জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সেন্টমার্টিন ফিরলেন ১৪০ বাসিন্দা

ছবি: আগামীর সময়
বঙ্গোপসাগরে লঘুচাপের প্রভাবে সৃষ্ট বৈরী আবহাওয়া, টানা বর্ষণ আর উত্তাল সাগর। সবকিছু যেন একসঙ্গে চেপে বসেছে দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিনের মানুষের ওপর। উপকূলীয় এলাকায় এখনও ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত বহাল রয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই টেকনাফ থেকে তিনটি কাঠের সার্ভিস ট্রলারে করে প্রায় ১৪০ জন বাসিন্দা প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রীসহ সেন্টমার্টিনের উদ্দেশ্যে রওনা হন।
১০ দিন আটকে থাকার পর অবশেষে পরিবার-পরিজনের কাছে ফিরতে পেরে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছেন তারা।
আজ শনিবার দুপুর ১২টার দিকে টেকনাফ পৌরসভার কায়ুকখালী নৌঘাট থেকে ট্রলার তিনটি সেন্টমার্টিনের উদ্দেশ্যে যাত্রা করে।
উত্তাল ঢেউ আর টানা বৃষ্টির মধ্যে প্রায় ৩৬ কিলোমিটার নৌপথ পাড়ি দিয়ে দ্বীপে পৌঁছাতে হয় যাত্রীদের। বৈরী আবহাওয়ায় এমন যাত্রা ছিল অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। তবে পরিবারের কাছে ফেরার আকুতি আর দীর্ঘদিনের অনিশ্চয়তা তাদের সেই ঝুঁকি নিতে বাধ্য করেছে।
জানা গেছে, বঙ্গোপসাগরে বৈরী আবহাওয়া ও উত্তাল সমুদ্রের কারণে টেকনাফ-সেন্টমার্টিন নৌরুটে গত ১০ দিন ধরে যাত্রীবাহী ট্রলারসহ সাধারণ নৌযান চলাচল বন্ধ রয়েছে। এতে চিকিৎসা, জরুরি প্রয়োজন, বাজার-সদাই কিংবা ব্যক্তিগত বিভিন্ন কাজে টেকনাফে এসে আটকে পড়েন সেন্টমার্টিনের দেড় শতাধিক বাসিন্দা।
দিনের পর দিন হোটেল কিংবা স্বজনদের বাড়িতে অবস্থান করতে গিয়ে অনেকেই আর্থিক সংকটে পড়ে যান। কাজ বন্ধ থাকায় আয়-রোজগারের পথও বন্ধ হয়ে যায়। পরিবারের সদস্যদের কাছ থেকে দূরে থাকায় বাড়ছিল মানসিক চাপ। এমন বাস্তবতায় সব ধরনের ঝুঁকি জেনেও শেষ পর্যন্ত ট্রলারে চড়ে দ্বীপে ফেরার সিদ্ধান্ত নেন তারা।
শনিবার দুপুরে টানা বৃষ্টিপাত আর উত্তাল ঢেউয়ের মধ্যেই যখন ট্রলারগুলো ঘাট ছাড়ে। তখন কায়ুকখালী নৌঘাটজুড়ে তৈরি হয় উদ্বেগের পরিবেশ। যাত্রীদের স্বজনদের অনেকেই নিরাপদ যাত্রার জন্য দোয়া করতে দেখা যায়। সাগরের প্রতিকূল পরিস্থিতি সত্ত্বেও ট্রলারগুলো ধীরে ধীরে গভীর সাগরের দিকে এগিয়ে যায়।
টেকনাফ কায়ুকখালী নৌঘাটে সেন্টমার্টিন সার্ভিসের দায়িত্বে থাকা মো. জুবাইর বলেছেন, আটকে থাকা যাত্রীদের ট্রলারে তুলে দেওয়া হয়। তাদের সঙ্গে প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রীও পাঠানো হয়েছে। সবাই নিরাপদে গন্তব্যে পৌঁছেছেন।
সেন্টমার্টিন ইউনিয়ন পরিষদের ১, ২ ও ৩ নম্বর সংরক্ষিত ওয়ার্ডের সদস্য মাহফুজা আক্তার বললেন, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার অনুমতিক্রমে আটকে থাকা সেন্টমার্টিনের বাসিন্দাদের ট্রলারে পাঠানো হয়েছে। তাদের সঙ্গে প্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রীও দেওয়া হয়েছে।
তার ভাষ্য, আমাদের সেন্টমার্টিনের মানুষের কষ্ট কেউ বোঝে না। কাজ নেই, আয় নেই। অনেক পরিবার মানবেতর জীবনযাপন করছে।
স্থানীয় সূত্র বলছে, পর্যটন মৌসুম শেষ হওয়ার পর থেকেই সেন্টমার্টিনের অর্থনীতি অনেকটাই স্থবির হয়ে পড়েছে। দ্বীপের অধিকাংশ মানুষের জীবিকা পর্যটননির্ভর হওয়ায় পর্যটকশূন্য সময়ে এমনিতেই আয় কমে যায়। তার ওপর কয়েক দিন ধরে বৈরী আবহাওয়ার কারণে নৌযান চলাচল বন্ধ থাকায় পরিস্থিতি আরও সংকটাপন্ন হয়ে উঠেছে।
নৌপথ বন্ধ থাকায় খাদ্যপণ্য সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে। প্রয়োজনীয় নিত্যপণ্যের সংকট দেখা দেওয়ার আশঙ্কাও বাড়ছে। একই সঙ্গে জরুরি চিকিৎসাসেবা নিতে মূল ভূখণ্ডে যাতায়াত, শিক্ষার্থীদের চলাচল এবং কর্মসংস্থানের সুযোগও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে বিচ্ছিন্ন এই দ্বীপের হাজারো মানুষ চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
বাসিন্দা কেফায়েত উল্লাহ বলেছেন, প্রতিকূল আবহাওয়া কেটে স্বাভাবিক নৌযান চলাচল শুরু না হওয়া পর্যন্ত সেন্টমার্টিনের মানুষের দুর্ভোগ কাটার সম্ভাবনা নেই। তাই নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিয়মিত খাদ্যসহায়তা, চিকিৎসাসামগ্রী সরবরাহ এবং জরুরি প্রয়োজনে বিকল্প যোগাযোগব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের প্রতি দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম অনীক চৌধুরী জানালেন, সেন্টমার্টিনের প্রায় ৩০০ পরিবারের জন্য খাদ্যসহায়তা পাঠানো হয়েছে। পাশাপাশি দ্বীপবাসীর সার্বিক পরিস্থিতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়তা অব্যাহত থাকবে।




