তাজমিন হত্যা: রাজুকে নিয়ে কুমিল্লা ডিবির নাটকীয় কাণ্ড!
- ডিবির অধিযাচনপত্রে গ্রেপ্তার, পরে কক্সবাজার থানায় ফেরত
- সাড়ে চার ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ, বিকালে ৫৪ ধারায় আদালতে সোপর্দ

ছবি: আগামীর সময়
কুমিল্লার লালমাইয়ে ধানক্ষেত থেকে উদ্ধার হওয়া ১৫ বছর বয়সী স্কুলছাত্রী জান্নাতুল তাজমিন হত্যা ঘটনায় আলোচনায় আসা কথিত প্রেমিক রিয়াজ উদ্দিন ওরফে রাজু চৌধুরীকে নিয়ে এক দিনের মধ্যে একাধিক ঘটনা ঘটেছে কক্সবাজারে।
গতকাল রবিবার রাতে শহরের কলাতলী এলাকা থেকে আটকের পর আজ সোমবার দুপুরে তাকে নিজেদের হেফাজতে নেয় কুমিল্লা জেলা গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। পরে কয়েক ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদ শেষে তাকে আবার কক্সবাজার সদর মডেল থানায় ফিরিয়ে দেওয়া হয়। সন্ধ্যায় কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জানিয়েছেন, রাজুকে আদালতে সোপর্দ করেছে সদর মডেল থানা পুলিশ।
পুলিশ কর্মকর্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী, তাজমিনের সঙ্গে রাজুর পূর্বপরিচয়, তাদের যোগাযোগ এবং কক্সবাজারে একসঙ্গে অবস্থানের তথ্য যাচাই করতে চায় কুমিল্লা ডিবি।
পুলিশ জানিয়েছে, গতকাল রবিবার রাত ১০টার দিকে কক্সবাজার শহরের কলাতলী এলাকা থেকে রাজুকে আটক করা হয়।
সদর মডেল থানা পুলিশের আদালতে দেওয়া প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গণমাধ্যমে তাজমিনের ঘটনায় রাজুর নাম আসার পর স্থানীয় লোকজন তাকে সেখানে আটক করে রেখেছিলেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে তাকে হেফাজতে নেয়।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, তখন পর্যন্ত এ ঘটনায় কোনো মামলা বা এজাহার না থাকায় এবং ঘটনাকে কেন্দ্র করে ধর্তব্য অপরাধ সংঘটনের সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করে রাজুকে ফৌজদারি কার্যবিধির ৫৪ ধারায় গ্রেপ্তার করা হয়। পরে মামলা হলে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ রয়েছে।
এরপর সোমবার সকালে তাজমিন হত্যা মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও কুমিল্লা জেলা ডিবির এসআই পবিত্র সরকার কক্সবাজার সদর মডেল থানার ওসির কাছে অধিযাচনপত্র দেন। এতে রাজুকে গ্রেপ্তার করে হস্তান্তরের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করা হয়।
অধিযাচনপত্রে বলা হয়েছে, জান্নাতুল তাজমিনের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন নাম্বারের কললিস্ট ও অন্যান্য তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করে ঘটনার আনুমানিক দুই দিন আগে তার কক্সবাজার সদর থানা এলাকায় অবস্থানের তথ্য পাওয়া গেছে। এ সময় রাজুর সঙ্গে তার দেখা-সাক্ষাৎ এবং ঘটনার আগে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের তথ্যও পাওয়া যায়। তাজমিনের সঙ্গে রাজুর পূর্বপরিচয় ও সম্পর্কের ধরন, যোগাযোগের কারণ, ডিজিটাল মাধ্যমে তাদের যোগাযোগ এবং হত্যা মামলার বিষয়ে তার কাছে গুরুত্বপূর্ণ কোনো তথ্য রয়েছে কি না, তা জানতেই জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন বলে উল্লেখ করেন তদন্ত কর্মকর্তা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, কুমিল্লা ডিবির দল কক্সবাজারে এসে রাজুকে নিয়ে তদন্তের বিভিন্ন বিষয় যাচাই করে। প্রায় সাড়ে ৪ ঘণ্টা জিজ্ঞাসাবাদের পর বিকাল ৫টার দিকে তাকে সদর মডেল থানার ডিউটি অফিসারের কাছে ফেরত দেওয়া হয়। পরে ডিবির দলটি সেখান থেকে চলে যায়।
এ বিষয়ে জানতে তদন্তকারী কর্মকর্তা পবিত্র সরকারের মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোন বন্ধ পাওয়া যায়।
তবে কুমিল্লার পুলিশ সুপার মো. আনিসুজ্জামান বলেছেন, কুমিল্লার পুলিশ রাজুকে নিতে যায়নি। তাকে কিছু বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের প্রয়োজন ছিল। হোটেলসংক্রান্ত কিছু বিষয়েও তদন্তের প্রয়োজন ছিল। সেসব যাচাই করে তাকে আবার কক্সবাজার পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তাজমিনের বাবা-মা রাজুর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ দিতে চাইলে কক্সবাজার জেলা পুলিশের কাছে দিতে পারবেন।
অন্যদিকে কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অহিদুর রহমান জানিয়েছেন, অধিযাচনপত্র অনুযায়ী রাজুকে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছিল। কিন্তু তারাই আবার তাকে ফেরত দেওয়ায় পরে রাজুকে আদালতে সোপর্দ করেছে কক্সবাজার সদর মডেল থানা পুলিশ।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র ও হোটেলকর্মীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ৬ অক্টোবর সন্ধ্যায় তাজমিনকে নিয়ে কক্সবাজার শহরের কলাতলী এলাকার একটি আবাসিক হোটেলে ওঠেন রাজু। হোটেলের নিবন্ধন খাতায় তাজমিনের নাম লেখা হয় ‘তানজু আক্তার’। বয়স ১৮ বছর। সেখানে তাকে রাজুর স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়। রাজুর পরিচয়ে লেখা হয়, তিনি বান্দরবানের লামা এলাকার মনির আহমদের ছেলে।
হোটেলের এক কর্মচারী জানিয়েছেন, পরদিন ৭ অক্টোবর বেলা ১১টার দিকে তারা হোটেল ছেড়ে চলে যান। নিবন্ধন খাতায় রাজুর দুটি মোবাইল ফোন নাম্বার ও জাতীয় পরিচয়পত্রের নাম্বার লেখা রয়েছে। হোটেলের সিসিটিভি ফুটেজেও তাদের একসঙ্গে বের হতে দেখা গেছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ফেসবুকে পরিচয়ের সূত্র ধরে তাজমিন কক্সবাজারে আসেন। পরে কুমিল্লায় ফেরার জন্য রাজুই তাকে আইকনিক এক্সপ্রেসের বাসের টিকিট কেটে দেন। কুমিল্লায় পৌঁছে বাস থেকে নেমে বাড়ি যাওয়ার জন্য একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ওঠেন তাজমিন।
পুলিশের দাবি, অটোরিকশাচালক সুমন মিয়া তাকে লালমাই উপজেলার জগতপুর এলাকার একটি ধানক্ষেতে নিয়ে ধর্ষণের পর শ্বাসরোধে হত্যা করেন। গত বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে ধানক্ষেত থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
তাজমিনের বাবা আব্দুল আলীমের করা হত্যা মামলায় অটোরিকশাচালক সুমনকে গত শুক্রবার চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করে কুমিল্লা জেলা গোয়েন্দা পুলিশ। পুলিশের ভাষ্য, সুমন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। তার দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাজমিনের ব্যবহৃত আইফোনও উদ্ধার করা হয়েছে।
পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, গত ৪ অক্টোবর এক বান্ধবীকে হাতঘড়ি দেওয়া নিয়ে মায়ের সঙ্গে ঝগড়ার পর বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান তাজমিন। পুলিশের দাবি, প্রথমে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এক বান্ধবীর কাছে যান তিনি। পরে রাজুর সঙ্গে যোগাযোগ করে কক্সবাজারে আসেন।




