বিঘায় লোকসান ২ হাজার ৭০০ টাকা

রংপুর অঞ্চলে এ বছর ফলন ভালো হয়েছে বোরো ধানের। মাঠ ভরে উঠেছে ধানে, কৃষকের উঠানেও উঠছে নতুন ফসল। তবে সেই আনন্দের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে গভীর উদ্বেগ। কারণ উৎপাদন খরচের তুলনায় বাজারে ধানের দাম অনেক কম।
কৃষকদের দাবি, এক মণ ধান উৎপাদনে যেখানে খরচ হয়েছে প্রায় ১ হাজার টাকা, সেখানে বাজারে তারা বিক্রি করছেন ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকায়। ফলে প্রতি বিঘা জমিতে লোকসান গুনতে হচ্ছে গড়ে প্রায় ২ হাজার ৭০০ টাকা।
কৃষি অর্থনীতিবিদদের মতে, উৎপাদন ব্যয় ও বাজার দামের এই ব্যবধান শুধু কৃষকের আয়কেই সংকুচিত করছে না, ভবিষ্যতে ধান চাষে আগ্রহ কমিয়ে খাদ্য নিরাপত্তার জন্যও তৈরি করতে পারে ঝুঁকি।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, রংপুর, কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী ও গাইবান্ধা— এই পাঁচ জেলায় চলতি মৌসুমে বোরো আবাদ হয়েছে প্রায় ৫ লাখ ৯ হাজার হেক্টর জমিতে।
কৃষকদের দেওয়া হিসাব বলছে, এক বিঘা (৩৩ শতাংশ) জমি আবাদে এ বছর গড়ে প্রায় ১৮ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। এর মধ্যে বীজ ও বীজতলা তৈরিতে খরচ হয়েছে ১ হাজার টাকা। জমি প্রস্তুত করতে ব্যয় ১ হাজার ৫০০ টাকা। এ ছাড়া চারা রোপণ ১ হাজার ৫০০, রাসায়নিক সার ১ হাজার ৫০০, জৈব সার ১ হাজার, আগাছা দমনে ব্যয় ২ হাজার, সেচ খরচ ৩ হাজার, কীটনাশক ১ হাজার, ধান কাটা ১ হাজার ৫০০, মাড়াই ও পরিবহন ২ হাজার এবং জমির ভাড়া বাবদ খরচ হয়েছে ২ হাজার টাকা। প্রতি বিঘায় গড়ে ১৮ মণ ধান উৎপাদন হলে প্রতি মণে ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় ১ হাজার টাকা।
তবে বাজারে এখন প্রতি মণ ধান বিক্রি হচ্ছে ৮০০ থেকে ৮৫০ টাকায়। সে হিসাবে ১৮ মণ ধান বিক্রি করে একজন কৃষক পাচ্ছেন প্রায় ১৫ হাজার ৩০০ টাকা। অর্থাৎ বিঘাপ্রতি লোকসান প্রায় ২ হাজার ৭০০ টাকা।
কৃষকদের অভিযোগ, চাষাবাদের খরচ মেটাতে তারা ঋণ নিয়েছেন মহাজনদের কাছ থেকে। ধান ঘরে তোলার পর সেই ঋণ পরিশোধের চাপেই বাধ্য হচ্ছেন কম দামে বিক্রি করতে।
রংপুরের কাউনিয়া উপজেলার কৃষক আশরাফ আলী বলেছেন, ‘যে ফসলই করি, লাভ তো দূরের কথা, লোকসানই হয়। এবার বোরো ধানেও একই অবস্থা।’
এ বছর ধানের উচ্চ ফলন হয়েছে। কৃষক উৎপাদনে সন্তুষ্ট হলেও বাজারদর নিয়ে হতাশ -সিরাজুল ইসলাম, অতিরিক্ত পরিচালক, রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর
গঙ্গাচড়া উপজেলার কৃষক সুবল রায় আশা করেছিলেন প্রতি মণ ধান অন্তত ১ হাজার টাকায় বিক্রি করতে পারবেন। কিন্তু বাজারে সেই দাম না পেয়ে শেষ পর্যন্ত ৮৫০ টাকায় বিক্রি করেছেন। তার ভাষায়, ‘গত বছর একই সময়ে তিনি প্রতি মণ ধান বিক্রি করেছিলেন ১ হাজার ৫০ টাকায়।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, নতুন ধানের সরবরাহ বেড়ে যাওয়ায় বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি অনেক ব্যবসায়ীর গুদামে এখনো রয়েছে পুরনো ধানের মজুদ। বাজারে আসা ধানের একটি অংশ পর্যাপ্তভাবে শুকানো না হওয়ায় ক্রেতারা অপেক্ষাকৃত কম দাম প্রস্তাব করছেন।
তবে কৃষকদের অভিযোগ ভিন্ন। তাদের দাবি, ধান কাটার মৌসুমে ব্যবসায়ী ও মধ্যস্বত্বভোগীরা নিয়ন্ত্রণে রাখেন বাজার। নগদ অর্থের প্রয়োজন হওয়ায় কৃষক বাধ্য হন কম দামেই বিক্রি করতে।
সরকার প্রতি বছর নির্ধারিত মূল্যে ধান সংগ্রহ করলেও কৃষকদের অভিযোগ, সরাসরি সেই সুবিধা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পান না তারা। সরকারি সংগ্রহ ব্যবস্থায় তালিকাভুক্ত মিল মালিকরাই পান বেশি সুবিধা। পরে তারা কৃষকের কাছ থেকে বা মধ্যস্বত্বভোগীদের মাধ্যমে ধান সংগ্রহ করেন। ফলে সরকারি ক্রয়ের সুফল পৌঁছায় না কৃষকের কাছে।
অবশ্য রংপুরের আঞ্চলিক খাদ্য কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম বলেছেন, ‘সরকার এ বছর ধানের সংগ্রহমূল্য নির্ধারণ করেছে প্রতি কেজি ৩৬ টাকা।’ সরকারি ক্রয় কার্যক্রম শুরু হওয়ায় বাজারদর কিছুটা বাড়তে পারে— আশা করছেন তিনি।
বাজার বিশ্লেষকদের দাবি, দেশে বোরো ধানের বড় অংশ সরবরাহ করা হয় রংপুর অঞ্চল থেকে। ফলে এ অঞ্চলের কৃষকদের আয় কমে গেলে তার প্রভাব স্থানীয় অর্থনীতিতেও পড়ে। কৃষকদের হাতে থাকা অর্থ কমে গেলে কৃষিযন্ত্র, সার, বীজ, ভোগ্যপণ্য ও স্থানীয় বাজারে কমে যায় ক্রয়ক্ষমতা। এর ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে গ্রামীণ অর্থনীতির বিভিন্ন খাত।
কৃষকদের আশঙ্কা, ধারাবাহিক লোকসান চলতে থাকলে আগামী আমন মৌসুমে অনেকে চাষের পরিমাণ কমিয়ে দিতে পারেন বা ঝুঁকতে পারেন বিকল্প ফসলের দিকে। উৎপাদন ব্যয় বিবেচনায় প্রতি মণ ধানের দাম অন্তত ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা হলে যুক্তিসংগত লাভ পেতেন বলে মনে করেন তারা।
রংপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেছেন, ‘এ বছর ধানের উচ্চ ফলন হয়েছে। কৃষক উৎপাদনে সন্তুষ্ট হলেও বাজারদর নিয়ে হতাশ।’ তার মতে, প্রতি মণ ধান ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হলে কৃষক লাভের মুখ দেখতে পারবেন।




