খুলনায় কিশোরী নির্জনা হত্যা
বাবার আঘাতে মৃত্যু, আদালতে মায়ের স্বীকারোক্তি

ছবি: আগামীর সময়
খুলনা সরকারি ইকবালনগর মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী আরফানা হোসেন নির্জনা (১৬) নিজ বাবা-মায়ের হাতে হত্যার শিকার হয়েছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার হওয়া নির্জনার মা আরিফা ইয়াসমিন সিমা (৩৫) আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। জবানবন্দিতে তিনি দাবি করেছেন, পারিবারিক কলহের একপর্যায়ে বাবার আঘাতে নির্জনার মৃত্যু হয়। পরে মরদেহ বস্তাবন্দি করে ফেলে দেওয়া হয়।
শনিবার খুলনা মেট্রোপলিটন পুলিশের (কেএমপি) সদর দপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান এসব তথ্য জানান।
পুলিশ জানিয়েছে, গত বুধবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে নগরীর নিরালা প্রান্তিকা আবাসিক এলাকার ৩ নম্বর সড়কের একটি সাততলা ভবনের সামনে বস্তাবন্দি অবস্থায় এক কিশোরীর মরদেহ পড়ে থাকতে দেখে স্থানীয়রা পুলিশকে খবর দেন। পরে পুলিশ মরদেহ উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠায় এবং তদন্ত শুরু করে।
পুলিশ কমিশনার বলেছেন, তদন্তের শুরুতেই সিসিটিভি ফুটেজ, তথ্যপ্রযুক্তি ও বিভিন্ন গোয়েন্দা তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিহতের পরিচয় শনাক্ত করা হয়। তিনি নগরীর সোনাডাঙ্গা থানার বসুপাড়া এলাকার বাসিন্দা মো. আলিম হোসেন আকাশ ও আরিফা ইয়াসমিন সিমা দম্পতির মেয়ে এবং ইকবালনগর সরকারি মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী।
পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, নিহতের বাসায় গিয়ে তার মা আরিফা ইয়াসমিন সিমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তিনি প্রথমে বিভ্রান্তিকর তথ্য দেন। পরে নিবিড় জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডে নিজের সম্পৃক্ততার কথা স্বীকার করেন। শুক্রবার তাকে আদালতে হাজির করা হলে তিনি স্বেচ্ছায় ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। খুলনা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট ইব্রাহীম খলিল মুহিম জবানবন্দি রেকর্ড করার পর তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
পুলিশ জানিয়েছে, আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে আরিফা ইয়াসমিন সিমা বলেছেন, ঘটনার দিন বিকালে মেয়ের অবাধ্যতা নিয়ে মা-মেয়ের মধ্যে বাগবিতণ্ডা হয়। একপর্যায়ে তিনি মেয়েকে কয়েকটি চড়-থাপ্পড় মারেন। এ সময় ঘরের ভেতরের হৈচৈ শুনে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় বাবা আলিম হোসেন আকাশ সেখানে এসে দুজনকে চুপ থাকতে বলেন। কিন্তু নির্জনা চুপ না করলে তিনি একটি কাঠের টুকরা দিয়ে তার মাথায় আঘাত করেন। এতে নির্জনা রক্তাক্ত অবস্থায় মেঝেতে পড়ে চিৎকার শুরু করলে বাবা তার মুখ চেপে ধরেন। এতে ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয় বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
জবানবন্দিতে আরও বলা হয়েছে, ঘটনার পর আলিম হোসেন আকাশ ঘরে থাকা একটি ছেঁড়া লুঙ্গি ও প্লাস্টিকের বস্তায় মরদেহ পেঁচিয়ে মোটরসাইকেলে করে নিরালা প্রান্তিকা আবাসিক এলাকার ৩ নম্বর সড়কের একটি ভবনের সামনে ফেলে আসেন, যাতে ঘটনাটি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত হয়।
পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ জাহিদুল হাসান বলেছেন, তদন্তে প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, নির্জনার একাধিক ছেলের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক নিয়ে পরিবারে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলছিল। সেই পারিবারিক কলহের জেরেই এ হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে। তবে তদন্ত এখনও চলমান এবং প্রয়োজনীয় আলামত সংগ্রহ ও তথ্য যাচাই অব্যাহত রয়েছে।
তিনি আরও বলেছেন, ঘটনার মূল রহস্য উদঘাটনে খুলনা সদর থানার একটি বিশেষ দল মাত্র ৩৬ ঘণ্টার মধ্যে নির্জনার মা আরিফা ইয়াসমিন সিমাকে গ্রেপ্তার করে। অপর আসামি নির্জনার বাবা মো. আলিম হোসেন আকাশকে গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। কেএমপির উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) মো. রেজাউর রহমানের নেতৃত্বে একটি বিশেষ দল এ অভিযান পরিচালনা করছে।
পুলিশ কমিশনার আরও জানিয়েছেন, পুলিশের কাছে প্রাপ্ত তথ্যে নির্জনার বাবা-মা দুজনই মাদকাসক্ত বলে জানা গেছে। বিষয়টি তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
সংবাদ ব্রিফিংয়ে অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার মুহাম্মদ শাহনেওয়াজ খালেদ, উপ-পুলিশ কমিশনার এম এম শাকিলুজ্জামান, উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) মো. রেজাউর রহমান, অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) অমিত কুমার বর্মন, সহকারী পুলিশ কমিশনার (খুলনা জোন) মো. শফিকুল ইসলাম এবং খুলনা সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শফিকুল ইসলামসহ ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।




