আলোহীন চোখে দুই সন্তানের স্বপ্ন, পড়ার খরচ জোগাতে পথে শিউলি

ছবি: আগামীর সময়
মায়ের চোখে আলো নেই, স্বামীও নেই। বাবার দিনমজুরির সামান্য আয়ে সংসার চালানোই কঠিন। তবু দুই সন্তানের পড়াশোনা বন্ধ করতে চান না শিউলি আক্তার (২৮)। তাই সপ্তাহের ছুটির দুই দিন শুক্রবার ও শনিবার বড় ছেলে নীরবকে (৯) সঙ্গে নিয়ে নান্দাইল বাজারে মানুষের কাছে সাহায্য চান তিনি। যে বয়সে নীরবের হাতে থাকার কথা বই-খাতা, সেই বয়সেই মায়ের হাত ধরে তাকে পথে নামতে হচ্ছে। দুই দিনে পাওয়া প্রায় এক হাজার টাকা দিয়েই চলে পরিবারের নানা খরচ ও দুই সন্তানের পড়াশোনার প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা।
শিউলি নান্দাইল পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডের ভূঁইয়াপাড়া গ্রামের দিনমজুর চাঁন মিয়ার মেয়ে। মাত্র তিন বছর বয়সে দৃষ্টিশক্তি হারান তিনি। প্রায় ১০ বছর আগে জাহাঙ্গীরপুর ইউনিয়নের কালিয়ান গ্রামের লালন মিয়ার সঙ্গে তার বিয়ে হয়। দুই সন্তান জন্মের পর স্বামী তাদের ছেড়ে চলে যান। এরপর বাবার বাড়িই হয়ে ওঠে শিউলি ও তার দুই সন্তানের আশ্রয়।
নীরব নান্দাইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্র। ছোট ভাই রাব্বি (৬) পড়ে শিশু শ্রেণিতে। সপ্তাহের পাঁচ দিন তারা স্কুলে যায়। আর স্কুল বন্ধ থাকলেই মায়ের হাত ধরে নান্দাইল বাজারে বের হয় নীরব।
নীরব বলে, স্কুলে পড়তে তো খরচ লাগে, কেউ তো টাকা দেয় না। স্কুল বন্ধ যেদিন, সেই দিনেই আম্মার হাত ধরে বাজারে ভিক্ষা করি। আব্বা তো দেখে না, কী করব?
শিউলি বলেন, দুই সন্তান জন্মের পর স্বামী আর খোঁজ রাখেনি। প্রতিবন্ধী ভাতার কিছু টাকা পাই, কিন্তু তাতে সংসার চলে না। দুই ছেলে স্কুলে গেলে তাদের বই-খাতা ও নানা জিনিসের প্রয়োজন হয়। তাই বড় ছেলেটার সঙ্গে ভিক্ষা করতে বের হই।
শিউলির বাবা চাঁন মিয়া দিনমজুরি করেন। তার সামান্য আয়ে পরিবারের খাবার জোগাড় করাই কঠিন। দৃষ্টিহীন হওয়ায় শিউলির নিজেরও নিয়মিত আয়ের সুযোগ নেই। ফলে দুই ছেলের পড়াশোনার খরচ জোগাতে তাকে মানুষের দ্বারে যেতে হয়।
শিউলির মা হেলেনা আক্তার জানান, মাত্র তিন বছর বয়সে দৃষ্টিশক্তি হারায় তার মেয়ে। অনেক কষ্টে বড় করে বিয়ে দিলেও সংসার টেকেনি। এখন মেয়ের দুই সন্তানকেও তাদের পরিবারের সহায়তায় বড় করতে হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা চম্পা আক্তার (৩৫) বলেন, শিউলি অসহায়। স্বামী নেই, দুই সন্তান নিয়ে বাবার বাড়িতে থাকে। তার বাবাও দিন আনে দিন খায়। প্রতিবন্ধী ভাতা ছাড়া তেমন কোনো সহায়তা পায় না।
নান্দাইল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মিলি আক্তার বলেন, নীরব ও তার ছোট ভাই আমাদের স্কুলেই পড়াশোনা করে। স্কুল শুক্রবার ও শনিবার বন্ধ থাকলে সে তার মাকে নিয়ে ভিক্ষা করে বলে শুনেছি। আমরা স্কুল থেকে তাদের খাতা-কলম দিয়ে সহযোগিতা করার চেষ্টা করি।
নান্দাইল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফাতেমা জান্নাত বলেন, শিউলির বিষয়ে খোঁজ নিয়ে তাদের সহযোগিতা করা হবে। কীভাবে তাদের জন্য নিয়মিত আয়ের ব্যবস্থা করা যায়, সে ব্যাপারেও প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হবে।







