ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল
বিচারহীনতায় বেপরোয়া ইন্টার্ন চিকিৎসকরা!

ছবি: আগামীর সময়
চিকিৎসা নিতে এসে হামলার শিকার হচ্ছেন রোগীর স্বজনরা। সংবাদ সংগ্রহ করতে গিয়ে আক্রান্ত হচ্ছেন সাংবাদিকরা। কখনো লাঞ্ছিত, কখনো মারধরের শিকার, আবার কখনো জিম্মি করে রাখা হচ্ছে তাদের। এসব সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের পরও দৃষ্টান্তমূলক কোনো পদক্ষেপ নেওয়ার দৃশ্যমান নজির নেই। উপরন্তু জিম্মি হতে হয়েছে হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তাদেরও। ফলে সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বারবার ফিরে আসছে একই পরিস্থিতি।
গত ১০ বছরে বহু ঘটনার সাক্ষী হয়েছে ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। এ অঞ্চলের চিকিৎসার আঁতুড়ঘরখ্যাত হাসপাতালটিতে বিভিন্ন সময় চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর স্বজনরা হামলার শিকার হয়েছেন। কতিপয় ইন্টার্ন চিকিৎসকের ন্যক্কারজনক হামলা থেকে বাদ যাননি সাংবাদিকরাও। বিভিন্ন সময় সংঘটিত ঘটনার তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে সাংবাদিকরা আক্রান্ত হয়েছেন। এর পুনরাবৃত্তি ঘটেছে গত ২৮ অক্টোবর।
হাসপাতালে রোগীর স্বজনদের ইন্টার্ন চিকিৎসকদের মারধরের ছবি ও ভিডিও ধারণ করতে গিয়ে সাংবাদিকদের ওপর এমন নৃশংস হামলার ঘটনা ঘটে।
গত ১০ বছরে হাসপাতালে এমন অসংখ্য ঘটনা ঘটলেও কোনো বিচার বা শাস্তির নজির নেই। বিচারহীনতার সংস্কৃতিতে বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন ইন্টার্ন চিকিৎসকদের একটি অংশ। অভিভাবকহীন সেবামূলক প্রতিষ্ঠানটিতে এ ধরনের কর্মকাণ্ডে এখন ভীতসন্ত্রস্ত সিলেটবাসী। হাসপাতালটিতে প্রায়ই রোগীর স্বজনদের মারধরের ঘটনা ঘটছে। এসব ঘটনার প্রতিবাদ করা হলে পাল্টা প্রতিক্রিয়া হিসেবে কর্মবিরতির নামে রোগীদের চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত রেখে দাবি আদায়ের কর্মসূচি পালন করা হয়।
সর্বশেষ ২৮ অক্টোবর রোগীর স্বজনদের ওপর হামলার ঘটনা ধারণ করতে গিয়ে দুই সাংবাদিক আক্রান্ত হন। দৈনিক শ্যামল সিলেটের ফটোসাংবাদিক রেজা রুবেল ও সিলেটভিউ২৪ডটকমের স্টাফ রিপোর্টার নিবেন্দু তালুকদার আহত হন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে চিকিৎসাসেবা বন্ধ রেখে শাটডাউন কর্মসূচি পালন করেন ইন্টার্ন চিকিৎসকরা।
ঘটনাটি নিয়ে সাংবাদিকদের মধ্যে প্রতিবাদের সৃষ্টি হয়। ৩১ অক্টোবর সিলেট কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের সামনে বিভিন্ন সাংবাদিক সংগঠনের উদ্যোগে মানববন্ধন করা হয়। এতে হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়।
একই বছরের ১৬ জানুয়ারি হাসপাতালের চতুর্থ তলার সার্জারি ওয়ার্ডে চিকিৎসক, নার্স ও রোগীর স্বজনদের মধ্যে কথা-কাটাকাটি থেকে সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এতে অন্তত পাঁচজন আহত হন। এক নারী ইন্টার্ন চিকিৎসককে হেনস্তার অভিযোগও ওঠে। পরে রোগীর তিন স্বজনকে আটক করে আদালতে পাঠায় পুলিশ। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে। এ ঘটনার পর নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করার দাবিতে কর্মবিরতি শুরু করেন ইন্টার্ন চিকিৎসকরা।
এ বছরের ১৭ জানুয়ারি চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ তুলে ইন্টার্ন চিকিৎসক ও স্টাফদের সঙ্গে তর্কে জড়ান রোগীর স্বজনরা। এর পরিপ্রেক্ষিতে দায়িত্বরত ইন্টার্ন চিকিৎসকরা কর্মবিরতি পালন করেন। গত ১৬ জানুয়ারি (শুক্রবার) রাত ১২টার দিকে হাসপাতালের চতুর্থ তলার ৬ নম্বর ওয়ার্ডে এ ঘটনা ঘটে। পরে ওয়ার্ডের ভেতরে ভাঙচুরের অভিযোগও তোলেন চিকিৎসকরা। এক নারী শিক্ষানবিশ চিকিৎসককে হেনস্তার অভিযোগও করা হয়। চিকিৎসক ও স্টাফরা মিলে রোগীর তিন স্বজনকে মারধরের পর পুলিশের কাছে সোপর্দ করেন। পরে শিক্ষানবিশ চিকিৎসকরা কর্মবিরতি পালন করেন। আটক ব্যক্তিরা হলেন সুনামগঞ্জের ছাতক থানার খৈতর গ্রামের শিমুল আহমদ (৩৫), একই গ্রামের নাজিরা সিদ্দিকা (২২) ও জাবেদ মিয়া (২৬)।
মফস্বল থেকে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর স্বজনরা সুচিকিৎসার পরিবর্তে তিক্ত অভিজ্ঞতা নিয়ে ফিরে যান। এ ঘটনার পরদিন শনিবারও কর্মবিরতি পালন করেন ইন্টার্ন চিকিৎসকরা।
গত ৮ জুলাই হাসপাতালে রোগীর স্বজনদের সঙ্গে মারামারিতে জড়ান ইন্টার্ন চিকিৎসকরা। হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে কয়েক দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে অনির্দিষ্টকালের কর্মবিরতি ঘোষণা করা হয়। পরে ইন্টার্ন ডক্টরস ফোরাম রোগীর স্বজনদের হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানায়।
এদিকে গত বছরের ২৭ এপ্রিল সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৩১ নম্বর ওয়ার্ডে এক রোগীর স্বজনকে লাথি মারেন এক চিকিৎসক। লাথি মারার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। এ ঘটনায় অভিযুক্ত চিকিৎসককে দায়িত্ব থেকে বিরত রেখে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। অভিযুক্ত চিকিৎসকের নাম তন্ময় দেবনাথ। তিনি হাসপাতালের সার্জারি বিভাগে কর্মরত ছিলেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া এক ভিডিওতে দেখা যায়, কর্তব্যরত চিকিৎসক এক রোগীর স্বজনকে কিছু একটা বলছেন। এ সময় ওই যুবককে লক্ষ্য করে তেড়ে যান চিকিৎসক। একপর্যায়ে তাকে লাথি মারতেও দেখা যায়।
জানা গেছে, সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সার্জারি ওয়ার্ডে চিকিৎসা নিতে আসেন জুবায়ের আহমদ নামে এক ব্যক্তি। ঘটনার সময় তার অ্যাপেন্ডিকসের ব্যথা হচ্ছিল। মারধরের শিকার যুবক ওই রোগীর বন্ধু।
২০২৪ সালের ২১ মার্চ এক প্রবীণ রোগীকে চিকিৎসকরা মারধর করেছেন বলে অভিযোগ ওঠে। এ ঘটনায় এক নারী চিকিৎসক হাসপাতালের পরিচালকের কাছে অভিযোগ করেন।
২০২৩ সালের ২১ আগস্ট হাসপাতালের ৩৫ নম্বর ওয়ার্ডে এক রোগীর মৃত্যু হয়। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ হন রোগীর স্বজনরা। সেসময় রোগীর স্বজনদের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের বিরুদ্ধে। ক্ষুব্ধ স্বজনরাও ভাঙচুর করেন। পরে রোগীর চার স্বজনকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে তুলে দেওয়া হয়। রোগীর স্বজনদের অভিযোগ ছিল, চিকিৎসা না পেয়ে তাদের রোগীর মৃত্যু হয়েছে। ওই দিন আটক হন আবদুল মালিক (৫৪), সাবেল আহমদ, জুবেল আহমদ ও জুয়েল আহমদ।
অন্যদিকে, ২০২২ সালের ৩ আগস্ট শিক্ষানবিশ চিকিৎসকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের অভিযোগ তুলে কর্মবিরতি শুরু করেন ইন্টার্ন চিকিৎসকরা। এতে ভোগান্তিতে পড়েন রোগী ও তাদের স্বজনরা। হাসপাতালের শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা এবং এক নারী শিক্ষানবিশ চিকিৎসককে হয়রানির অভিযোগ তোলেন তারা। এ ঘটনায় প্রশাসনিক ভবনে তালা দেন। অনির্দিষ্টকালের জন্য ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জন করেন। তাদের দাবি ছিল, কয়েকজন দুর্বৃত্ত কলেজ ক্যাম্পাসে ঢুকে শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা চালায়। এ ঘটনার পর প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করতে রোগীদের চিকিৎসাসেবা বন্ধ করে দেন তারা। সেদিন হাসপাতালের তৎকালীন পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মাহবুবুর রহমান ভূঁইয়াকে তার কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। এ ঘটনায় হাসপাতালের প্রশাসনিক কর্মকর্তা মোহাম্মদ হানিফের করা মামলায় আব্দুল্লাহ নামের এক যুবক ও অজ্ঞাতনামা আরও তিন-চারজনকে আসামি করা হয়।
এদিকে, ২০২২ সালের ১২ আগস্ট হাসপাতালে রোগীর এক স্বজনকে মারধরের অভিযোগ ওঠে। হাসপাতালের চতুর্থ তলার ১ নম্বর ওয়ার্ডে এ ঘটনা ঘটে। এতে রুবেনা বেগম (২৭) নামে এক নারী আহত হন।
২০২১ সালের নভেম্বরেও এমন ঘটনা ঘটে। সিলেটের এক জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক তার শ্বশুরকে গুরুতর অবস্থায় ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেদিন চিকিৎসা শুরুতে বিলম্ব হওয়ায় উপপরিচালকের কাছে ফোন করে অভিযোগ করেন ওই সাংবাদিক। ঘটনাটি জানতে পেরে ইন্টার্ন চিকিৎসকরা তার ওপর চড়াও হন। খবর পেয়ে অন্য সাংবাদিকরা ঘটনাস্থলে গিয়ে তাকে অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে উদ্ধার করে নিয়ে আসেন।
২০১৯ সালের ১২ মার্চ ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগে রোগীর দুই স্বজনকে মারধর করা হয়। ইন্টার্ন চিকিৎসকরা রোগীর স্বজনদের মারধর করতে কর্মরত আনসার সদস্যদের নির্দেশ দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। মারধর করেই ক্ষান্ত হননি তারা, জনসমক্ষে রোগীর স্বজনদের কান ধরে ওঠবস করান। আহত ব্যক্তিরা যাতে অভিযোগ না করেন, সে জন্য তাদের কাছ থেকে সাদা কাগজে সই নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। হাসপাতালের অভ্যর্থনাকক্ষে এ ঘটনা ঘটে। সেদিন মারধরে আহত হন সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার সওতরপাড়ার কালিপুরের ইসমাইল আলী (৩৫) ও একই এলাকার জ্যোতিন্দ্র বিশ্বাস (২৫)। ঘটনাটি দেখে হাসপাতালে আসা অন্য রোগীর স্বজনরাও ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
২০১৮ সালের ৪ সেপ্টেম্বর হাসপাতালে রোগী দেখতে প্রবেশের সময় নিরাপত্তাকর্মীদের টাকা চাওয়াকে কেন্দ্র করে বচসা ও হামলার অভিযোগ ওঠে। এতে রোগীর দুই স্বজন আহত হন।
এসব ঘটনার মধ্যে কয়েকটিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। কোথাও অভিযুক্ত ব্যক্তিকে দায়িত্ব থেকে সরানো হয়েছে, কোথাও মামলা হয়েছে, আবার কোনো ঘটনায় পুলিশ কয়েকজনকে আটক করে আদালতে পাঠিয়েছে। তবে তদন্ত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়ন কিংবা বিভাগীয় শাস্তির দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়েনি।
এ ছাড়া ১/১১-এর সময়ে, ২০০৮ সালেও কয়েকজন ফটোসাংবাদিক ওসমানী হাসপাতালে কতিপয় ইন্টার্ন চিকিৎসকের হামলার শিকার হয়েছিলেন। সেসময় সিলেটের সাংবাদিকরা ঐক্যবদ্ধ থাকায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও ইন্টার্ন চিকিৎসকরা ওই ঘটনার জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন এবং আপসের মাধ্যমে বিষয়টি নিষ্পত্তির প্রস্তাব দেন। ২০২৬ সালে সেই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটেছে।
ওসমানী হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগী ও তাদের স্বজনদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যেমন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব, তেমনি চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করাও জরুরি। কিন্তু একই হাসপাতালে রোগীর স্বজনদের ওপর বারবার হামলা, পাল্টাপাল্টি অভিযোগ, সংঘর্ষ এবং চিকিৎসাসেবা বন্ধের ঘটনা হাসপাতালটির চিকিৎসাসেবাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
এ বিষয়ে বক্তব্য নিতে হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ডা. আবু জাফর মো. খালেদ হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি।



