রংপুর কারমাইকেল কলেজ
এক সংঘর্ষে দুই হল বন্ধ ১৫ বছর
- মেস ভাড়া নিয়ে থাকতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদের
- কলেজের শিক্ষার্থী প্রায় ২৫ হাজার
- সাতটি হলে থাকছেন ৯৫০ শিক্ষার্থী

রংপুর কারমাইকেল কলেজ। ছবি: সংগৃহীত
রংপুর কারমাইকেল কলেজের কেবি ছাত্রাবাসে সম্প্রতি ঘুমন্ত দুই শিক্ষার্থীর ওপর ছাদের পলেস্তারা খসে পড়ে। এতে আহত হন আপন ও সৌরভ নামে দুই শিক্ষার্থী। ভুক্তভোগীদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে কলেজ কর্তৃপক্ষকে ছাত্রাবাসগুলোর বেহাল অবস্থার কথা জানানো হলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। ঐতিহ্যবাহী রংপুর কারমাইকেল কলেজে প্রকট আবাসন সংকটের মধ্যেও প্রায় ১৫ বছর ধরে দুটি হল সংস্কার করে খুলে দেওয়ার কোনো উদ্যোগ নেই কর্তৃপক্ষের। ফলে কলেজপাড়ায় মেস ভাড়া করে থাকতে হচ্ছে দরিদ্র শিক্ষার্থীদের। বর্তমানে কলেজের সাতটি হলে সাড়ে ৯০০ শিক্ষার্থী থাকছেন।
কলেজ কর্তৃপক্ষ জানায়, ২০১১ সালের ১৫ মার্চ ছাত্রশিবির ও ছাত্রলীগের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। আধিপত্য বিস্তারের জেরে ওইদিন ছাত্রলীগ ও ছাত্রশিবিরের সহিংসতার কারণে এক মাসের জন্য কলেজের চারটি ছাত্রাবাস বন্ধ ঘোষণা করে কলেজ প্রশাসন। ওই সময় কলেজের অধ্যক্ষ ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীদের নামে একটি মামলা করেন। এ নিয়ে কলেজের পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। ফলে ওই বছরের ১৩ জুন কলেজ অ্যাকাডেমিক কাউন্সিলের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী জিএল ছাত্রাবাস, কেবি ছাত্রাবাস, সিএম ছাত্রাবাস ও এমএজি ওসমানী ছাত্রাবাস নামের চারটি ছাত্রাবাসে বসবাসকারী ৪০০ শিক্ষার্থীর আসন বাতিল করা হয়। ২০ জুন এই চারটি ছাত্রাবাস খালি করে প্রতিটি কক্ষে কলেজের পক্ষ থেকে তালা মেরে দেওয়া হয়।
অভিযোগ রয়েছে, ছাত্রশিবিরের আধিপত্য ঠেকাতে এসব ছাত্রাবাস বন্ধ রেখেছিল কলেজ প্রশাসন।
এরপর থেকে বিভিন্ন সময় প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠনগুলোর দাবির মুখে কলেজ প্রশাসন বন্ধ ছাত্রাবাসের মধ্যে আট বছর পর জিএল ছাত্রাবাস ও কেবি ছাত্রাবাস খুলে দেয়। তবে প্রতিশ্রুতি দিলেও সিএম ছাত্রাবাস ও এমএজি ওসমানী ছাত্রাবাসের দরজা ১৫ বছরেও খোলা হয়নি।
এ অবস্থায় মেসে থাকতে সাধারণ শিক্ষার্থীরা চরম সমস্যার মুখে পড়লেও বন্ধ ছাত্রাবাসগুলো খুলে দিতে দীর্ঘদিনেও নেওয়া হয়নি কোনো পদক্ষেপ।
অন্যদিকে, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকায় ছাত্রাবাসগুলোর অবকাঠামোসহ আসবাব ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে।
কলেজ প্রশাসনের দাবি, শিবির ঠোকাতে নয়, বরং অর্থাভাবে সংস্কার না করার কারণে এতদিন ছাত্রাবাসগুলো খুলে দেওয়া যায়নি। তবে বর্তমানে ছাত্রদের জন্য জিএল ছাত্রাবাস, কেবি ছাত্রাবাস ও আবু সাঈদ নামে (নতুন) তিনটি এবং ছাত্রীদের জন্য বেগম রোকেয়া, শহীদ জননী জাহানারা ইমাম, তাপসী রাবেয়া ও তারামন বিবি নামে চারটি ছাত্রীনিবাস চালু থাকলেও, সেগুলোয় আসনের চেয়ে দ্বিগুণ শিক্ষার্থী থাকছেন। ১৯১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত কলেজটিতে বর্তমানে এইচএসসি, ২১টি বিষয়ে স্নাতক (সম্মান) ও মাস্টার্সে নিয়মিত-অনিয়মিত মিলে প্রায় ২৫ হাজার শিক্ষার্থী রয়েছেন।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, বন্ধ ছাত্রাবাসের ভবন জুড়ে আগাছা, খসে পড়ছে ভবনের পলেস্তারা। স্যাঁতসেঁতে ও ভুতুড়ে পরিবেশ। চারদিকে ঝোপঝাড়, ভেতর-বাইরে আবর্জনার স্তূপ। দেখে বুঝে ওঠার উপায় নেই যে, ১৫ বছর আগে এই ভবনগুলো ছাত্রদের পদচারণায় মুখর ছিল।
অর্থনীতি বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী নাঈম হাসান বললেন, ‘হলে জায়গা না পাওয়ায় কলেজপাড়ায় মেসভাড়া করে থাকছি। এজন্য প্রতি মাসে অন্তত তিন হাজার টাকা বাড়তি গুনতে হচ্ছে।’
আরবি বিভাগের নাজনীন আক্তারের ভাষ্য, ‘আমাদের যে হল আছে, সেখানে সিট নেই। আমরা বাইরে থাকছি, অনেক বেশি খরচ হচ্ছে।’ তার অভিযোগ, আবাসন সংকট ছাড়াও পর্যাপ্ত শিক্ষক ও শ্রেণিকক্ষ না থাকায় স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
আবাসিক হলের শিক্ষার্থীরা জানিয়েছেন, কলেজের ৯টি ছাত্রাবাসের মধ্যে দুটি বন্ধ রয়েছে। চালু ছাত্রাবাসগুলোর মধ্যে একটি ছাড়া বাকি ছয়টির অবস্থা জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ, যা বহু বছর আগে নির্মাণ করা। দীর্ঘদিন সংস্কারহীন থাকায় এসব ছাত্রাবাসে যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটার আশঙ্কা রয়েছে।
কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর আবুল হোসেন মণ্ডল বললেন, হলগুলো সংস্কারের জন্য শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরে প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে। এ ছাড়া ছাত্র ও ছাত্রীদের জন্য আরেকটি করে নতুন হল নির্মাণের প্রস্তাব ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হয়েছে। আশা করছি, দ্রুত সমস্যার সমাধান হবে।



