ঈশ্বরদী
শেষ প্রজন্মের হাতে বিলুপ্তপ্রায় ঐতিহ্যবাহী কাঠের চাকা শিল্প

আধুনিকতার ছোঁয়ায় গ্রামবাংলার শত বছরের লোকঐতিহ্য ‘কাঠের চাকা শিল্প’ আজ বিলুপ্তির মুখে, চবি : আগামীর সময়
সময়ের বিবর্তনে বদলে গেছে যোগাযোগ ও পণ্য পরিবহনের মাধ্যম। যান্ত্রিক যানবাহনের আধিপত্য ও আধুনিকতার ছোঁয়ায় গ্রামবাংলার শত বছরের লোকঐতিহ্য ‘কাঠের চাকা শিল্প’ আজ বিলুপ্তির মুখে। পাবনার ঈশ্বরদীর পদ্মাপাড়ের আরামবাড়িয়া গ্রামের কারিগরদের শেষ প্রজন্মের হাতে কোনোমতে টিকে আছে অস্তিত্ব সংকটে পড়া প্রাচীন এই শিল্পটি।
স্থানীয়দের ভাষ্য, মাত্র দুই দশক আগেও আরামবাড়িয়া পদ্মাপাড়ের গ্রামগুলোতে সকাল হলেই ভেসে আসত হাতুড়ি-বাটালের খটখট শব্দ। নাটোর, কুষ্টিয়াসহ পার্শ্ববর্তী বিভিন্ন জেলার ব্যবসায়ীরা গরু ও মহিষের গাড়ির কাঠের চাকা কিনতে ভিড় জমাতেন এই গ্রামে। তখন নিভৃত এই পল্লীতে প্রায় অর্ধশত কারখানায় দেড় শতাধিক কারিগর দিনরাত ব্যস্ত সময় পার করতেন। তবে যান্ত্রিক যানবাহনের দাপটে কাঠের চাকার চাহিদা কমে যাওয়ায় একে একে বন্ধ হয়ে গেছে প্রায় সবকটি কারখানা।
সময়ের পরিক্রমায় এখন মাত্র পাঁচটি কারখানা কোনো রকমে টিকে আছে। স্থানীয় বিপদ চন্দ্র সরকার, অরুন সরকার, মো. ইনু, হাসেম আলী ও মাজদার হোসেন—এই পাঁচজন প্রবীণ কারিগর তাদের পরম মমতায় বাঁচিয়ে রেখেছেন বহু বছরের পুরোনো এই ঐতিহ্যকে।
কারিগরদের ভাষ্য, তাদের বাপ-দাদারা বিগত প্রায় ২০০ বছর ধরে এই পেশাকে লালন করে আসছেন। বর্তমানে কর্মরত এই পাঁচ কারিগরও ৪০-৫০ বছর ধরে পেশাটি আঁকড়ে রেখেছেন। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে তাদের দক্ষ হাতে তৈরি কাঠের চাকা একসময় এই অঞ্চলের গ্রামীণ জীবনের কৃষি, বাণিজ্য ও যোগাযোগের একমাত্র ভরসা ছিল। তবে কালের বিবর্তনে গরুর গাড়ির কদর কমার পাশাপাশি তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে চাকা তৈরির প্রধান কাঁচামাল বাবলা কাঠের। এখন দশ-গ্রাম খুঁজেও পর্যাপ্ত বাবলা কাঠ পাওয়া যায় না, আর যা-ও পাওয়া যায় তা দ্বিগুণ দামে কিনতে হয়। ফলে চাকা তৈরি করে উপযুক্ত লাভ মিলছে না।
সবচেয়ে আশঙ্কাজনক বিষয় হলো, বর্তমানে কর্মরত পাঁচ কারিগরের সকলেই পঞ্চাশোর্ধ্ব। কঠোর শারীরিক পরিশ্রমের তুলনায় আয় অত্যন্ত নগণ্য হওয়ায় কারিগরদের সন্তানেরা বা নতুন প্রজন্মের কেউই আর এই পেশায় আসতে চাইছেন না। ফলে এই পাঁচজন কারিগরের বার্ধক্যের সাথে সাথেই চিরতরে হারিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে শতাব্দীপ্রাচীন এই শিল্পটি।
স্থানীয়রা বলছেন, একটি কাঠের চাকা কেবল কোনো যানবাহনের অংশ নয়—এটি আবহমান গ্রামবাংলার ইতিহাস, অনন্য কারিগরি দক্ষতা ও সংস্কৃতির এক জীবন্ত দলিল। হারিয়ে যাওয়া এই লোকশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে দ্রুত সঠিক নথিভুক্তকরণ, ব্যাপকভাবে বাবলা গাছের চারা রোপণ, সরকারি-বেসরকারি আর্থিক প্রণোদনা এবং নতুন প্রজন্মের কাছে এর গুরুত্ব তুলে ধরা অত্যন্ত জরুরি।
ঈশ্বরদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) হাসান মোহাম্মদ শোয়াইব আশ্বাস দিয়ে জানালেন, বিলুপ্তপ্রায় এই ঐতিহ্যবাহী কাঠের চাকা শিল্প এবং এর সঙ্গে জড়িত প্রবীণ কারিগরদের টিকিয়ে রাখতে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় সব ধরণের সহায়তা করা হবে।




