দখল-দূষণে মৃতপ্রায় ঐতিহ্যবাহী খাল

ছবি: আগামীর সময়
একসময় যে খাল দিয়ে ছোট-বড় নৌকা চলত, বর্ষার অতিরিক্ত পানি নেমে যেত নদীতে, সেই ঐতিহ্যবাহী খাল আজ দখল, ভরাট ও দূষণের কবলে পড়ে প্রায় মৃতপ্রায়।
গাজীপুরের কাপাসিয়া পৌর এলাকার প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ঐতিহাসিক খালটির স্বাভাবিক পানি প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় সৃষ্টি হয়েছে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা। এর প্রভাবে কাপাসিয়া, বানারহাওলা ও রাউৎকোনা গ্রামের সাতটি বিলে প্রায় ১ হাজার ৭০০ বিঘা কৃষিজমি বছরের পর বছর চাষের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয় কৃষকদের।
এ অবস্থার প্রতিবাদে ও সমাধানের দাবিতে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকেরা কাপাসিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কাছে লিখিত স্মারকলিপি জমা দিয়েছেন। এতে খাল দখলমুক্ত করা, পুনঃখনন এবং দ্রুত পানি নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানানো হয়।
স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়, সাতটি বিলে প্রায় ১ হাজার ৫০০ বিঘা ধানক্ষেত এবং প্রায় ২০০ বিঘা মৌসুমি শাকসবজি, পাট ও অন্যান্য অর্থকরী ফসলের জমি রয়েছে। একসময় বানারহাওলা মসজিদের পশ্চিম পাশের (মাস্টার কলোনি) খাল দিয়ে এসব বিলের পানি স্বাভাবিকভাবে নদীতে প্রবাহিত হতো। কিন্তু গত প্রায় ১২ বছরে খাল দখল, ভরাট, স্থাপনা নির্মাণ এবং নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে পানি চলাচল প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এর সঙ্গে বিলের মধ্যে বাঁধ দিয়ে মাছের প্রকল্প গড়ে তোলায় পানি নিষ্কাশন আরও ব্যাহত হচ্ছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, আজুখাঁর বিল থেকে বাজাল বিল পর্যন্ত প্রায় দুই কিলোমিটার দীর্ঘ এই খাল একসময় এলাকার প্রধান পানি নিষ্কাশনের পথ ছিল। বর্ষার পানি দ্রুত নেমে যাওয়ার পাশাপাশি কাঁঠাল, পাটসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্যবাহী নৌকাও চলাচল করত। বর্তমানে অবৈধ দখল, ভরাট, ময়লা-আবর্জনা ফেলা এবং দীর্ঘদিন পুনঃখনন না হওয়ায় খালটি অনেক স্থানে সরু হয়ে গেছে। ফলে পানি আটকে থেকে বিস্তীর্ণ কৃষিজমিতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হচ্ছে।
কাপাসিয়া উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা সামশুদ্দিন খান বললেন, কাপাসিয়ার এই রেকর্ডভুক্ত খালটি উদ্ধার করা গেলে হাজার হাজার কৃষক উপকৃত হবেন। আমরা লিখিতভাবে ইউএনওকে বিষয়টি জানিয়েছি। দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে কৃষকের ক্ষতি আরও বাড়বে।
স্থানীয় বাসিন্দা মো. নুরুজ্জামান বললেন, আগে এই খাল দিয়ে নৌকা চলত। এখন খাল এতটাই সরু হয়ে গেছে যে পানি ঠিকমতো চলাচলই করতে পারে না।
বানারহাওলা গ্রামের কৃষক শফিকুল ইসলাম জানালেন, আমার আড়াই বিঘা জমি এখনো পানির নিচে। সময়মতো চাষ করতে না পারায় বড় ধরনের লোকসান গুনতে হচ্ছে। কয়েকজনের খাল দখলের কারণে হাজারো কৃষকের ফসল নষ্ট হচ্ছে।
একই গ্রামের কৃষক আসাদুজ্জামানের মতে, খালের উত্তর-পশ্চিম পাশে আমার পাঁচ বিঘা জমি রয়েছে। খাল ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি আটকে থাকে। ফলে জমিতে কোনো ফসল উৎপাদন করতে পারছি না। প্রতিবছরই ক্ষতির মুখে পড়ছি।
স্থানীয় বাসিন্দা নুরুল আমীন খান অভিযোগ করেন, খাল ভরাট করে এর ওপর ৮ থেকে ১০টি বাড়ি নির্মাণ করায় পানি চলাচলের পথ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। এতে হাজারো কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
খোদাদিয়া গ্রামের বাসিন্দা হানিফ শেখ জানালেন, একসময় এই খাল দিয়ে কাঁঠাল, পাটসহ বিভিন্ন কৃষিপণ্য কাপাসিয়া বাজারে আনা হতো। ছোটবেলায় আমি দাদার সঙ্গে এই খাল দিয়ে পাট নিয়ে নারায়ণগঞ্জে গেছি। এখন দখল আর ময়লা-আবর্জনায় খালটি প্রায় বিলীন হয়ে গেছে। বহুবার অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাইনি।
কৃষকদের দাবি, পানি নিষ্কাশনের স্থায়ী ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিবছর প্রায় ৫০ হাজার মণ ধান উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। পাশাপাশি মৌসুমি শাকসবজি, পাট ও অন্যান্য অর্থকরী ফসলে প্রায় ৫০ লাখ টাকার ক্ষতি হচ্ছে। ধান উৎপাদন কমে যাওয়ায় গবাদিপশুর খাদ্য সংকটও তৈরি হয়েছে। ফলে বাইরে থেকে গো-খাদ্য কিনতে বছরে প্রায় ৭৫ লাখ টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করতে হচ্ছে। অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে কৃষিকাজ ছেড়ে অন্য পেশায় চলে যাচ্ছেন।
স্মারকলিপিতে পাঁচ দফা দাবি জানানো হয়েছে। দাবিগুলো হলো খাল দখলমুক্ত করে দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা করা, খালের উভয় পাশের কালভার্টসংলগ্ন বাঁধ অপসারণ, বিলের মাঝখানের বাঁধ সরিয়ে স্বাভাবিক পানি প্রবাহ নিশ্চিত করা, আসন্ন ইরি মৌসুমে ধান রোপণের উপযোগী পরিবেশ সৃষ্টি এবং জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ।
এ বিষয়ে কাপাসিয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. নাহিদুল হক বললেন, খাল দখলের বিষয়ে তহশিল কর্মকর্তাকে সরেজমিনে তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। প্রয়োজন হলে খাল দখলমুক্ত করতে উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করা হবে।
কাপাসিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হাফিজুল হক জানালেন, গতকাল খালটি সরেজমিন পরিদর্শন করেছি। খালটি দখলমুক্ত করে স্বাভাবিক পানি প্রবাহ নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে আইনানুগ প্রক্রিয়ায় পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।




