বছরের পর বছর জোয়ারের সঙ্গে যুদ্ধ, বেড়িবাঁধের অপেক্ষায় ১৪০ পরিবার

ছবি: আগামীর সময়
জোয়ার এলেই হাঁটুপানিতে তলিয়ে যায় বসতঘর, রান্নাঘর, মসজিদ ও চলাচলের রাস্তা। ঘরে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়লে পরিবার নিয়ে অন্যত্র আশ্রয় নিতে হয়। পানি নেমে গেলে আবার কাদাপানি মাড়িয়ে ফিরতে হয় নিজ ঘরে। বছরের পর বছর এভাবেই চরম দুর্ভোগে দিন কাটছে বাগেরহাট সদর উপজেলার কাড়াপাড়া ইউনিয়নের মাজিডাঙ্গা আশ্রয়ণ প্রকল্পের ১৪০ পরিবারের।
শনিবার (১৫ আগস্ট) দুপুরে সরেজমিনে মাজিডাঙ্গা আশ্রয়ণ প্রকল্পে গিয়ে দেখা যায়, জোয়ারের পানিতে প্রকল্পের রাস্তা, বসতঘর, রান্নাঘর ও মসজিদ প্লাবিত হয়েছে। অনেক ঘরের মেঝেতে হাঁটুপানি জমে আছে। পানির কারণে বাসিন্দাদের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ব্যাহত হচ্ছে।
আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা রহিমা বেগম বলেন, জোয়ারের পানি উঠলে ঘরের মেঝে পর্যন্ত পানি চলে আসে। তখন চুলা জ্বালিয়ে রান্না করা যায় না, ঘরেও থাকা যায় না। বাধ্য হয়ে সন্তানদের নিয়ে অন্যের বাড়ি বা উঁচু জায়গায় আশ্রয় নিতে হয়। পানি কমলে আবার কাদার মধ্যে ঘরে ফিরতে হয়।
আরেক বাসিন্দা আবুল কালাম বলেন, বছরের পর বছর এই কষ্ট সহ্য করছি। জোয়ারের সময় মনে হয় আমরা দ্বীপের মানুষের মতো হয়ে যাই। ঘরবাড়ি পানিতে ডুবে থাকে, চলাচলের রাস্তাও থাকে না। আমরা কোনো দান বা আর্থিক সহায়তা চাই না, শুধু জোয়ারের পানি ঠেকানোর স্থায়ী ব্যবস্থা চাই।
আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা মরিয়ম বেগম বলেন, বাচ্চাদের নিয়ে পানির মধ্যে থাকতে খুব ভয় লাগে। রান্নাঘর ডুবে যাওয়ায় অনেক সময় শুকনা খাবার খেয়ে থাকতে হয়। পানি নেমে যাওয়ার পর ঘরের ভেতর কাদা পরিষ্কার করতে হয়। স্থায়ী বেড়িবাঁধ হলে আমাদের এই দুর্ভোগ অনেকটাই কমে যাবে।
মসজিদের সহ-সভাপতি আকরাম বলেন, দুপুরে জোহরের নামাজের জন্য আজান দিয়েছিলাম। আজান দেওয়ার কিছুক্ষণ পরই জোয়ারের পানি এসে মসজিদসহ পুরো আশ্রয়ণ প্রকল্প প্লাবিত করে। পানির কারণে আমরা নামাজও আদায় করতে পারিনি।
এলাকাবাসী মো. জাহিদ হোসেন বলেন, এই মানুষগুলো দীর্ঘদিন ধরে পানির সঙ্গে যুদ্ধ করে বসবাস করছে। বর্ষা ও জোয়ারের সময় তাদের দুর্ভোগ সবচেয়ে বেশি হয়। আশ্রয়ণ প্রকল্পের চারপাশে বাঁধ এবং একটি ভালো সড়ক নির্মাণ করা হলে বাসিন্দাদের কষ্ট অনেকটাই কমবে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ১৯৯৮ সালে মাজিডাঙ্গা গ্রামের ৬০টি ভূমিহীন পরিবারকে আশ্রয়ণ প্রকল্পের আওতায় ঘর ও জমি বরাদ্দ দেয় সরকার। পরে প্রকল্পের সামনের চরভরাটি জমিতে আরও ৮০টি ভূমিহীন পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়। বর্তমানে সেখানে প্রায় ১৪০ পরিবারের সাড়ে চার শতাধিক মানুষ বসবাস করছেন।
তাদের অভিযোগ, আশ্রয়ণ প্রকল্প তৈরির সময় পর্যাপ্ত মাটি ভরাট করে জায়গাটি উঁচু করা হয়নি। ফলে বর্ষা মৌসুমে জোয়ারের পানি সহজেই প্রকল্প এলাকায় ঢুকে পড়ে। এতে প্রতিবছরই ভোগান্তিতে পড়তে হয় বাসিন্দাদের। অনেক ঘরও জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে।
কাড়াপাড়া ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য ও বিএনপি নেতা মো. আবু হানিফ হাওলাদার বলেন,আশ্রয়ণ প্রকল্প তৈরির সময় প্রয়োজনের তুলনায় কম মাটি দিয়ে জায়গা উঁচু করা হয়েছিল। এ কারণে জোয়ার এলেই মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ে। দ্রুত বেড়িবাঁধ ও পাকা সড়ক নির্মাণের পাশাপাশি জরাজীর্ণ ঘরগুলো সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।
আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দারা জানান, তারা ভাত-কাপড় বা আর্থিক সহায়তা চান না। জোয়ারের পানির হাত থেকে রক্ষা পেতে প্রকল্পের চারপাশে স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণ, জরাজীর্ণ ঘর সংস্কার এবং যাতায়াতের জন্য একটি পাকা সড়ক নির্মাণ চান তারা।
বাগেরহাট সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহানাজ পারভীন বীথি বলেন, মাজিডাঙ্গা আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাড়িঘর জোয়ারের পানিতে তলিয়ে যাওয়ার বিষয়টি জানতে পেরে দ্রুত সমস্যা সমাধানে প্রকল্প গ্রহণের জন্য পিআইওকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তিনি সরেজমিনে পরিদর্শনের পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।






