নারী চিকিৎসককে হেনস্তার অভিযোগ, ৫ দিনেও থানায় অভিযোগ দেয়নি কেউ

সংগৃহীত ছবি
বাগেরহাট ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতালের জরুরি বিভাগে ক্যানুলা পরানোকে কেন্দ্র করে দায়িত্বরত এক নারী চিকিৎসককে গালাগাল ও মারতে তেড়ে আসার অভিযোগের পাঁচ দিন পেরিয়ে গেলেও থানায় লিখিত অভিযোগ করেননি ভুক্তভোগী চিকিৎসক বা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
গেল রবিবার (১১ অক্টোবর) দিনগত রাত ১২টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। এদিকে, ঘটনাটি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনা ও চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হলেও এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক অভিযোগ না পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
ভুক্তভোগী চিকিৎসক ডা. সাকিয়া হক বাগেরহাট জেলা হাসপাতালের সহকারী রেজিস্ট্রার ও ডায়ানা অ্যাওয়ার্ডপ্রাপ্ত। ঘটনার পর নিরাপত্তাহীনতার কথা জানিয়ে তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে পোস্ট দেন। পরে একটি ভিডিও পোস্ট করে নিজের অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরেন।
ফেসবুক পোস্টে ডা. সাকিয়া হক লেখেন, বাগেরহাটে শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক শানু (নাকি হারুন জানি না) এসে শুধু গায়ে হাত দেওয়া বাকি রেখেছে নাইট ডিউটিতে। তিনি আরও লেখেন, তিনি একা কক্ষে ছিলেন। এ সময় ৮ থেকে ১০ জন এসে মারমুখী আচরণ করেন। কারণ ওয়ার্ডবয় ক্যানুলা পরাতে পারেননি।
হাসপাতালের রেজিস্টার অনুযায়ী, ওই রোগীর নাম শানু। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, অসুস্থতা নিয়ে হাসপাতালে আসা ব্যক্তি বাগেরহাট জেলা শ্রমিকদলের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক আবু হানিফ হানু।
ডা. সাকিয়া হক বলেন, গত রবিবার দুপুর আড়াইটা থেকে সোমবার সকাল সাড়ে ৮টা পর্যন্ত হাসপাতালের জরুরি বিভাগে তার দায়িত্ব ছিল। ওই সময়ে হাসপাতালটিতে তিনিই একমাত্র চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন।
তিনি জানান, রাত ১২টার দিকে বুকে ও পেটে ব্যথা নিয়ে এক রোগী জরুরি বিভাগে আসেন। প্রথমে তার ইলেকট্রোকার্ডিওগ্রাম (ইসিজি) করা হয়। পরীক্ষা, রক্তচাপ ও অন্যান্য শারীরিক লক্ষণ পর্যবেক্ষণে তাৎক্ষণিকভাবে হৃদযন্ত্রের কোনো সমস্যা পাওয়া যায়নি। পরে গ্যাসের সমস্যার জন্য ইনজেকশন দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়।
ইনজেকশন দেওয়ার জন্য রোগীর শরীরে ক্যানুলা পরাতে গিয়ে প্রথমবার ব্যর্থ হন সংশ্লিষ্ট ইন্টার্ন চিকিৎসক। পরে একজন ওয়ার্ডবয়ও চেষ্টা করেন। এতে রোগীর সঙ্গে আসা লোকজন ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন। এরপর অভিজ্ঞতার কারণে শিশু বিভাগের নার্সদের ডাকার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
চিকিৎসক সাকিয়া হকের অভিযোগ, রোগীর সঙ্গে আসা লোকজন তার কক্ষে ঢুকে গালাগাল করেন এবং বারবার মারতে তেড়ে আসেন। চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে হাসপাতালের কর্মী ও অন্য রোগীদের স্বজনেরা এগিয়ে এলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। পরে হাসপাতালের কর্মীরা তাদের কক্ষ থেকে সরিয়ে দেন।
তিনি বলেন, তারা গায়ে হাত দেননি, দিতে পারেননি। তবে পরিস্থিতি এমন ছিল যে, তারা গায়ে হাত দিতেন কি না, তা বলা কঠিন।
ডা. সাকিয়া হক আরও বলেন, ক্যানুলা পরানোর সময় কখনো কখনো একাধিকবার চেষ্টা করতে হতে পারে। রোগীর চাপ ও জরুরি বিভাগে মানুষের ভিড়ের কারণে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে। হাসপাতালে দায়িত্বে থাকা নার্স ও ওয়ার্ডবয়রাও এ কাজে অভিজ্ঞ। কিন্তু কোনো কারণে ক্যানুলা পরাতে ব্যর্থ হলেই চিকিৎসকের কক্ষে ঢুকে গালাগাল করা বা মারতে তেড়ে আসার অধিকার কারও নেই।
তিনি জানান, বিষয়টি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছেন। তার ভাষ্য, চিকিৎসকদের সঙ্গে এ ধরনের ঘটনা মাঝেমধ্যেই ঘটে। রাতে নিরাপত্তার অভাবে দায়িত্ব পালন করতে ভয় লাগে। হাসপাতালের বাইরে চলাচল নিয়েও নিরাপত্তাহীনতা কাজ করে।
ঘটনার পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে দেখা করে চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বিষয়ে কথা বলেছেন বাগেরহাট-২ আসনের সংসদ সদস্য শেখ মনজুরুল হক রাহাদ ও জামায়াতে ইসলামীর বাগেরহাট জেলা শাখার নেতারা।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত আবু হানিফ হানু বলেন, আমার হাতে বারবার ক্যানুলা পরানোর জন্য ফুটানো হয়েছে। প্রথমে ছয়বার, পরে আরও তিনবার—মোট নয়বার চেষ্টা করা হয়। আমি তাকে বারবার অনুরোধ করেছি, আর হাতে ফুটো না করতে এবং অন্তত একটি ইনজেকশন দিতে। কিন্তু তিনি আমাকে জানান, তিনি ক্যানুলা পরানোর চিকিৎসক নন। এ সময় তিনি এসি রুমের বাইরে যেতে পারবেন না বলেও জানান। আমার সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করা হয়েছে। আমি সাংবাদিকদের কাছে অনুরোধ করছি, প্রকৃত ঘটনা যাচাই-বাছাই করে সত্যটা তুলে ধরুন।
বাগেরহাট ২ আসনের সংসদ সদস্য শেখ মনজুরুল হক রাহাদ বলেন, ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকসহ অন্য চিকিৎসকদের মধ্যেও নিরাপত্তাহীনতা তৈরি হয়েছে। বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে তারা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলেছেন।
তিনি আরও বলেন, ভবিষ্যতে যাতে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা না ঘটে এবং চিকিৎসকেরা নিরাপদ পরিবেশে রোগীদের সেবা দিতে পারেন, সে বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। বিষয়টি জেলা প্রশাসক, সিভিল সার্জন, পুলিশ সুপারসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। পরবর্তী করণীয় নিয়েও আলোচনা চলছে।
বাগেরহাট ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. অসীম কুমার সমাদ্দার বলেন, চিকিৎসক ও রোগী—উভয় পক্ষেরই আন্তরিকতা ও দায়িত্বশীল আচরণ প্রয়োজন। চিকিৎসকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি রোগীদের যথাযথ সেবা দেওয়ার পরিবেশ বজায় রাখতে হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, ভবিষ্যতে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি হবে না।
এদিকে, বাগেরহাট জেলা হাসপাতালে নারী চিকিৎসককে হেনস্তা ও গালাগালির অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে পুলিশ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দিয়েছেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন বিষয়ক প্রতিমন্ত্রী ড. ফরিদুল ইসলাম। তিনি চিকিৎসকদের নিরাপত্তা, রোগীদের অধিকার এবং হাসপাতালের সেবার পরিবেশ রক্ষায় সবাইকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।
বাগেরহাট সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সামসুল আরেফিন বলেন, এখনো কোনো অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।



