১ সপ্তাহে ২ কারণে ৩ সেতু বিধ্বস্ত
- ঝুঁকিপূর্ণ ব্রিজ ও অতিরিক্ত মালবোঝাই যানবাহন

ছবি: আগামীর সময়
এখনো হয়নি মেরামত
ময়মনসিংহ:
ময়মনসিংহের কংস নদীর ওপর থাকা বেইলি ব্রিজ ঝুঁকিপূর্ণ ঘোষণা করা হয়েছিল ১০ বছর আগেই। দুই পাশে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ডও টানিয়েছিল স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগ। সেই সতর্কতা অমান্য করে বালুবাহী একটি ট্রাক গত ৭ জুন যাচ্ছিল ধোবাউড়ায়। তবে মাঝপথেই ভেঙে পড়েছিল ব্রিজটি। ঘটনার এক সপ্তাহ পার হলেও মেরামত করা হয়নি অবকাঠামোটি। বন্ধ রয়েছে যান চলাচল।
সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে ধোবাউড়া উপজেলা প্রকৌশল বিভাগ জানিয়েছে, এখনো ভাঙা অবস্থাতেই আছে সেতুটি। মানুষের চলাচলের জন্য নেওয়া হচ্ছে উদ্যোগ। বরাদ্দ পেলে করা হবে সংস্কার।
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) অফিসের তথ্য বলছে, সেতুটি নির্মাণ হয়েছিল প্রায় ২৫ বছর আগে। ৮-১০ বছর ধরেই ছিল ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায়। মাঝেমধ্যে করা হয়েছিল সংস্কার। এলজিইডির পক্ষ থেকে সেতুর পাশে টানানো ছিল ঝুঁকিপূর্ণ লেখা সাইনবোর্ডও। কিন্তু এই সতর্কতা অমান্য করে প্রতিদিন চলাচল করত বালুবাহী ট্রাক। প্রতিটি ট্রাকই ছিল ওভারলোড।
সেতু ভেঙে পড়ার তিন কারণের কথা জানিয়েছেন ধোবাউড়া উপজেলা প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম। তার ভাষায়, প্রথমত, ঝুঁকিপূর্ণ ছিল সেতুটি। দ্বিতীয়ত, ট্রাকটিও ছিল অতিরিক্ত বালুবোঝাই করা। তৃতীয়ত, ট্রাকচালকও ছিলেন না সতর্ক। সেতু ভেঙে পড়ার বিষয়টি তিনি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকেও জানিয়েছেন। দুর্ঘটনার পর এখন সেতু দিয়ে লোকজনের চলাচল বন্ধ। সমস্যাটি আপাতত সমাধানের চেষ্টা করছেন তারা।
স্থানীয়দের ভাষ্য, সেতুটি মজবুত ছিল না। স্থানীয় সরকার প্রকৌশল বিভাগের সতর্কতাও মানতেন না ভারী যানবাহনচালকরা। এ কারণে ঘটেছে দুর্ঘটনা। তবে সৌভাগ্যের বিষয় হলো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি।
তাদের অভিযোগ, সেতুটির দুরবস্থা নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও ছিল উদাসীন। চালকরাও ঝুঁকির ব্যাপারে সতর্ক ছিলেন না।
সেতুটি আগেই ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথাও বলেছিলেন ময়মনসিংহ জেলা পরিষদের প্রশাসক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স। সময়মতো সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলে এ দুর্ঘটনা ঘটত না— মনে করেন তিনি।
অবশ্য এখানে বেইলি ব্রিজের পরিবর্তে পাকা সেতুর প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরেছেন সৈয়দ এমরান সালেহ।
দুর্ভোগে হাজারো মানুষ
মঠবাড়িয়া (পিরোজপুর):
পিরোজপুরের মঠবাড়িয়া-চরখালী আঞ্চলিক মহাসড়কের সাফা দেবীপুর মাদ্রাসাসংলগ্ন খালের ওপর বেইলি ব্রিজটি ভেঙে পড়ায় ঢাকা, বরিশাল, খুলনা, পিরোজপুরসহ প্রায় ১৫ রুটের সঙ্গে যান চলাচল বন্ধ রয়েছে মঠবাড়িয়া ও পাথরঘাটার। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন দুই পাড়ের হাজারো মানুষ। এর আগে গত ৯ জুন মঙ্গলবার গভীর রাতে অতিরিক্ত মাল (আলু) বোঝাই ট্রাক নিয়ে ধসে পড়ে সেতুটি। তবে এ ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি।
এলাকাবাসীর দাবি, সড়কের ঝুঁকিপূর্ণ বেইলি ব্রিজগুলো রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে প্রায়ই ঘটছে এমন ঘটনা। এর আগে এ সড়কের মাদারসি, তুষখালী, গুদিঘাটা বেইলি ব্রিজসহ বেশ কয়েকটি পণ্যবাহী ট্রাক নিয়ে একইভাবে ধসে পড়েছিল। এ ব্রিজটি ধসে যাওয়ায় যাত্রীদের যানবাহন থেকে নেমে হেঁটে নদী দিয়ে খেয়া পারাপার হতে হচ্ছে। সবচেয়ে ভোগান্তিতে পড়েছেন জরুরি রোগী পরিবহন ও ভারী মালামাল বহনকারী যাত্রীরা।
স্থানীয় আল আমীনের মতে, দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ বেইলি ব্রিজটি দিয়ে বাস, ট্রাকসহ যানবাহন পার হচ্ছিল। দ্রুত পাকা ব্রিজের কাজ শেষ করে চলাচলের ব্যবস্থা করে দিলে দূরপাল্লার ভারী যানবাহনসহ সবাই উপকৃত হতেন।
সড়কে চলাচলকারী ড্রাইভার বাবুলের ভাষ্য, ‘দীর্ঘদিন ধরে আমরা এ সড়কে ঝুঁকিপূর্ণ তুষখালী বেইলি ব্রিজসহ বেশ কয়েকটি ব্রিজ দিয়ে চলাচল করছি। অথচ প্রতিটি বেইলি ব্রিজের জায়গায় পাকা সেতুর কাজ চলমান রয়েছে। তবে ধীরগতিতে।’
পিরোজপুর সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. রাসেল আশ্বাস দেন, “বেইলি ব্রিজটি দীর্ঘদিন ঝুঁকিপূর্ণ থাকায় সড়ক ও জনপথের পাকা সেতুর কাজ প্রায় শেষদিকে। এরই মধ্যে অতিরিক্ত মালবাহী ট্রাক ব্রিজটি পার হওয়ার সময় ধসে পড়ে। ব্রিজটি ঝুঁকিপূর্ণ ছিল দীর্ঘদিন ধরে। অতিরিক্ত লোড নেওয়ায় ছিল নিষেধাজ্ঞা। ব্রিজটির পাশেই সাইনবোর্ডও টানানো ছিল ‘ঝুঁকিপূর্ণ নির্দেশিকা’। ওই সড়কের যান চলাচলের জন্য দ্রুত কাজ চলমান রয়েছে।”
এ ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) আকলিমা আক্তার জানান, ঢাকা-পাথরঘাটা মহাসড়কের বেইলি ব্রিজটির ধারণ ক্ষমতা ছিল ২০ টন। কিন্তু আলু বোঝাই ট্রাকের লোড ছিল অনেক বেশি। সেই কারণেই ব্রিজটি ভেঙে পড়েছে।
ছিল না সতর্কতা সাইনবোর্ড
গোপালগঞ্জ:
গোপালগঞ্জ শহরের পাচুড়িয়া এলাকায় একটি বেইলি ব্রিজ ভেঙে বালুভর্তি একটি ট্রাক খালে পড়ে যাওয়ায় বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে জেলা শহরের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক যোগাযোগ। এতে কয়েকজন আহত হওয়ার পাশাপাশি দুর্ভোগে পড়েছেন হাজারও মানুষ।
গতকাল রবিবার সকালে ঘোনাপাড়া-টেকেরহাট আঞ্চলিক মহাসড়কের পাচুড়িয়া বেইলি ব্রিজ দিয়ে অতিরিক্ত বালুভর্তি একটি ১০ চাকার ট্রাক যাচ্ছিল ঘোনাপাড়ার দিকে। ব্রিজের মাঝামাঝি পৌঁছালে হঠাৎ সেটি ভেঙে ট্রাকটি পড়ে যায় খালে। সেই সঙ্গে খালে পড়ে একটি ইজিবাইক ও একটি সাইকেল।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ঝুঁকিপূর্ণ ব্রিজ ও অতিরিক্ত মালবোঝাই ট্রাক পারাপারের চেষ্টা— মূলত দুই কারণেই ঘটছে এ দুর্ঘটনা। ‘ব্রিজটি ঝুঁকিপূর্ণ ছিল; কিন্তু সেখানে কোনো সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড ছিল না। স্থানীয়দের নিষেধ উপেক্ষা করে অতিরিক্ত মালবোঝাই ট্রাক পারাপারের চেষ্টায় ঘটেছে এ দুর্ঘটনা।’ বলছিলেন স্থানীয় বাসিন্দা সাগর আহমেদ।
সদর উপজেলার পুরাতন মানিকদাহ গ্রামের বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম জানালেন, প্রতিদিন এ ব্রিজ দিয়ে শহরে আসতে হয়। এখন দেড় কিলোমিটার অতিরিক্ত পথ ঘুরে যেতে হবে। সড়ক বিভাগের অবহেলাই এ ঘটনার জন্য দায়ী।
পাচুড়িয়া এলাকার বাসিন্দা শহিদুল ইসলামের অভিযোগ, বিকল্প রাস্তার ব্যবস্থা না করেই দুটি বেইলি ব্রিজের একটি অপসারণ করায় অবশিষ্ট ব্রিজটির ওপর সৃষ্টি হয়েছিল অতিরিক্ত চাপ। যথাযথ পরিকল্পনা থাকলে এমন দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব ছিল বলে মনে করেন তিনি। এদিকে এ ঘটনায় ট্রাকচালক, হেলপার, ইজিবাইকচালক ও সাইকেল আরোহীসহ আহত হন অন্তত চারজন। তাদের উদ্ধার করে প্রাথমিক চিকিৎসার ব্যবস্থা করেন স্থানীয়রা।
এ বিষয়ে গোপালগঞ্জ সড়ক ও জনপথ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী জাহাঙ্গীর আলম বললেন, ‘ঘটনার খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই কাজ শুরু করেছি আমরা। ভেঙে পড়া বেইলি ব্রিজটি আবার স্থাপন করা হবে। আশা করছি দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে স্বাভাবিক করা সম্ভব হবে যান চলাচল।’ ‘নির্মাণস্থলে পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় প্রকল্পের টেন্ডারে ডাইভারশন সড়কের ব্যবস্থা রাখা হয়নি’— যোগ করলেন প্রকৌশলী।




