উখিয়ায় পাঁচ দিন ধরে জ্বলছে ‘সম্ভাবনার আগুন’
- নলকূপ খননের সময় বের হওয়া গ্যাসে আগুন
- পঞ্চম দিনেও আগুন নিয়ন্ত্রণে আসেনি
- নতুন ‘গ্যাসক্ষেত্র’ দাবি নিয়ে দ্বিমত

ইনানীতে নলকূপ খনন করতে গিয়ে মাটির নিচ থেকে বেরিয়ে আসা গ্যাসের আগুন আপাতত জ্বালিয়ে রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পেট্রোবাংলা। ছবি: আগামীর সময়
কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীতে নলকূপ খননের সময় ভূগর্ভ থেকে বের হওয়া গ্যাসের আগুন জ্বলছে পঞ্চম দিনের মতো। সময় যত যাচ্ছে, এ আগুন নিয়ে ততই বাড়ছে আলোচনার ডালপালা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও বিভিন্ন সংবাদে ঘটনাটিকে উল্লেখ করা হয়েছে দেশের ৩১তম গ্যাসক্ষেত্র ‘আবিষ্কার’ হিসেবে। পেট্রোবাংলা কিংবা বাপেক্সও অস্বীকার করছে না সম্ভাবনার কথা। তবে সরকারি এই সংস্থাগুলো বলছে, ঘটনাস্থলকে এখনই গ্যাসক্ষেত্র বলার সুযোগ নেই।
গত ২৭ অক্টোবর উখিয়ার জালিয়াপালং ইউনিয়নের ছোট ইনানী এলাকায় মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ নামের এক ব্যক্তির বাড়ির আঙিনায় নলকূপ বসানোর জন্য প্রায় এক হাজার ফুট গভীর পর্যন্ত খনন করা হয়। পানি না পাওয়ায় পাইপ ও খননকাজে ব্যবহৃত সরঞ্জাম তুলে নেওয়ার পর সেখান থেকে গ্যাস ও পানি বের হতে শুরু করে। একপর্যায়ে গ্যাসে আগুন ধরে যায়। এর পর থেকে আগুন জ্বলছে।
এ ঘটনায় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে ১৫ দিন সময় নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে পেট্রোবাংলা ও বাপেক্স। আগুন আপাতত জ্বালিয়ে রাখার সিদ্ধান্তের কথা জানিয়ে বাংলাদেশ তেল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ করপোরেশন (পেট্রোবাংলা) বলছে, গ্যাসের স্বাভাবিক প্রবাহ কমে না আসা পর্যন্ত আগুন নেভানো বা গ্যাস বের হওয়ার পথ বন্ধ করা যাবে না। তাতে ভূগর্ভে গ্যাস জমে উচ্চচাপ তৈরি হয়ে বিস্ফোরণের ঝুঁকি বাড়বে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম এক্সপ্লোরেশন অ্যান্ড প্রোডাকশন কোম্পানি লিমিটেডের (বাপেক্স) কর্মকর্তারা বলছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমসহ বিভিন্ন মাধ্যমে এটিকে যে নতুন গ্যাসক্ষেত্র বলে দাবি করা হয়েছে, তার ভিত্তি নেই। গবেষণা ও পরবর্তী জরিপ ছাড়া এখনই নিশ্চিত তথ্য দেওয়া সম্ভব নয়।
অবশ্য নিরাপত্তাব্যবস্থার অংশ হিসেবে গ্যাস নির্গমনের কেন্দ্র থেকে ৫০ মিটার ব্যাসার্ধের এলাকাকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ রেড জোন হিসেবে চিহ্নিত করার সুপারিশ করা হয়েছে। সেখানে সাধারণ মানুষের প্রবেশ ও অবস্থান সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ থাকবে। এর বাইরের ১০০ মিটার পর্যন্ত এলাকায় ধূমপান, দিয়াশলাই বা লাইটার ব্যবহারসহ আগুন বা অগ্নিস্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি করতে পারে— এমন সব কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ থাকবে।
এ ছাড়া ২০০ মিটার ব্যাসার্ধের পর্যবেক্ষণ জোনে বাপেক্সের কারিগরি দলের তত্ত্বাবধানে নতুন করে কোথাও গ্যাস নির্গমন হচ্ছে কি না, তা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করতে হবে। নো ফায়ার জোনের মধ্যে থাকা বৈদ্যুতিক লাইনগুলোর ওপরও সার্বক্ষণিক নজরদারি রাখার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় ঘটনাস্থলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য বাড়িয়ে স্থানীয় প্রশাসন ও বিশেষজ্ঞ দলকে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়ার কথাও বলা হয়েছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পান্না আক্তার জানিয়েছেন, পেট্রোবাংলা ও বিশেষজ্ঞদের নির্দেশনা অনুযায়ী পরিস্থিতি বিবেচনায় নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আগামী ১৫ দিন গ্যাসের প্রবাহ পর্যবেক্ষণ করা হবে। এ সময়ের পর্যবেক্ষণের ভিত্তিতে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে।
বাপেক্সের ব্যবস্থাপক (ভূতত্ত্ব) ও ভূতাত্ত্বিক জরিপ দলের প্রধান এস এম নাফিফুন আরহাম গতকাল একাধিক সংবাদমাধ্যমকে বলেছেন, পাহাড়ি এলাকায় এক হাজার ফুটের মধ্যে বড় কোনো গ্যাসের আধার থাকার সম্ভাবনা একেবারে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে দেশে এ ধরনের বড় আবিষ্কারের নজির খুব বেশি নেই।
গভীরের কোনো বড় গ্যাসের আধারের সঙ্গে এ ঘটনার সংযোগ থাকতে পারে কি না, সেটি পর্যবেক্ষণ ও জরিপের পর বোঝা যাবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মাইন্স) প্রকৌশলী মো. শোয়েব বলেছেন, এ ধরনের অনিয়ন্ত্রিত গ্যাস নির্গমন বন্ধ করতে বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে ভূগর্ভ থেকে পাশ কাটিয়ে বা ‘সাইড ট্র্যাক’ করে রিলিফ ওয়েল খননের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়। আগুনের উচ্চতা যদি বেড়ে যায় বা একই রকম থাকে, তাহলে আমরা রিলিফ ওয়েল করার চিন্তাভাবনা করব।
তবে গ্যাসের প্রবাহ কমে গেলে বা স্বাভাবিকভাবে বন্ধ হয়ে গেলে পরিস্থিতি ভিন্ন হতে পারে বলে জানান তিনি। প্রকৌশলী শোয়েব আরও জানালেন, প্রাথমিক পর্যবেক্ষণের পর বাপেক্স সেখানে থ্রিডি সাইসমিক জরিপ করার পরিকল্পনা করছে। এ জরিপের মাধ্যমে ভূগর্ভের গঠন সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হবে। সেখানে সম্ভাব্য কোনো গ্যাসের আধার থাকলে তার অবস্থান এবং অর্থনৈতিকভাবে তা উত্তোলনযোগ্য কি না, সে বিষয়ে ধারণা পাওয়া যেতে পারে।



