লাম্পি স্কিন রোগের আতঙ্কে রাজশাহীর চামড়া ব্যবসায়ীরা, ১০০টিতে ৪০টি বাতিলের শঙ্কা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে রাজশাহীর চামড়া ব্যবসায়ীরা এবার বিশেষ উদ্বেগে রয়েছেন। কয়েক বছরের ধারাবাহিক লোকসানের পর এবার নতুন আতঙ্ক হয়ে দেখা দিয়েছে লাম্পি স্কিন রোগ। ব্যবসায়ীদের আশঙ্কা, এই রোগে আক্রান্ত পশুর চামড়া ট্যানারিতে গ্রহণযোগ্যতা হারাবে। ফলে প্রতি ১০০টি চামড়ার মধ্যে অন্তত ৪০টি বাতিল হয়ে যেতে পারে।
রাজশাহী জেলা চামড়া ব্যবসায়ী গ্রুপের সভাপতি লুৎফর রহমানের উদ্বেগ, 'লাম্পি রোগ থাকায় এবার ১০০টি চামড়ার মধ্যে অন্তত ৪০টি বাদ যেতে পারে। অনেক পশুর শরীরে দাগ ও ক্ষত রয়েছে। তাই খুব সতর্ক হয়ে চামড়া কিনতে হবে, তা না হলে বড় ধরনের লোকসান হতে পারে।'
তিনি জানান, 'চামড়া শিল্প দেশের গুরুত্বপূর্ণ রপ্তানি খাত। কিন্তু কয়েক বছর ধরে এই খাত নানা সংকটে ভুগছে। এবার রাজশাহী জেলায় কোটি টাকার বেশি চামড়া বেচাকেনার আশা রয়েছে, তবে বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকারকে মাঠপর্যায়ে আরও কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে।'
রাজশাহীর বিভিন্ন উপজেলা ও মহানগর এলাকায় ঘুরে দেখা গেছে, চামড়া সংগ্রহ ও সংরক্ষণের প্রস্তুতি থাকলেও বাজারে বিরাজ করছে চাপা উৎকণ্ঠা। মৌসুমি ব্যবসায়ীরা এবার অনেকটাই সতর্ক। কেউ কম পুঁজি নিয়ে মাঠে নামছেন, আবার কেউ পুরোপুরি সরে দাঁড়িয়েছেন।
মৌসুমি ব্যবসায়ী মাসুম আলী বললেন, 'এইবার ভালো চামড়া খুব কম পাওয়া যাবে। গরুর স্কিনে নানা রোগ থাকায় অনেক চামড়ার ভেতর ফুলে গেছে। সে চামড়া চলবে না।' তার ভাষ্য, 'আমরা ঈদের দিন বেশি দামে চামড়া কিনি। পরে আড়ত বা ট্যানারিতে গিয়ে সেই দাম আর পাই না। পরিবহন খরচ, লবণ, শ্রমিক—সব মিলিয়ে অনেক সময় বড় ক্ষতি হয়। সরকার যদি প্রান্তিক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে সরাসরি চামড়া কিনত, তাহলে অন্তত আমরা বাঁচতে পারতাম।'
লাম্পি স্কিন রোগে আক্রান্ত পশুর শরীরে গুটি, ক্ষত, দাগ ও চামড়ার ভেতরে ফুলে যাওয়ার মতো সমস্যা দেখা দেয়। এতে চামড়ার মান নষ্ট হয়ে যায় এবং ট্যানারিগুলো এই চামড়া কম দামে কিনতে চায়, অনেক সময় নেয়ও না।
তবে রাজশাহী জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. আতোয়ার রহমান কিছুটা আশার কথা শুনিয়েছেন। তার ভাষ্য, 'লাম্পি স্কিন রোগ গতবারের তুলনায় এবার অনেক কম। কেননা, গতবার এই রোগের ভ্যাকসিন ছিল না। এবার সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে ভ্যাকসিন দেওয়া হয়েছে।' তবে তিনি স্পষ্ট করেন, এবারও যে লাম্পি স্কিন রোগ নেই, তা বলা যাবে না। তার পরামর্শ, কোরবানির পশু কিনতে গেলে সুস্থ-সবল দেখে কেনা উচিত, তাহলে এই সমস্যা অনেকাংশে এড়ানো সম্ভব।
এদিকে সরকার এ বছর কোরবানির পশুর চামড়ার দাম নির্ধারণ করেছে। ঢাকায় গরুর লবণযুক্ত চামড়ার প্রতি বর্গফুটের দাম ৬২ থেকে ৬৭ টাকা, যা গত বছরের তুলনায় দুই টাকা বেশি। ঢাকার বাইরে এই দাম ৫৭ থেকে ৬২ টাকা। খাসির চামড়ার দাম ২৫ থেকে ৩০ টাকা এবং বকরির চামড়ার দাম ২২ থেকে ২৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ের ব্যবসায়ীরা সংশয় প্রকাশ করেছেন যে কাগজে-কলমে দাম বাড়লেও বাস্তবে সেই দামে চামড়া বিক্রি করা যাবে কি না।
চামড়া সংরক্ষণ নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। ব্যবসায়ীরা জানান, গরমে পশু জবাইয়ের পর দ্রুত চামড়া নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি থাকে। আট থেকে ১০ ঘণ্টার মধ্যে ঠিকমতো লবণ না দিতে পারলে চামড়া পচতে শুরু করে এবং ২২ থেকে ২৪ ঘণ্টা পার হলে তা অনেকাংশে মূল্য হারায়। একসময় মাদ্রাসা ও এতিমখানাগুলো নিজেরাই চামড়া সংরক্ষণ করত, তবে কয়েক বছরের লোকসানের কারণে এখন অনেক প্রতিষ্ঠান আর আগের মতো আগ্রহ দেখাচ্ছে না। পরিস্থিতি সামাল দিতে এ বছর প্রায় ২০ কোটি টাকার লবণ জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে সারাদেশে বিতরণ করা হয়েছে। রাজশাহী মহানগর ও জেলার নয়টি উপজেলায়ও সেই বিতরণ সম্পন্ন হয়েছে। আসন্ন ঈদুল আজহায় রাজশাহীতে মোট পশুর চাহিদা ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৭১ হাজার ৫৮টি।






