বর্ষার আগেই রাজশাহীতে এডিসের লাল সংকেত

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই রাজশাহী নগরীতে ডেঙ্গুবাহক এডিস মশার বংশবিস্তার উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক প্রাক-বর্ষা কীটতাত্ত্বিক জরিপে এডিসের ঘনত্ব ও লার্ভার উপস্থিতি বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার নির্ধারিত ঝুঁকিসীমার অনেক ওপরে পাওয়া গেছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে আসন্ন বর্ষায় ডেঙ্গু সংক্রমণ বাড়তে পারে।
গত মে মাসে পরিচালিত জরিপে রাজশাহী সিটি করপোরেশন এলাকার ব্রেটো ইনডেক্স পাওয়া গেছে ৩০ দশমিক ৬৬। ডব্লিউএইচওর মানদণ্ড অনুযায়ী, এ সূচক ২০-এর বেশি হলে সেটি ডেঙ্গু সংক্রমণের উচ্চ ঝুঁকির ইঙ্গিত হিসেবে ধরা হয় এবং তখন জরুরি ভিত্তিতে মশক নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম জোরদার করার সুপারিশ করা হয়। জরিপে নগরীর বিভিন্ন এলাকার ৭৫টি বাড়ি পরিদর্শন করা হয়। এর মধ্যে ১৫টি বাড়িতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। ফলে হাউস ইনডেক্স দাঁড়িয়েছে ২০ শতাংশ। একই সঙ্গে পরীক্ষা করা ৫২টি পানিধারণকারী পাত্রের মধ্যে ২৩টিতে লার্ভা শনাক্ত হওয়ায় কনটেইনার ইনডেক্স হয়েছে ৪৪ দশমিক ২৩ শতাংশ।
স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা বলছেন, বর্ষা শুরুর আগেই নগরীতে এডিস মশার সক্রিয় বংশবিস্তার পরিস্থিতি উদ্বেগজনক করে তুলেছে। সাধারণত বর্ষাকালে বৃষ্টির পানি জমে মশার প্রজননের পরিবেশ আরও অনুকূল হয়ে ওঠে। তাই এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ডেঙ্গুর প্রকোপ বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত বছরের প্রাক-বর্ষা জরিপে লার্ভার উপস্থিতি ছিল ১০ থেকে ১৫ শতাংশের মধ্যে। সেই তুলনায় চলতি বছরের পরিস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে খারাপ হয়েছে।
রাজশাহী বিভাগীয় স্বাস্থ্য কার্যালয়ের এন্টো-টেকনিশিয়ান আব্দুল বারী বলছেন, ‘নিয়মিত প্রাক-বর্ষা নজরদারির অংশ হিসেবে জরিপটি পরিচালনা করা হয়েছে। নগরীতে মশার লার্ভা এবং পূর্ণবয়স্ক মশার সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে।’
জেলা কীটতত্ত্ববিদ উম্মে হাবিবা জানালেন, ফুলের টব, ছাদবাগান, খোলা নারকেলের খোসা, দইয়ের পাত্র, শিশুদের খেলনাসহ বিভিন্ন ধরনের পানিধারণকারী সামগ্রীতে এডিস মশার লার্ভা পাওয়া গেছে। তিনি বলছিলেন, জরিপের ফলাফল এবং লার্ভা নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত সুপারিশ রাজশাহী সিটি করপোরেশনের কাছে পাঠানো হয়েছে।
তবে রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রধান পরিচ্ছন্নতা কর্মকর্তা শেখ মো. মামুন জানান, সোমবার (০৮ জুন) বিকেল পর্যন্ত স্বাস্থ্য বিভাগের কোনো জরিপ প্রতিবেদন বা সুপারিশ তাদের কাছে পৌঁছেনি। তবে বর্ষা সামনে রেখে নগরীর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা সচল রাখতে বিভিন্ন প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রম চলছে। বাসিন্দাদের ঘরের টব, ছাদের পানির ট্যাংক, পরিত্যক্ত টায়ার, নির্মাণসামগ্রী এবং অন্যান্য স্থানে জমে থাকা পানি দ্রুত অপসারণের আহ্বান জানান তিনি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতি পাঁচটি বাড়ির একটিতে এবং প্রায় অর্ধেক পানিধারণকারী পাত্রে লার্ভার উপস্থিতি প্রমাণ করে যে উৎসস্থল ধ্বংসে পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্য বিভাগ, সিটি করপোরেশন এবং নগরবাসীর সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। বিশেষজ্ঞরা আরও বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, দ্রুত নগরায়ণ এবং অপরিকল্পিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কারণে ডেঙ্গুবাহক এডিস মশার বিস্তৃতি এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মে পর্যন্ত ৫১ জন ডেঙ্গু রোগী হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। একই সময়ে ১৮ মাস বয়সী এক শিশুসহ তিনজনের মৃত্যু হয়েছে।
হাসপাতালের মুখপাত্র ও জরুরি বিভাগের ইনচার্জ ডা. শংকর কে বিশ্বাস বলেছেন, ‘জরিপের ফলাফল গুরুত্ব দিয়ে এখনই লার্ভা ধ্বংস অভিযান জোরদার করতে হবে। পাশাপাশি জনসচেতনতা বৃদ্ধি এবং মশার প্রজননস্থলগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণের বিকল্প নেই।’
তিনি সতর্ক করছেন, ‘মশার বংশবিস্তার নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে আসন্ন বর্ষা মৌসুমে রাজশাহী নগরীতে ডেঙ্গু সংক্রমণের ঝুঁকি আরও বাড়বে।’




