সন্ধ্যা হলেই মাধবপুরে চুরি আতঙ্ক

হবিগঞ্জের মাধবপুরে গত ১৫ দিনে একের পর এক গরু, হাঁস-মুরগি, সেচ পাম্পের বৈদ্যুতিক ক্যাবল, ট্রান্সফরমার, মোবাইল ফোন ও বসতঘরে সিঁদ কেটে চুরির ঘটনায় জনমনে তৈরি হয়েছে চরম উদ্বেগ।
একই সময় ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটেছে। ধারাবাহিক এসব ঘটনায় কৃষকসহ সাধারণ মানুষ আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। তাদের অভিযোগ, কার্যকর প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা দৃশ্যমান না হওয়ায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
সর্বশেষ গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে উপজেলার চৌমুহনী ইউনিয়নের ঘনশ্যামপুর গ্রামের কৃষক সোহরাব উদ্দিনের গোয়ালঘরের তালা কেটে চারটি গরু চুরি করে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।
ভুক্তভোগী সোহরাব উদ্দিন জানান, প্রতিদিনের মতো রাতে গরুগুলো গোয়ালঘরে রেখে তালা দিয়ে ঘুমিয়ে পড়েন। সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখেন তালা ভাঙা এবং গোয়ালঘর খালি। বহু কষ্টে লালন-পালন করা চারটি গরুই ছিল তার পরিবারের প্রধান সম্বল ও আয়ের অন্যতম উৎস। মুহূর্তেই সেই সম্বল হারিয়ে পরিবারটি চরম অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
এ ঘটনার পরদিন শুক্রবার দিবাগত রাতে একই ইউনিয়নের মঙ্গলপুর গ্রামের আকবর আলীর গোয়ালঘরের তালা ভাঙার চেষ্টা করে দুর্বৃত্তরা। আকবর আলী জানান, পরিবারের সদস্যরা বিষয়টি টের পেয়ে গেলে চোরেরা পালিয়ে যায়।
চৌমুহনী ইউনিয়নের বাসিন্দা সামছুল আলম জানান, ১০-১২ দিন আগে দেবপুর গ্রামের রহমান সর্দারের চারটি, নুরুল্লাপুর গ্রামের দুটি এবং রসুপুর গ্রামের ইয়ামিন মিয়ার দুটি গরু রাতের আঁধারে চুরি হয়ে যায়।
এর আগে গত ৪ জুলাই দিবাগত রাতে ছাতিয়াইন ইউনিয়নের শ্রীমতপুর গ্রামের সাবেক সেনাসদস্য রুবেল মিয়ার গোয়ালঘরের চারটি তালা কেটে একটি উন্নত জাতের গাভি চুরি করে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। পরিবারের সদস্যদের ঘুম ভেঙে যাওয়ায় অন্য গরুগুলো নিতে পারেনি।
ছাতিয়াইন ইউনিয়নের মনিপুর গ্রামের বাসিন্দা আলাই মিয়া জানান, গত শুক্রবার দিবাগত রাত ১০টার দিকে শাহপুর-এক্তিয়ারপুর সড়কে বাড়ি ফেরার পথে মনিপুর গ্রামের দুই শ্রমিকের কাছ থেকে নগদ ২২ হাজার টাকা ও দুটি মোবাইল ফোন ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা।
এ ছাড়া গত এক সপ্তাহের ব্যবধানে একই গ্রামের বশির মিয়ার ঘরের সিঁদ কেটে একটি গরু এবং জালাল মিয়ার ঘরের জানালার গ্রিল কেটে দুটি গরু চুরি করা হয়েছে।
একই সময়ে ছাতিয়াইন ইউনিয়নের সাকুচাইল গ্রামের চার কৃষকের জমিতে সেচকাজে ব্যবহৃত সাবমারসিবল পাম্পের বিদ্যুতের ক্যাবল চুরি হয় বলে জানান ইউপি সদস্য আবুল খায়ের। এতে কৃষকদের সেচ কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে।
চোরের হাত থেকে রক্ষা পায়নি হাঁস-মুরগিও। ছাতিয়াইন ইউনিয়নের দাসপাড়া গ্রামের বাসিন্দা আব্দুর রহমান জানান, গভীর রাতে দুর্বৃত্তরা তার হাঁস-মুরগির ঘরের তালা কেটে কয়েকটি হাঁস-মুরগি জবাই করে নিয়ে যায়। একই রাতে একই গ্রামের সায়েদুল ইসলামের বাড়িতেও একই কায়দায় হাঁস-মুরগি জবাই করে নিয়ে যায় চোরেরা।
নোয়াপাড়া ইউনিয়নের রতনপুর গ্রামের বাসিন্দা আব্দুল বাছির জানান, গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতে গ্রামের পুলিশ সদস্য সাইফুল ইসলাম আপন মিয়ার বাড়ির পাশের একটি বিদ্যুতের খুঁটি থেকে একটি ট্রান্সফরমার খুলে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা। এ ছাড়া কয়েক দিন আগে নোয়াপাড়া গ্রামের সামছুল ইসলামের ঘর থেকে একটি মোবাইল ফোন চুরি হয়েছে।
জগদীশপুর ইউনিয়নের খরকি গ্রামের ইউপি সদস্য আজমল মিয়া জানান, গত এক সপ্তাহে তার গ্রামে একাধিক বাড়িতে সিঁদ কেটে চুরির ঘটনা ঘটেছে। চুরক মিয়ার ঘর থেকে মোবাইল ফোনসহ বিভিন্ন মালামাল চুরি করা হয়। একই কায়দায় মাসুক মিয়া ও এনায়েত উল্লাহর বাড়িতেও চুরির ঘটনা ঘটে।
বাঘাসুরা ইউনিয়নের বাসাসুরা উচ্চ বিদ্যালয়েও গত ৭ জুলাই চুরির ঘটনা ঘটে। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুল খালেক জানান, চোরকে শনাক্ত করার পর চুরি হওয়া মালামাল উদ্ধার করা হয়েছে।
একই ইউনিয়নের কালিকাপুর গ্রামের বাসিন্দা ও মাধবপুর প্রেস ক্লাবের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদের বাড়িতেও চুরির ঘটনা ঘটে। দুর্বৃত্তরা জানালার গ্লাস খুলে ঘরে প্রবেশ করে দুটি মোবাইল ফোন নিয়ে যায়।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, গত ১৫ দিনে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নে সংঘটিত এসব ধারাবাহিক চুরি ও ছিনতাইয়ের ঘটনায় মানুষ চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। সন্ধ্যা নামলেই অনেক পরিবার আতঙ্কে থাকে। কৃষকদের অভিযোগ, একটি গরু, একটি সেচ পাম্পের ক্যাবল কিংবা একটি ট্রান্সফরমার শুধু সম্পদ নয়—এসবের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে একটি পরিবারের জীবিকা, সন্তানের ভবিষ্যৎ এবং বহু বছরের পরিশ্রম। রাতের অন্ধকারে সেই সম্বল হারিয়ে গেলে ভেঙে পড়ে একটি পরিবারের স্বপ্নও।
এ বিষয়ে চৌমুহনী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাহবুবুর রহমান সোহাগ বললেন, ঘনশ্যামপুর গ্রামের সর্বশেষ গরু চুরির ঘটনাটি তার জানা নেই। তবে গত ১০ থেকে ১২ দিনে ইউনিয়নের কয়েকটি চুরির ঘটনার কথা তিনি শুনেছেন। এসব ঘটনায় থানায় অভিযোগ করা হয়েছে। পুলিশ চুরি নিয়ন্ত্রণে তৎপর রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের চেষ্টা করছে বলেও তিনি দাবি করেন।
উপজেলার কাশিমনগর পুলিশ ফাঁড়ির উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. মিজানুর রহমান আগামীর সময়কে বললেন, ঘনশ্যামপুর গ্রামের গরু চুরির শিকার ব্যক্তির সঙ্গে তার দেখা হয়েছে। তাকে একটি লিখিত অভিযোগ দিতে বলা হয়েছে।
তিনি জানালেন, এলাকাবাসীর ভাষ্য মতে আগে প্রায়ই চুরির ঘটনা ঘটত। কয়েকজন চিহ্নিত চোরকে গ্রেপ্তার করার পর কিছুটা কমেছিল।
জানতে চাইলে মাধবপুর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. সোহেল রানা আগামীর সময়কে জানান, এ ঘটনাগুলোর বিষয়ে কেউ মৌখিক বা লিখিতভাবে আমাকে জানায়নি। আপনার কাছ থেকেই প্রথম শুনলাম। ক্ষতিগ্রস্তদের হাত-পা ধরেও অভিযোগ নেওয়া সম্ভব হয়নি। অভিযোগ পেলে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
তবে স্থানীয়দের দাবি, শুধু তৎপরতার আশ্বাস নয়, ধারাবাহিক চুরি ও ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা, রাতের পুলিশ টহল জোরদার এবং গ্রামাঞ্চলে কার্যকর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। তা না হলে সাধারণ মানুষের জানমাল ও কষ্টার্জিত সম্পদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরও বাড়বে।




