ফুলবাড়ী ট্র্যাজেডি: ২০ বছরেও বাস্তবায়ন হয়নি ছয় দফা

সংগৃহীত ছবি
আজ ২৬ আগস্ট। দিনাজপুরের ফুলবাড়ী ট্র্যাজেডি দিবস। ২০০৬ সালের এই দিনে কয়লাখনি প্রকল্প বাতিল ও এশিয়া এনার্জিকে ফুলবাড়ী থেকে প্রত্যাহারের দাবিতে আন্দোলনে নামে স্থানীয়রা। বিক্ষোভকারীদের ওপর পুলিশ ও তৎকালীন বিডিআরের গুলিতে নিহত হন তিনজন। আহত হন দুই শতাধিক মানুষ। আহতদের কয়েকজন পরে পঙ্গুত্ব বরণ করেন।
ওই ঘটনার পর আন্দোলনকারীদের সঙ্গে তৎকালীন সরকারের ছয় দফা সমঝোতা চুক্তি হয়। তবে ২০ বছর পরও সেই চুক্তির সব দফা বাস্তবায়ন হয়নি বলে অভিযোগ আন্দোলনকারীদের। তাদের দাবি, এশিয়া এনার্জির কার্যক্রমও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি।
সেদিনের আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয়েছিলেন ফুলবাড়ী পৌর শহরের সুজাপুর গ্রামের রিকশাভ্যানচালক বাবলু রায় (৫৬)। গুলিতে তার শরীরের অর্ধেক অংশ অবশ হয়ে যায়। হারিয়ে যায় কর্মক্ষমতা। এরপর আর স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে পারেননি তিনি।
বাবলুর শরীরে এখন নানা জটিল রোগ বাসা বেঁধেছে। অর্থের অভাবে নিয়মিত চিকিৎসা করাতে পারছেন না। এতে শরীরের বিভিন্ন অংশে পচন ধরেছে। স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে দুর্বিষহ জীবন কাটছে তার।
তবে দীর্ঘদিনের এই কষ্টের মধ্যেও ছয় দফা চুক্তির পূর্ণ বাস্তবায়ন চান বাবলু। মৃত্যুর আগে হলেও তিনি ছয় দফা চুক্তির শতভাগ বাস্তবায়ন দেখে যেতে চান। এ জন্য তিনি সরকারের প্রধানের কাছে আবেদন জানিয়েছেন।
২০০৬ সালের ২৬ আগস্ট সকাল থেকেই ফুলবাড়ীর ঢাকা মোড়ে ফুলবাড়ী, বিরামপুর, নবাবগঞ্জ ও পার্বতীপুর উপজেলার হাজার হাজার মানুষ জড়ো হতে থাকেন। উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলনের প্রকল্প বাতিল, জাতীয় সম্পদ রক্ষা এবং বিদেশি কোম্পানি এশিয়া এনার্জিকে ফুলবাড়ী থেকে প্রত্যাহারের দাবিতে তারা আন্দোলনে অংশ নেন।
দুপুর ২টার দিকে তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটি এবং ফুলবাড়ী রক্ষা কমিটির নেতৃত্বে একটি বিশাল মিছিল নিমতলা মোড়ের দিকে এগিয়ে যায়। পথে পুলিশ ও তৎকালীন বিডিআর মিছিলে বাধা দেয়। একপর্যায়ে বাধা উপেক্ষা করে মিছিল এগিয়ে গেলে টিয়ার শেল ও রাবার বুলেট ছোড়া হয়। পরে গুলি চালানো হয়।
গুলিতে ঘটনাস্থলেই নিহত হন আল আমিন, সালেকীন ও তরিকুল। আহত হন দুই শতাধিক মানুষ। তাদের মধ্যে কয়েকজন স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করেন।
ঘটনার পর ক্ষুব্ধ জনতা ফুলবাড়ীতে এশিয়া এনার্জির কার্যালয় ভাঙচুর করে। শুরু হয় লাগাতার হরতাল। ফুলবাড়ীর সঙ্গে অন্য জেলা ও উপজেলার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরে ৩০ আগস্ট আন্দোলনকারীদের সঙ্গে তৎকালীন বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের ছয় দফা সমঝোতা চুক্তি হলে ধীরে ধীরে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।
চুক্তির ছয় দফার মধ্যে ছিল এশিয়া এনার্জিকে দেশ থেকে বহিষ্কার, দেশের কোথাও উন্মুক্ত পদ্ধতিতে কয়লা উত্তোলন না করা, নিহত ও আহতদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া, নিহতদের স্মরণে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ, গুলিবর্ষণের জন্য দায়ীদের শাস্তি এবং আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা সব মামলা প্রত্যাহার।
তবে এসব দাবির পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি বলে অভিযোগ করেছেন আন্দোলনকারীরা। তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির ফুলবাড়ী শাখার আহ্বায়ক সৈয়দ সাইফুল ইসলাম জুয়েল বলেছেন, ছয় দফা চুক্তি বাস্তবায়নে আগের সরকার গড়িমসি করেছে। এখন নতুন সরকারের কাছে তাদের দাবি, অতীতের ভুল নীতি থেকে সরে এসে গণমানুষের দাবি অনুযায়ী চুক্তিটির পূর্ণ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।
তিনি বলেছেন, জাতীয় সম্পদ জনগণের। কোনো বহুজাতিক কোম্পানির হাতে তা তুলে দেওয়া যাবে না।
খনি আন্দোলনের নেতা এম এ কাইয়ুম আনসারী বলেছেন, প্রায় ৩০ বর্গকিলোমিটার এলাকা ও ৫ হাজার ৯০০ হেক্টর উর্বর কৃষিজমি নষ্ট করে এখানে কোনো কয়লাখনি করতে দেওয়া হবে না। মাটি ও মানুষের নিরাপত্তা রক্ষাই তাদের প্রধান অঙ্গীকার।
ফুলবাড়ী ট্র্যাজেডি দিবস উপলক্ষে আজ বিভিন্ন সংগঠনের উদ্যোগে শোক র্যালি, শহীদ বেদিতে শ্রদ্ধাঞ্জলি ও গণসমাবেশের আয়োজন করা হয়েছে। জাতীয় কমিটির উপজেলা আহ্বায়ক সৈয়দ সাইফুল ইসলাম জুয়েলের সভাপতিত্বে সমাবেশে প্রধান অতিথি থাকবেন গণতান্ত্রিক অধিকার কমিটির কেন্দ্রীয় সদস্য ও অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক ড. আনু মুহাম্মদ।







