দক্ষতা ছাড়াই অনিশ্চয়তার বিদেশযাত্রা

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বিদেশে গিয়ে ভালো আয় করে পরিবারের ঋণ শোধ করবেন— এই আশায় হবিগঞ্জের আফজাল হোসেন পাড়ি জমিয়েছিলেন কাতারে। কিন্তু দেড় বছর কম বেতনের চাকরি করেও পারেননি সঞ্চয় করতে। শেষ পর্যন্ত খালি হাতে দেশে ফিরেছেন তিনি। আগে থাকা ৪ লাখ টাকার ঋণের সঙ্গে যোগ হয়েছে বিদেশযাত্রার ৫ লাখ— সব মিলিয়ে এখন ৯ লাখ টাকার ঋণের বোঝা তার কাঁধে।
আফজালের মতো এমন অভিজ্ঞতা এখন হবিগঞ্জের অনেক প্রবাসী শ্রমিক ও তাদের পরিবারের। মধ্যস্বত্বভোগীর মাধ্যমে উচ্চব্যয়ে বিদেশে গিয়েও অনেকে পাচ্ছেন না প্রতিশ্রুত কাজ। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে ভাষা ও কারিগরি দক্ষতার ঘাটতি। ফলে কেউ খালি হাতে দেশে ফিরছেন, আবার কেউ বিদেশের মাটিতে বছরের পর বছর থেকে যাওয়ার খরচটুকু তুলতেই হিমশিম খাচ্ছেন।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বলছে, জেলার প্রায় ৬৩ হাজার ৭৫১টি পরিবার রেমিট্যান্স গ্রহণ করছে। এসব পরিবারের অন্তত ৫০ হাজার সদস্য বিদেশে রয়েছেন। তাদের বেশিরভাগই কাতার, কুয়েত, ওমান, সৌদি আরব, বাহরাইন ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে কর্মরত। অবশ্য জনশক্তি, কর্মসংস্থান ও শ্রমিককল্যাণ ব্যুরোর হিসাবে, প্রতি মাসে হবিগঞ্জ থেকে অন্তত ৩ হাজার শ্রমিক বিদেশে যাওয়া-আসা করেন।
হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ উপজেলার হিলালপুর গ্রামের জাহিদুর রহমান, পায়েল আহমেদ ও যুবায়ের আহমেদ দেড় বছর আগে কাতারপ্রবাসী এক আত্মীয়ের মাধ্যমে জনপ্রতি ৪ লাখ ৯৫ হাজার টাকা দিয়ে ভিসা নেন। তাদের প্রত্যাশা ছিল, বিদেশে গিয়ে ভালো কাজ করে দ্রুত ঋণের টাকা পরিশোধ করবেন। কিন্তু কাতারে গিয়ে তারা দেখেন, প্রতিশ্রুত কাজই নেই।
জাহিদুর রহমানের অভিযোগ, তিন মাস কর্মহীন থাকার পর নির্মাণশ্রমিকের সহকারী হিসেবে কাজ পান। মাসিক বেতন ১ হাজার রিয়াল। যার অর্ধেকই চলে যায় থাকা-খাওয়ার খরচে। পরে জানতে পারেন, প্রকৃত বেতন ২ হাজার রিয়াল হলেও নিয়োগকর্তা অর্ধেক কেটে রাখছেন। তিন মাস কাজ করার পর এক মাসের বেতন দেওয়া হয়। প্রতিবাদ করলে কাজ হারানোর ভয় দেখানো হয়। আরবি ভাষা না জানায় নিজের অধিকার নিয়েও কথা বলতে পারেন না তিনি।
একই ধরনের পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছেন পায়েল আহমেদ ও যুবায়ের আহমেদও। কাজের আশায় তারা আরও এক বাঙালির সঙ্গে যোগাযোগ করেন। ভালো কাজ দেওয়ার কথা বলে ওই ব্যক্তি জনপ্রতি ২০০ কাতারি রিয়াল নেন। এরপর যোগাযোগ বন্ধ করে দেন। পরে তারা জানতে পারেন, ওই ব্যক্তি আরও অনেকের কাছ থেকে একইভাবে টাকা নিয়েছেন।
কাতার ও সৌদি আরবে থাকা এবং সেখান থেকে দেশে ফেরা আরও অন্তত ৩০ জন শ্রমিক এবং তাদের স্বজনদের সঙ্গে কথা বলেও একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। কারও অভিযোগ, বিদেশে গিয়ে প্রতিশ্রুত কাজ পাননি; কারও অভিযোগ, বেতন কম; আবার কেউ বলছেন, মধ্যস্বত্বভোগীদের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল ছিল না।
কাতারের সানাইয়া এলাকায় ফুড ডেলিভারির কাজ করেন বানিয়াচং উপজেলার প্রকাশ কুমার রায়। তিনি জানালেন, গাড়ি চালানো শিখে বিদেশে এসেছিলেন বলেই ভালো আয় করতে পারছেন। তবে প্রতিদিন অনেক বাংলাদেশি শ্রমিককে কাজ না পেয়ে মানবেতর জীবন কাটাতে দেখেন তিনি। তার পরামর্শ, বিদেশে যাওয়ার আগে অন্তত একটি কারিগরি দক্ষতা অর্জন করা উচিত।
বিদেশের শ্রমবাজার সম্পর্কে দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থাকা ব্যক্তিরাও একই কথা বলছেন। সৌদি আরবে দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত হবিগঞ্জ জেলা পরিষদের প্রশাসক আহমেদ আলী মুকিবের মতে, বিদেশে যাওয়ার আগে শুধু ভিসা পেলেই হবে না। সংশ্লিষ্ট দেশের শ্রমবাজারের চাহিদা অনুযায়ী কারিগরি দক্ষতা ও ভাষাজ্ঞান অর্জন করতে হবে।
তার ভাষ্য, ‘বাংলাদেশ থেকে অনেক শ্রমিক উচ্চ খরচে বিদেশে যাচ্ছেন। কিন্তু সেখানে গিয়ে কাজের ধরন ও বেতন সম্পর্কে প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তবতার মিল পাচ্ছেন না। এতে ঋণের বোঝা নিয়ে তাদের অনেকে পড়ছেন আরও সংকটে।’
সৌদি আরবে গিয়ে বিপাকে পড়া অনেক প্রবাসী তার শরণাপন্ন হয়েছেন জানিয়ে আহমেদ আলী মুকিব বলেছেন, ‘যতটুকু সম্ভব হয়েছে, তাদের সহযোগিতা করেছি। তবে সবার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করা সম্ভব হয়নি।’
তিনি মনে করেন, বিদেশে যাওয়ার আগে কোন দেশে কোন কাজের চাহিদা বেশি, তা জেনে সেই কাজের দক্ষতা ও প্রয়োজনীয় ভাষাজ্ঞান অর্জন করে বিদেশে যাওয়া উচিত।




