‘জিআই পণ্য’ পানের প্রতীকে সাজল মোহনপুরের প্রবেশপথ

ছবি: আগামীর সময়
দূর থেকে চোখে পড়বে পানের প্রতীক। কাছে গেলে বোঝা যাবে, এটি শুধু কোনো উপজেলার সীমানা নির্দেশক নয়; এটি একটি জনপদের শত বছরের কৃষি ঐতিহ্য, হাজারো মানুষের জীবন-জীবিকা এবং নিজস্ব পরিচয়ের প্রতীক।
জিআই (ভৌগোলিক নির্দেশক) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া রাজশাহীর মোহনপুরের পান এবার স্থায়ীভাবে জায়গা করে নিল উপজেলার প্রবেশপথে।
আজ সোমবার সকালে রাজশাহী-নওগাঁ মহাসড়কের বসন্তকেদার এলাকায় নির্মিত এই সীমানা পিলারের ফলক উন্মোচন করেন রাজশাহীর জেলা প্রশাসক কাজী শহিদুল ইসলাম।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জেলা প্রশাসক বলেছেন, প্রতিটি উপজেলার প্রবেশমুখে নিজস্ব পরিচয় বহনকারী একটি স্থাপনা থাকা প্রয়োজন। দীর্ঘদিনের জটিলতা কাটিয়ে মোহনপুরের এই সীমানা পিলার নির্মাণ করা হয়েছে।
তিনি বললেন, জিআই স্বীকৃত মোহনপুরের পান এ উপজেলার ঐতিহ্য, অর্থনীতি ও স্বাতন্ত্র্যের অন্যতম প্রতীক। তাই সীমানা পিলারে পানের প্রতীক যুক্ত করার মাধ্যমে মোহনপুরের নিজস্ব পরিচয়কে আনুষ্ঠানিকভাবে তুলে ধরা হয়েছে। সীমানা পিলারের পাশে ‘এক নজরে মোহনপুর’ শিরোনামে একটি তথ্যসমৃদ্ধ ব্যানার স্থাপন করা হবে। এতে দর্শনার্থীরা উপজেলার ইতিহাস, ঐতিহ্য, কৃষি, অর্থনীতি ও সম্ভাবনা সম্পর্কে সহজেই জানতে পারবেন।
জানা গেছে, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তরের গ্রামীণ অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ কর্মসূচির আওতায় ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করেছে মোহনপুর উপজেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অধিদপ্তর।
মোহনপুর উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা প্রকৌশলী তারিকুল ইসলাম বললেন, মোহনপুরের প্রধান কৃষিপণ্য হলো পান। এখানকার পান দেশের বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ হয় এবং এর আলাদা সুনাম রয়েছে। উপজেলার পরিচয়কে মানুষের সামনে তুলে ধরতেই সীমানা পিলারে পানের প্রতীক ব্যবহার করা হয়েছে। এটি শুধু একটি অবকাঠামো নয়, বরং মোহনপুরের কৃষি ঐতিহ্যের প্রতীক। ভবিষ্যতেও এলাকার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও মানুষের সঙ্গে সম্পর্কিত এমন উন্নয়নমূলক উদ্যোগ বাস্তবায়নের চেষ্টা থাকবে।
মৌগাছি ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মেজর আলী বিশ্বাস বললেন, ‘এই সীমানা পিলার নির্মাণের জন্য এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা ছিল। নানা সীমাবদ্ধতার কারণে এতদিন তা বাস্তবায়ন হয়নি। অবশেষে সেই প্রত্যাশা পূরণ হয়েছে। পানের প্রতীক যুক্ত হওয়ায় মোহনপুরের পরিচয় আরও শক্তিশালী হলো।’
স্থানীয় বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোর্তজা বলেছেন, মোহনপুরের ঐতিহ্যকে ধারণ করে এমন একটি স্থাপনা নির্মাণ এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি ছিল। আজ সেই স্বপ্ন বাস্তবে রূপ নিয়েছে।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন মোহনপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাহিমা বিনতে আখতার, সহকারী কমিশনার (ভূমি) জোবায়দা সুলতানা, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা প্রকৌশলী তারিকুল ইসলাম, মৌগাছি ইউনিয়ন পরিষদের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মেজর আলী বিশ্বাস, বীর মুক্তিযোদ্ধা, জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা।
রাজশাহীর মোহনপুর দীর্ঘদিন ধরেই পান উৎপাদনের জন্য পরিচিত। এ উপজেলার মাটি, আবহাওয়া ও কৃষি পরিবেশ পান চাষের জন্য উপযোগী হওয়ায় বহু বছর ধরে এখানে বাণিজ্যিকভাবে পান উৎপাদন হয়ে আসছে। স্থানীয় কৃষকদের কাছে পান শুধু একটি ফসল নয়, এটি পরিবারের আয়ের অন্যতম উৎস। উপজেলার বিভিন্ন এলাকার পান দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের বাজারে সরবরাহ হয়।
জিআই স্বীকৃতি পাওয়ার মাধ্যমে মোহনপুরের এই ঐতিহ্য এখন জাতীয় পর্যায়ে নতুন পরিচিতি পেয়েছে। জিআই স্বীকৃতি কোনো পণ্যের নির্দিষ্ট এলাকার উৎপাদন, গুণগত বৈশিষ্ট্য ও ঐতিহ্যের সরকারি স্বীকৃতি। ফলে মোহনপুরের পান এখন শুধু স্থানীয় কৃষিপণ্য নয়, বরং এলাকার পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে।
স্থানীয়দের মতে, বর্তমান সময়ে একটি এলাকার পরিচিতি ও ব্র্যান্ড তৈরি করতে প্রতীকী স্থাপনার গুরুত্ব অনেক। জিআই স্বীকৃত মোহনপুরের পানের প্রতীক বহনকারী এই সীমানা পিলার শুধু উপজেলার প্রবেশপথের সৌন্দর্য বাড়াবে না, বরং দেশের মানুষের কাছে তুলে ধরবে একটি কৃষিনির্ভর জনপদের গল্প।
তাদের প্রত্যাশা, এই প্রতীকী স্থাপনা ভবিষ্যতে মোহনপুরের পর্যটন সম্ভাবনা বাড়াবে, কৃষিপণ্যের পরিচিতি বিস্তৃত করবে এবং নতুন প্রজন্মের কাছে স্থানীয় ঐতিহ্য সংরক্ষণের অনুপ্রেরণা হয়ে থাকবে।





