মুহরি পরিবারের পেটে ৩০ একর খাসজমি
- সবকিছুর নায়ক খুলনার আবদুর রহমান
- মা, স্ত্রী, সন্তান, নাতনির নামেও খাসজমি
- জমি হাতাতে দেখানো হয় বাবাকে স্বামী স্বামীকে বাবা

প্রতীকী ছবি
উপজেলা সেটেলমেন্ট অফিসের মুহরি ছিলেন আবদুর রহমান মোল্যা। পদটি ছোট্ট হলেও ব্যবহার করেছেন আলাদিনের চেরাগ হিসেবে। বেতন-ভাতা যৎসামান্য হলেও মালিক বনে গেছেন কোটি কোটি টাকার। ভূমি কার্যালয়ে কাজ করায় জরিপ, খতিয়ান বা পর্চা তৈরি, মালিকানা যাচাই ও নতুন স্বত্ব রেকর্ড বিষয়ে রাখতেন বিশদ জ্ঞান। এই জ্ঞান তিনি নাগরিক সেবায় ব্যবহার করার চেয়ে বেশি প্রয়োগ করেছেন খাসজমি হাতানোয়। জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে কবজা করেছেন সরকারের ৩১ একর মাটি। এ ছাড়া খাসজমি বাগিয়ে দেওয়ার নামে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়েছেন বলেও রয়েছে অভিযোগ। প্রতারণার মাত্রা এতটাই বেশি ছিল যে, মৃত্যুর খবর শুনে তার দাফন কার্যক্রমই আটকে দিয়েছিলেন ভুক্তভোগীরা।
আবদুর রহমানের বাড়ি খুলনার ডুমুরিয়ার কুমারঘাটা গ্রামে। এমনিতেই তিনি সম্পদশালী। রয়েছে অন্তত ৬ একর জমি। এরপরও নিজের নামের পাশাপাশি স্ত্রী, সন্তান, মা, নাতনির নামে বাগিয়েছেন সরকারি জমি। এর মধ্যে শুধু স্ত্রী রমিছা বেগম, ছেলে ইয়াছিন মোল্যা ও মেয়ে মনোয়ারা খাতুনের নামেই দখল করেছেন ৯ দশমিক ৩৫ একর খাসজমি। এ ছাড়া িনজ নাম, মা ও নাতনির নাম মিলিয়ে কবজা করেছেন ৩০ দশমিক ৩৭ একর খাসজমি।
বিষয়টি বুঝতে পেরে এই পরিবারের নামে মামলা করেছে সরকার। এজাহারের নথিতে দেখা যায়, বাংলাদেশ রেকর্ড সার্ভিস (বিআরএস) ২৭৫ নম্বর খতিয়ানে ডুমুরিয়ার লতাবুনিয়া মৌজায় ইয়াছিন মোল্যা, বাবা-আবদুর রহমান, সাং-সাহস; এই নামে ১ একর খাসজমি রেকর্ড। একই ব্যক্তি একই মৌজায় নিজের ও বাবার নাম সামান্য পরিবর্তন করে মোহা. ইয়াছিন মোল্যা, বাবা আ. রহমান মোল্যা, সাং-সাহস পরিচয় উল্লেখ করে আরও ৭৫ শতাংশ এবং ইয়াছিন মোল্যা, বাবা-আ. রহমান, সাং-সাহস পরিচয় উল্লেখ করে আরও ৩ একর ২০ শতাংশ খাসজমি রেকর্ড করেছেন।
লতাবুনিয়া মৌজায় বিআরএস ২৭০ নম্বর খতিয়ানে মনোয়ারা খাতুন, বাবা-আবদুর রহমানকে স্বামী দেখিয়ে ১ একর খাসজমি রেকর্ড করেন। পরে আ. রহমান মোল্যাকে বাবা দেখিয়ে মনোয়ারা খাতুন একই মৌজার ৩০৯ নম্বর খতিয়ানে নেন আরও ১ একর খাসজমি।
এ ছাড়া রমিছা বেগম, স্বামী আ. রহমান নামে উপজেলার সাহস মৌজায় ১ একর খাসজমি রেকর্ড করেন। পরে রমিছা বেগম তার বাবা মহাতাবকে স্বামী দেখিয়ে একই মৌজায় রেকর্ড করেছেন আরও ১ একর ৪০ শতাংশ খাসজমি। অথচ কৃষি খাসজমি ব্যবস্থাপনা ও বন্দোবস্ত নীতিমালা অনুযায়ী, শুধু ভূমিহীন ও বাস্তুভিটাহীন পরিবার, দুস্থ মুক্তিযোদ্ধা পরিবার, নদীভাঙনে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবার, সক্ষম ছেলেসহ বিধবা বা স্বামী পরিত্যক্ত নারী, অধিগ্রহণের কারণে ভূমিহীন পরিবার এবং ১০ শতাংশ বসতবাড়ি আছে; কিন্তু কৃষিজমি নেই এমন কৃষিনির্ভর পরিবার খাসজমি পাওয়ার যোগ্য। সেক্ষেত্রে একটি পরিবারকে জমির প্রাপ্যতা অনুযায়ী সর্বোচ্চ ১ একর দেওয়া যাবে। এসব নিয়মনীতির তোয়াক্কা না করে সরকারি জমি হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগে গত ৯ জুলাই খুলনা যুগ্ম জেলা জজ দ্বিতীয় আদালতে এই পরিবারের বিরুদ্ধে স্বত্ব প্রচার মামলা করেছে সরকার। এতে বিবাদী করা হয়েছে ইয়াছিন মোল্যা, রমিছা বেগম ও মনোয়ারা বেগমকে।
মামলার তথ্য অনুযায়ী, সাহস মৌজায় ১৬ দশমিক ৩১ একর, লতাবুনিয়া মৌজায় ৮ দশমিক ৪৫ একর, জয়খালী মৌজায় ৩ দশমিক ৪৫ একর, কাকমারী মৌজায় শূন্য দশমিক ৫০ একর, দিঘলিয়া মৌজায় শূন্য দশমিক ৬৬ একর, বাঁশতলা মৌজায় ১ একর জমি দখল করেছেন আবদুর রহমান।
এই বিপুল পরিমাণ জমি হাতিয়ে নেওয়ার উপায় সম্পর্কে জানতে চাইলে কুমারঘাটার বাসিন্দা খালিদ হাসান জানালেন, আবদুর রহমান সেটেলমেন্ট অফিসের মুহরি ছিলেন। সেই প্রভাব ও অর্থের বিনিময়ে তৎকালীন সংশ্লিষ্ট দপ্তরের কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে দখলে নিয়েছেন এসব জমি। শুধু তা-ই নয়, এলাকার অনেকের খাসজমিও কবজা করেছেন তিনি। আবার অনেকের নামে খাসজমি রেকর্ড করিয়ে দেওয়ার নামেও হাতিয়েছেন কোটি কোটি টাকা। তাকে টাকা দেওয়ার পর জমি না পেয়ে নিঃস্ব হয়েছেন বহু মানুষ। পাঁচ বছর আগে তার মৃত্যুর পর দাফনকাজে বাধাও দিয়েছিলেন ভুক্তভোগীরা।
আত্মীয়স্বজনের জমিও বাগিয়েছেন বলে জানালেন তার বংশের আশরাফ আলী মোল্যা। তার অভিযোগ, সিএস ও এসএ রেকর্ডে আমাদের নামে ২১ শতাংশ জমি রেকর্ড ছিল। আমরা অশিক্ষিত হওয়ায় জমির বিষয়ে ভালো বুঝতাম না। সে সুযোগে প্রতারণার মাধ্যমে ওই জমিও নিজের নামে নিয়েছেন আবদুর রহমান।
নামে-বেনামে খাসজমি নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করলেন না আবদুর রহমানের ছেলে ইয়াছিন মোল্যা। এর মধ্যে আদালতের নোটিস পাওয়ার কথা উল্লেখ করে তার দাবি, বন্দোবস্ত ও সোলেনামার মাধ্যমে জমি পেয়ে রেকর্ড করেছেন তারা।
মামলার অগ্রগতি জানতে চাইলে খুলনা জজকোর্টের সরকারি কৌঁসুলি (জিপি) ড. জাকির হোসেন এবং অতিরিক্ত সরকারি কৌঁসুলি (অতিরিক্ত জিপি) আবুল খায়ের আগামীর সময়কে জানালেন, আবদুর রহমানের দখল করা ৩০ দশমিক ৩৭ একর জমির বাজারদর সাড়ে ৬ কোটি টাকার বেশি। মামলার কার্যক্রম চলছে, শিগগিরই সরকারের কাছে ফেরত আসবে ওই জমি।




