দুর্যোগের থাবা
ইলিশশূন্য ট্রলার নিয়ে ঘাটে ফিরছেন জেলেরা

ছবি: আগামীর সময়
চলতি মাসের (জুলাই) শুরুর দিকে সাগরে গিয়েছিলেন জেলেরা। আশা ছিল ট্রলারবোঝাই করে ইলিশ নিয়ে ঘাটে ফেরার। কিন্তু তাদের সেই আশা পরিণত হয় নিরাশায়। জাল ফেলতে না ফেলতেই আকষ্মিক দুর্যোগে উত্তাল হয়ে ওঠে বঙ্গোপসাগর। প্রচণ্ড ঝড়ো বাতাস আর প্রবল ঢেউয়ে কোনোভাবেই টিকে থাকার উপায় ছিল না সাগরে।
এমন দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় ইলিশ আহরণ। সাগর ছেড়ে সুন্দরবনসহ উপকূলের বিভিন্ন স্থানে নিরাপদ আশ্রয়ে অন্তত দশ দিন কাটাতে হয় জেলেদের। দুর্যোগ কিছুটা কেটে যাওয়ার পর ফের সাগরে নামার অবস্থাও ছিল না তাদের। কারণ আশ্রয়ে থাকা বেশিরভাগ ট্রলারেই ছিল না পর্যাপ্ত জ্বালানি ও রসদসামগ্রী (খাদ্য)। নতুন করে জ্বালানি আর রসদ নিতে হলে আসতে হবে মহাজনের কাছেই। ফলে ইলিশ শূন্য ট্রলার নিয়েই একে একে ঘাটে ফেরৎ আসছে ট্রলারগুলো।
ইলিশের সংকটের কারণে দামও বেড়েছে আকাশ ছোঁয়া। জাটকার কেজি ৮০০ থেকে এক হাজার টাকা। আর আধা কেজি বা ৮০০ গ্রাম সাইজ ১২০০ থেকে ১৮০০ টাকা। কেজি পার হলেই তার দাম হাকা হচ্ছে ২৫০০ থেকে তিন হাজার টাকা প্রতি কেজি। দাম সাধ্যের বাইরে চলে যাওয়ায় সাধারণ মানুষ এখন আর নিতে পারছে না চিরচেনা সেই ইলিশের স্বাদ।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দুর্যোগের থাবায় ইলিশের আকাল বাগেরহাটের শরণখোলাসহ উপকূলজুড়েই। ভরা মৌসুমে সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত মাছের নিলামের হাঁক-ডাকে মুখোর থাকার কথা মৎস্য আড়ৎগুলো। কিন্তু সেই আড়ৎ এখন নীরব-নিস্তব্ধ। একদিকে ঋণের বোঝা, আরেক দিকে পরবর্তীতে ট্রলার ছাড়ার পুঁজি কিভাবে যোগাড় করবেন সেই চিন্তায় পড়েছেন জেলে-মহাজনরা।
বুধবার (১৫ জুলাই) দুপুরে শরণখোলার মৎস্য অবতরণ কেন্দ্রে গিয়ে দেখা যায়, আগেরদিন মঙ্গলবার রাতে ঘাটে এসে ভিড়েছে ৭-৮টি ট্রলার। জেলেদের মাঝে নেই কর্মচঞ্চলতা। জেলোর কেউ ট্রলারে আবার কেউ ঘাটের বেঞ্চিতে বসে পার করছেন অলস সময়। এ সময় বেশ কয়েকজন জেলে ও ট্রলার মাঝির সঙ্গে কথা বলে জানা যায় বাস্তব চিত্র।
এফবি মদিনা ট্রলারের জেলে শহিদুল শিকদার বললেন, সাগরে কেবল যাইয়া এক খ্যাও (প্রথম জাল ফেলা) মারছি। এর মধ্যেই দেহি চারদিক অন্ধকার ওইয়া আইছে। তাড়াতাড়ি জাল টাইন্যা ট্রলারে উডাইয়া কূলে চইল্যা আই। এই খ্যায় ৫০টা ইলিশ পাইছিলাম। এর পর পাথরঘাটার পদ্মা স্লুইস খালে ট্রলার নিয়া দশ দিন ছিলাম। এই কয়দিন বইয়া বইয়া খাইছি। ট্রলারে খাওন ছিলনা, তাই ঘাটে চইল্যা আইছি।
এফবি আয়শা ট্রলারের মাঝি ইলিয়াস হোসেন বললেন, দুর্যোগের আগে দুই খ্যাও মারছিলাম। ছোট-বড় মিলাইয়া ১২০ পিসের মতো ইলিশ পাইছি। ট্রলারে ১৫-১৬ জন ভাগী। এই মাছ বেইচ্যা আমরা নিমু না মহাজনরে দিমু। সেই চিন্তায় আছি আমরা।
এফবি কারিমা ট্রলারের মাঝি কালাম মোল্লা ও এফবি রহমতউল্লাহ ট্রলারের মাঝি আলী হোসেনের ভাষ্য, আবহাওয়া ভালো থাকলে হয়তো মাছ পড়ত। কিন্তু আমাগো ভাগ্যই খারাপ।
ট্রলার মালিক ও আড়ৎদার মুজিবর তালুকদার হতাশা প্রকাশ করে বললেন, প্রতি ট্রিপে একেকটি ট্রলার সাগরে পাঠাতে তিন থেকে সাড়ে তিন লাখ টাকা খরচ হয়। আবহাওয়া খারাপ থাকায় এক খ্যাও-দুই খ্যাও দেওয়ার পর আর সাগরে জাল ফেলাই সম্ভব হয়নি। সব ট্রলারই খালি ফিরে আসছে। কোনো ট্রলারে ৫০ কোনো ট্রলারে ১০০ ইলিশ নিয়ে ঘাটে ভিড়েছে। কোনো মহাজনেরই চালান উঠবে না। এবারের ট্রিপের পুরো চালানই লোকসান।
শরণখোলা সমুদ্রগামী ফিশিং ট্রলার মালিক সমিতির সভাপতি মো. আবুল হোসেনের ভাষ্য মতে, বৈশাখ থেকে আশ্বিনের এই ছয় মাস ইলিশের মৌসুম। কিন্তু এই সময়ের অর্ধেকটাই চলে যায় অবরোধে (নিষেধাজ্ঞা)। বাকি সময় চলে দফায় দফায় দুর্যোগ। এতে সাগরে টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে পড়ে জেলেদের। ফলে নিরবচ্ছিন্নভাবে মাছ ধরা আর হয় না। লাখ লাখ টাকা ঋণ এবং ধারদেনা করে ট্রলার সাগরে পাঠিয়ে থাকতে হয় দুশ্চিন্তায়। এবারও ঝড়ের কবলে পড়ে ট্রলার ডুবিতে বিভিন্ন এলাকার বেশ কয়েকজন জেলের মৃত্যু হয়েছে।
ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে অসংখ্য ট্রলার ও জাল।
মৎস্যজীবী নেতা আবুল হোসেন আরো জানালেন, দুর্যোগের কারণে এবারের ট্রিপে বেশির ভাগ ট্রলারই খালি ফিরে আসছে। শরণখোলাসহ উপকূলীয় এলাকার মহাজনরা লাখ লাখ টাকা লোকসানে পড়েছেন। প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা রাজস্ব দিলেও কোনো প্রকার সরকারি সুবিধা দেওয়া হয় না আমাদের। ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা করে সহজ শর্তে ঋণ ও বিশেষ প্রণোদনা দেওয়ার দাবি জানাই সরকারের কাছে।
ক্ষতিগ্রস্ত মহাজনদের দাবির বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করার কথা জানালেন শরণখোলা উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা অঞ্জন বিশ্বাস।




