হাঁড়িভাঙার হাঁড়ির খবর

ছবি: আগামীর সময়
‘হাঁড়িভাঙা আম খোয়ামো যদি খাবার চান, সাগাই (মেহমান) ভালোবাসি হামরা-হামার বাড়ি যান’—রংপুরের মাটি, মানুষ আর সংস্কৃতির সঙ্গে মিশে থাকা এমন অসংখ্য ভাওয়াইয়া গানে জায়গা করে নিয়েছে হাঁড়িভাঙা আম। এক সময় তামাকের জন্য পরিচিত রংপুর এখন দেশজুড়ে পরিচিতি পাচ্ছে এই বিশেষ আমের সুবাদে। স্বাদ, গন্ধ আর রসালতায় আলাদা পরিচয় গড়ে তোলা জিআই স্বীকৃত হাঁড়িভাঙা আমকে ঘিরে প্রতিবছরই জমে ওঠে কোটি টাকার বাণিজ্য।
তবে এবার হাঁড়িভাঙার মিষ্টি স্বাদের পাশাপাশি আলোচনায় এসেছে এর ‘হাঁড়ির খবরও’। যে আম সাধারণত জুনের তৃতীয় সপ্তাহে, অর্থাৎ ২০ জুনের পর বাজারে আসে, সেই আম এবার উঠতে শুরু করেছে অন্তত ১৫ দিন আগেই। ঈদ উপলক্ষে বাড়ি ফেরা মানুষদের লক্ষ্য করে আগাম আম বাজারজাত করছেন চাষি ও ব্যবসায়ীরা। এতে একদিকে যেমন জমে উঠেছে বেচাকেনা, অন্যদিকে উঠেছে প্রশ্ন—বাজারে আসা সব হাঁড়িভাঙা কি সত্যিই পরিপক্ব?
ক্রেতাদের অভিযোগ, বাজারে থাকা অনেক হাঁড়িভাঙা আম এখনো পুরোপুরি পরিপক্ব হয়নি। বাণিজ্যিকভাবে উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে কীটনাশক, ছত্রাকনাশকসহ বিভিন্ন রাসায়নিকের ব্যবহারও বেড়েছে। নির্ধারিত সময়ের আগেই আম পাড়া এবং কৃত্রিমভাবে পাকিয়ে বাজারজাত করার কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকির আশঙ্কা করছেন তারা।
তবে আমচাষিদের দাবি, এ বছরের তীব্র তাপপ্রবাহের কারণে স্বাভাবিক সময়ের আগেই আম পাকতে শুরু করেছে। পাশাপাশি ঈদের ছুটিতে বাড়ি ফেরা মানুষের চাহিদাও আগাম আম সংগ্রহে উৎসাহ জুগিয়েছে। যদিও চাষিরা বলছেন, হাঁড়িভাঙা আমের প্রকৃত ভরা মৌসুম শুরু হবে ২০ জুনের পর
সংরক্ষণের সংকটে সম্ভাবনার অপচয়
হাঁড়িভাঙা আমের সবচেয়ে বড় সমস্যাগুলোর একটি হলো সংরক্ষণ। চাষিদের ভাষ্য, পাকার পর এই আম তিন থেকে চার দিনের বেশি ভালো রাখা যায় না। কার্যকর কোনো সংরক্ষণ প্রযুক্তিও তাদের হাতে নেই। ফলে স্থানীয় বাজারের চাহিদা মেটানোর পর বড় পরিসরে রপ্তানির সুযোগ তৈরি হলেও তা পুরোপুরি কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে না।
তাদের দাবি, রংপুর অঞ্চলে হাঁড়িভাঙা আমের জন্য একটি বিশেষায়িত হিমাগার গড়ে তোলা গেলে দেশের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারেও এ আমের বড় সম্ভাবনা তৈরি হবে।
জমে উঠেছে পদাগঞ্জের আমের হাট
রংপুরের বদরগঞ্জ ও মিঠাপুকুর উপজেলার সীমান্তবর্তী পদাগঞ্জ এলাকায় বসে অঞ্চলের সবচেয়ে বড় হাঁড়িভাঙা আমের পাইকারি হাট। ইতোমধ্যে সেখানে ভিড় জমিয়েছেন দেশের বিভিন্ন প্রান্তের ব্যবসায়ীরা।
মিঠাপুকুর উপজেলার খোড়াগাছ ও ময়েনপুর ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, আমবাগানের মালিক, ফড়িয়া, বাগান পরিচর্যাকারী, মৌসুমি বিক্রেতা, অনলাইন উদ্যোক্তা, পরিবহন ব্যবসায়ী, কুরিয়ার সেবাদাতা এবং বিভিন্ন জেলা থেকে আসা পাইকাররা ব্যস্ত সময় পার করছেন আম কেনাবেচা নিয়ে।
স্থানীয় বাজার থেকে আম সংগ্রহ করে প্লাস্টিকের ক্যারেটে ভরে ট্রাকযোগে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পাঠানো হচ্ছে। স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, এখনো অনেক আম পরিপক্ব হয়নি। তারপরও বাড়তি লাভের আশায় কিছু ব্যবসায়ী আগেভাগেই বাগান থেকে আম সংগ্রহ করে বাজারে পাঠাচ্ছেন।
দাম এখন কত?
আমচাষি আব্দুল লতিফ বলেছেন, ‘২০ জুনের পর হাঁড়িভাঙার মূল মৌসুম শুরু হবে। তবে অতিরিক্ত গরমের কারণে এ বছর আম কিছুটা আগেই পাকতে শুরু করেছে।’
বর্তমানে আকারভেদে প্রতি মণ হাঁড়িভাঙা আম বিক্রি হচ্ছে ১ হাজার ৬০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকায়। খুচরা বাজারে প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৫০ থেকে ৭০ টাকা দরে।
আম ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, গত বছর মৌসুমের শেষদিকে হাঁড়িভাঙা আমের দাম মণপ্রতি ৮ হাজার টাকা পর্যন্ত উঠেছিল। চাহিদা বাড়তে থাকায় চলতি বছরও মৌসুম শেষে দাম আরও বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
শহরজুড়ে হাঁড়িভাঙার বাজার
বিভাগীয় শহর রংপুরের সিটি বাজার, নবাবগঞ্জ বাজার, জাহাজ কোম্পানি মোড়, লালবাগ, সিও বাজার, রেলওয়ে স্টেশন ও কেন্দ্রীয় বাস টার্মিনালসহ বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠেছে হাঁড়িভাঙা আমের অস্থায়ী বাজার।
পাইকারি ব্যবসায়ীরা বাগান থেকে আম সংগ্রহ করে দেশের বিভিন্ন জেলায় পাঠানোর পাশাপাশি এসব বাজারেও বিক্রি করছেন। অন্যদিকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা এসব হাট থেকে আম কিনে মাথায়, সাইকেলে কিংবা রিকশাভ্যানে করে পাড়া-মহল্লায় ফেরি করছেন।
ভাঙা হাঁড়ি থেকে ‘হাঁড়িভাঙা’
লোকমুখে প্রচলিত একটি কাহিনি অনুযায়ী, মিঠাপুকুর উপজেলার উঁচাবালুয়া গ্রামের সোহরাব কাসাড়ী নামে এক ব্যক্তি কুমারের কাজ করতেন। একদিন তিনি মাটির তৈরি হাঁড়িপাতিল বিক্রি করতে গিয়ে একটি আম সংগ্রহ করেন। বাড়িতে এনে আম খাওয়ার পর আঁটিটি বাড়ির পেছনের ঝোপে ফেলে দেন।
আঁটিটি গিয়ে পড়ে ভাঙা হাঁড়িপাতিলের স্তুপের ওপর। সেখানেই জন্ম নেয় একটি আমগাছ। সময়ের সঙ্গে গাছটি বড় হয় এবং তাতে ধরে সুস্বাদু ও সুগন্ধি আম। অন্যান্য আমের তুলনায় স্বাদে ভিন্ন হওয়ায় দ্রুত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে এটি। পরে গাছটির জন্মস্থানের স্মৃতি ধরে এর নাম দেওয়া হয় ‘হাঁড়িভাঙা’।
স্বাবলম্বিতার গল্প
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ১৯৮৮ সালের দিকে মিঠাপুকুরে প্রথম হাঁড়িভাঙা আমের কলম করে বাণিজ্যিক চাষ শুরু হয়। আখিরাহাট গ্রামের আব্দুস সালাম ও টেকানী গ্রামের লুৎফর রহমানের সাফল্যের পর পদাগঞ্জ, পাইকাড়েরহাট, খোড়াগাছ, ময়েনপুর, রাণীপুকুর, চেংমারী, বালুয়া মাসিমপুর, মিলনপুর, বড়বালা, গোপালপুর ও দুর্গাপুরসহ বিস্তীর্ণ অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে এই আমের চাষ।
আজ হাজারো কৃষকের জীবিকা ও স্বপ্নের সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাঁড়িভাঙা আম।
অর্থনীতিতে নতুন শক্তি
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে রংপুর জেলায় প্রায় সাড়ে ৩ হাজার হেক্টর জমিতে আমের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে ২ হাজার হেক্টরেরও বেশি জমিতে রয়েছে হাঁড়িভাঙা আমের চাষ। জেলায় আমচাষির সংখ্যা ১৫ হাজার ছাড়িয়েছে।
প্রতি হেক্টরে গড়ে ১০ থেকে ১২ মেট্রিক টন ফলন পাওয়া যায়, যার বাজারমূল্য ২০০ কোটিরও বেশি টাকা।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর রংপুরের উপপরিচালক সিরাজুল ইসলাম বলেছেন, ‘হাঁড়িভাঙা আম রংপুরের কৃষি অর্থনীতিকে নতুন গতি দিয়েছে। এ বছর আমের আকার ভালো হয়েছে। তবে অতিরিক্ত গরমের কারণে নির্ধারিত সময়ের আগেই বাজারে আম এসেছে। রপ্তানিযোগ্য মানের আম সংগ্রহ করতে হলে ২০ জুন পর্যন্ত অপেক্ষা করাই ভালো।’
রংপুরের কৃষি অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে ওঠা হাঁড়িভাঙা আম এখন শুধু একটি ফল নয়, একটি ব্র্যান্ড। তবে আগাম বাজারজাতকরণ, অপরিপক্ব আম বিক্রি এবং সংরক্ষণ সংকটের মতো চ্যালেঞ্জও সামনে এসেছে। এসব সমস্যা সমাধান করা গেলে রংপুরের এই ঐতিহ্যবাহী আম দেশের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক বাজারেও আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে।




