কক্সবাজার
মৃত্যুদণ্ড পাওয়া ‘ভুল আসামি’ সোনা মিয়ার মুক্তি

কারামুক্ত ‘ভুল আসামি’ সোনা মিয়া
এক লাখ ৯০ হাজার ইয়াবা উদ্ধারের মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে কারাগারে থাকা সোনা মিয়া মুক্তি পেয়েছেন। পরিচয় জালিয়াতির শিকার হয়ে দীর্ঘদিন কারাভোগ করা সোনা মিয়া আদালতের চার শর্তে জামিন পাওয়ার পর শুক্রবার (১৪ আগস্ট) বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কক্সবাজার জেলা কারাগার থেকে মুক্তি পান।
পুলিশের তদন্তে বেরিয়ে আসে, ২০২০ সালে ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি প্রকৃত সোনা মিয়া ছিলেন না। তিনি রোহিঙ্গা নাগরিক মোহাম্মদ রমজান। সোনা মিয়ার জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করে নিজের পরিচয় গোপন করে ইয়াবা মামলায় গ্রেপ্তার হন রমজান। সেই ভুল পরিচয়ের ওপর ভিত্তি করেই মামলা, অভিযোগপত্র ও পরবর্তী বিচারিক কার্যক্রম এগিয়ে যায়।
মামলা ও আদালত সূত্রে জানা গেছে, ২০২০ সালে এক লাখ ৯০ হাজার ইয়াবাসহ রমজান আলীসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। সে সময় রমজান নিজেকে ‘সোনা মিয়া’ পরিচয় দেন এবং সোনা মিয়ার জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করেন। পরবর্তী সময়ে দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে মামলার পাঁচ আসামিকেই মৃত্যুদণ্ড দেন আদালত। তাদের মধ্যে ছিলেন ‘সোনা মিয়া’ নামের একজন আসামিও।
কিন্তু চলতি বছর মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে প্রকৃত সোনা মিয়া গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যাওয়ার পরই পুরো ঘটনা নতুন মোড় নেয়। গত ২৪ জুন ওয়ারেন্টমূলে গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে যাওয়ার পর সোনা মিয়া দাবি করেন, তিনি ইয়াবা মামলার সঙ্গে কোনোভাবেই জড়িত নন।
কারাগার কর্তৃপক্ষও পুরোনো মামলার নথিতে থাকা ছবি, পরিচয়, মায়ের নামসহ বিভিন্ন তথ্যের সঙ্গে সোনা মিয়ার তথ্য মিলিয়ে অসংগতি দেখতে পায়। বিষয়টি আদালতের নজরে আনা হলে জেলা ও দায়রা জজ পুলিশকে তদন্তের নির্দেশ দেন।
আদালতের নির্দেশে কক্সবাজার সদর থানার ওসি শেখ মোহাম্মদ আলী তদন্ত করে গত ৫ জুলাই প্রতিবেদন জমা দেন। প্রতিবেদনে বলা হয়, কারাগারে থাকা সোনা মিয়া ২০২০ সালের ইয়াবা মামলার মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি নন। মামলায় সোনা মিয়ার পরিচয় ব্যবহার করে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষে রোহিঙ্গা নাগরিক মোহাম্মদ রমজান।
তদন্তে আরও জানা যায়, রমজানের সঙ্গে প্রকৃত সোনা মিয়ার পরিচয় ও বন্ধুত্ব ছিল। সেই সুযোগে সোনা মিয়ার জন্মনিবন্ধন তার কাছে থেকে যায়। পরে জন্মনিবন্ধন ব্যবহার করেই রমজান নিজেকে সোনা মিয়া পরিচয় দিয়ে ইয়াবা মামলায় গ্রেপ্তার হন।
পুলিশের তদন্তে পরিচয় জালিয়াতির বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয় সোনা মিয়ার আঙুলের ছাপ ও ছবির সঙ্গে মামলার নথিতে থাকা ছবি ও পরিচয়গত তথ্যের অমিল পাওয়ার পর। একই মামলায় সাজাপ্রাপ্ত অন্য এক আসামির জবানবন্দিতেও ২০২০ সালে গ্রেপ্তার হওয়া ‘সোনা মিয়া’ এবং কারাগারে থাকা সোনা মিয়া একই ব্যক্তি নন বলে তথ্য উঠে আসে।
পুলিশের প্রতিবেদন পাওয়ার পর আদালত মামলার তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা ডিবি পুলিশের পরিদর্শক মানস বড়ুয়াকেও তলব করেন। তিনি লিখিতভাবে জানান, ২০২০ সালে গ্রেপ্তার হওয়া সোনা মিয়া পরিচয়দানকারী ব্যক্তি এবং বর্তমানে কারাগারে থাকা প্রকৃত সোনা মিয়া দুইজন ভিন্ন ব্যক্তি।
এ ঘটনায় তদন্ত থেকে অভিযোগপত্র দাখিল পর্যন্ত বড় ধরনের গাফিলতির অভিযোগও উঠেছে। কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও সোনা মিয়ার আইনজীবী আবদুল মান্নান বলেন, মামলার তদন্ত পর্যায়েই আসামির প্রকৃত পরিচয় যাচাই করা হয়নি। এর ফলেই একজন নিরপরাধ মানুষকে মৃত্যুদণ্ডের আসামি হিসেবে কারাগারে যেতে হয়েছে।
তিনি বলেন, বিষয়টি আদালতের নজরে আনার পর জামিনের আবেদন করা হয়। নথি, তদন্ত প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট তথ্য পর্যালোচনা করে আদালত সোনা মিয়ার জামিন মঞ্জুর করেন।
কক্সবাজার জেলা কারাগারের জেলার মো. দেলোয়ার জাহান বলেন, আদালতের নির্দেশনা পাওয়ার পর শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে সব আইনি প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে সোনা মিয়াকে মুক্তি দেওয়া হয়েছে। কারাগারে আসার পরই সোনা মিয়া জানতে চান, কী অপরাধে তাকে আনা হয়েছে। মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে গ্রেপ্তারের কথা শুনে তিনি বিস্মিত হন।
আদালতের আদেশে সোনা মিয়ার মুক্তির সঙ্গে চারটি শর্ত দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—নিজের জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ও পাসপোর্ট আদালতে জমা রাখা, আদালতের অনুমতি ছাড়া ঠিকানা পরিবর্তন না করা, নির্ধারিত সময়ে আদালতে হাজিরা দেওয়া এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নিজের অবস্থান সম্পর্কে অবহিত রাখা। পাশাপাশি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তাঁর বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে এবং প্রতি মাসের প্রথম মঙ্গলবার কক্সবাজার সদর থানায় হাজির হয়ে অবস্থান নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। প্রতি তিন মাস পর তার উপস্থিতি ও অবস্থান সম্পর্কে প্রতিবেদন আদালতে জমা দিতে থানাকেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের নাজির মো. বেদারুল আলম আদালতের আদেশের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।
অন্যদিকে, কক্সবাজার সদর থানার ওসি শেখ মোহাম্মদ আলী জানান, ২০২২ সালের ১৩ জুন সোনা মিয়া পরিচয়ে রমজান ওই মামলায় জামিন নেন। এরপর থেকে তিনি আত্মগোপনে চলে যান এবং আদালতে আর হাজির হননি।







