‘বাড়িত যাইর, ভোট দি আইর’

ফাইল ছবি
সকাল সাড়ে ৯টা। চট্টগ্রাম শহরের মোমিন রোডে শতবর্ষী কদম মোবারক এতিমখানার সামনে রাস্তায় টেম্পুর অপেক্ষায় দাঁড়িয়েছিলেন মধ্যবয়সী মোহাম্মদ ফারুক। এলাকায় কমবেশি সকলের পরিচিত ফারুক এতিমখানার রন্ধনশালার সহকারী। বাড়ি বোয়ালখালী উপজেলার উত্তর কনজুরি গ্রামে। রাস্তার অপরপাশ থেকে তাকে দেখে হাঁক দিলেন পান-সিগারেট দোকানি বখতেয়ার। মুখভর্তি পান নিয়ে চট্টগ্রামের ভাষায় ফারুক জবাব দিলেন, ‘বাড়িত যাইর, ১৭ বছর ভোট দিত ন পারি, ভোট দি আইর’। (বাড়ি যাচ্ছি, ১৭ বছর ভোট দিতে পারিনি, ভোট দিয়ে আসি।)
রাত পেরোলেই ভোট। কাল (বৃহস্পতিবার) সকালের সূর্য যে বন্দরনগরীর মানুষের জন্য উৎসবের বার্তা নিয়ে আসবে, ফারুক যেন এক বাক্যে সেটা জানিয়ে দিলেন।
তবে ভোটকে ঘিরে যে একটা উৎসবের হালকা আমেজ, সেটা টের পাওয়া যাচ্ছিল গতকাল (মঙ্গলবার) থেকেই। সরকার ঘোষিত ছুটি সেই আমেজ আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। শিল্পাঞ্চলে ছুটি থাকায় গতকাল দুপুর থেকেই বিভিন্ন কলকারখানার শ্রমজীবী মানুষ নগরী ছাড়তে শুরু করেন। বাসে-ট্রেনে যে যেভাবে পেরেছেন, যাত্রা করেছেন গন্তব্যের উদ্দেশ্যে। অফিস-আদালতের সময় শেষ হওয়ার পর সন্ধ্যা থেকে নগরীর প্রবেশপথগুলোতে রীতিমতো মানুষের ঢল নামে। বিশেষ করে নগরীর শাহ আমানত সেতু এলাকায় দক্ষিণ চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবানমুখী মানুষের স্রোত ছিল সন্ধ্যা থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত। গণপরিবহন না পেয়ে অনেককে ট্রাক, পিকআপ ভ্যানে উঠেও নগরী ছাড়তে দেখা যায়।
দলে দলে লোকজন বাড়ির পথে ছুটে চলা নিয়ে বন্দরনগরীতে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়, যা দেখা যায় শুধু দুই ঈদের ছুটি শুরুর পর। চট্টগ্রাম নগরীতে বসবাসকারীদের উল্লেখযোগ্য অংশ বিভিন্ন জেলা-উপজেলার লোকজন, যারা চাকরি-ব্যবসা সূত্রে এখানে বসবাস করেন। এমন বিপুল লোকজন যারা লে গেছেন, সেটা বোঝা গেল আজ বুধবার সকাল থেকে নগরীর রাস্তাঘাট দেখে।
সকাল হতেই যে নগরীর নিউমার্কেট মোড়ে রীতিমতো যানবাহন আর মানুষের উপচেপড়া ভিড় থাকে, সেটা দেখা গেল অনেকটাই ফাঁকা। অবশ্য গত রাত থেকে মোটর সাইকেল চলাচলের ওপর নিষেধাজ্ঞার কারণে যানবাহনের চাপ কিছুটা কম বোঝা গেছে। কিন্তু বাস, মিনিবাস, হিউম্যান হলারসহ বিভিন্ন গণপরিবহনও কম দেখা গেছে।
নগরীর কাজির দেউড়ির মোড়, জিইসি মোড়, চকবাজার এলাকার মতো সবসময় লোক সমাগমে ভরপুর থাকা এলাকাগুলো আজ দুপুরে দেখা গেল একেবারে খালি, গাড়ি আর পথচারী যেন হাতে গোনা যাবে এমন অবস্থা! এ অবস্থায় নগরীর সড়কজুড়ে দেখা গেছে ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার অবাধ চলাচল। অবশ্য নিষিদ্ধ এসব যানের চলাচলে পুলিশ বাধা দিচ্ছে না।
সকালে কাপ্তাই রাস্তার মাথা এলাকায় অবশ্য মানুষের জটলা দেখা গেছে। ত্রিমুখী সেই পয়েন্ট থেকে উত্তরে রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, কাপ্তাই, রাঙামাটি আর দক্ষিণে বোয়ালখালী-পটিয়া। ঘরমুখো মানুষের ভিড় সামলাতে পারছে না বাস, টেম্পু, সিএনজি অটোরিকশাগুলো। সুযোগ বুঝে ভাড়া বাড়িয়ে দেওয়ায় অভ্যাস অবশ্য ছাড়তে পারলেন না চালকরা, দেখা গেল এমনটাই।
নগরীর কাপ্তাই রাস্তার মাথা থেকে রাঙ্গুনিয়ার লিচুবাগান পর্যন্ত লোকাল অটোরিকশায় একজনের ভাড়া নির্ধারিত আছে ৭০ টাকা। কিন্তু আজ সকালে দেখা গেল, অটোরিকশা চালক প্রতিজনের জন্য ১৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া দাবি করছেন।
চট্টগ্রাম নগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (মিডিয়া) আমিনুর রশীদ বলেন, নগরী অনেকটাই ফাঁকা হয়ে গেছে। তিন ভাগের এক ভাগের বেশি লোক গ্রামগঞ্জে চলে গেছেন। আমরা অবশ্য এটা নিয়ে আগেই প্ল্যান করেছিলাম। শহরের প্রধান সড়কে আমাদের মোবাইল, পেট্রোল ও স্ট্রাইকিং ফোর্সের টহল আছে। অলিগলিতেও মোবাইল টিম টহল দিচ্ছে। এর পাশাপাশি সেনাবাহিনীও আছে।
এদিকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট উপলক্ষে বুধবার সকাল ৮টা থেকে প্রায়ই বন্ধ হয়ে আছে চট্টগ্রাম বন্দরের সকল অপারেশনাল কার্যক্রম। এ কারণে নগরীতে পণ্যবোঝাই ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, লরিসহ ভারি যানবাহনও দেখা যাচ্ছে না। চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিচালক (ট্রাফিক) স্বাক্ষরিত এক আদেশে বলা হয়েছে, আগামী ৪৮ ঘণ্টা অপারেশনাল কার্যক্রম বন্ধ থাকবে।



