কৃষকের ২০ থেকে ২৫ হাজার টাকা খরচ হয়। প্রতি বিঘায় ১৫ থেকে ২০ মণ পাটখড়ি উৎপাদিত হয়। প্রতি মণ বিক্রি হয় গড়ে এক হাজার টাকায়। পাটের আঁশ বিক্রি করে উৎপাদন খরচ বাদ দিলে খুব বেশি লাভ থাকে না। তবে পাটখড়ি বিক্রি করে বাড়তি টাকা পাওয়া যায়।
তিনি আরও বলেন, আগে পাটকাঠি অন্যান্য জ্বালানির সহযোগী হিসেবে ব্যবহৃত হতো। তবে বর্তমানে এর ব্যবহার আরও বিস্তৃত হয়েছে। বাড়ির বেড়া, গোয়ালঘর কিংবা অস্থায়ী ঘের তৈরিতে পাটকাঠি ব্যবহার করা হয়। কৃষকেরা জমির চারপাশে বেড়া দেওয়ার কাজেও এটি ব্যবহার করেন। সবজি বা অন্যান্য ফসলের জমি পশুর হাত থেকে রক্ষা করতে অস্থায়ী বেড়া তৈরিতেও পাটকাঠি কাজে লাগে।
জীবননগর উপজেলার বিভিন্ন গ্রাম থেকে ব্যবসায়ীরা চাষিদের কাছ থেকে স্বল্পমূল্যে পাটকাঠি কিনে ভ্যানে করে পার্শ্ববর্তী শহরে নিয়ে বেশি দামে বিক্রি করছেন। এতে প্রতিদিনই ভালো অর্থ আয় করছেন তারা।
পাটকাঠি ব্যবসায়ী ছমির আলী বলেন, এখন পাটকাঠি বিক্রির মৌসুম। তাঁরা পাটচাষিদের কাছ থেকে প্রতি আঁটি ৫০ থেকে ৬০ টাকায় কিনে শহরে ১০০ থেকে ১৫০ টাকায় বিক্রি করছেন। এতে ভ্যানপ্রতি তাঁদের তিন থেকে চার হাজার টাকা আয় হয়। তবে ঢাকা ও চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন শহরের সংশ্লিষ্ট কলকারখানায় পাটকাঠি আরও বেশি দামে বিক্রি হয়।
জীবননগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আলমগীর হোসেন বলেন, চলতি বছর উপজেলায় পাট চাষের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১ হাজার ৫৮৮ হেক্টর। চাষ হয়েছে ১ হাজার ৬২০ হেক্টর জমিতে। লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৩২ হেক্টর বেশি জমিতে পাট চাষ হয়েছে।
তিনি বলেন, পাট একটি অর্থকরী ফসল। পাটের পাতা জমিতে পড়ে মাটির উর্বরতা বাড়ায়। এবার পাটের দামও ভালো। পাশাপাশি পাটকাঠির চাহিদাও অনেক। এ কারণে চাষিরা এবার ভালো দাম পাচ্ছেন।
তিনি আরও বলেন, পাট চাষ বাড়লে পাটকাঠি কৃষকের বিনিয়োগ করা অর্থ তুলে আনার পাশাপাশি অতিরিক্ত আয়ের গুরুত্বপূর্ণ উৎস হতে পারে। পাট জাগ দেওয়ার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পাটের আঁশের রং ও পাটকাঠির মানের বিষয়ে নজর রাখা প্রয়োজন।




