রতনপুর
যে গ্রামের পরিচয় তার মানুষ

ছবি: আগামীর সময়
বাংলার গ্রাম মানেই সবুজ প্রকৃতি, মাটির গন্ধ আর মানুষের আন্তরিকতা। তবে কিছু কিছু গ্রাম আছে, যেগুলো শুধু প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য নয়, বরং সেখানকার মানুষের কৃতিত্ব, শিক্ষা, মানবিকতা ও অবদানের জন্য বিশেষভাবে পরিচিত। হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার নোয়াপাড়া ইউনিয়নের রতনপুর তেমনই একটি গ্রাম। যে গ্রামের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার মানুষ।
চা-বাগান ঘেরা শান্ত-সুন্দর এই জনপদে ঢুকলেই চোখে পড়ে এক অন্যরকম পরিবেশ। গ্রামের এক পাশে ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক, অন্যপাশে রেললাইন। যোগাযোগের সুবিধার কারণে দীর্ঘদিন ধরেই এটি এলাকার একটি গুরুত্বপূর্ণ বসতি হিসেবে পরিচিত। দক্ষিণে মাদারগড়া, উত্তরে নোয়াপাড়া এবং পূর্বে ছাতিয়াইন রেলস্টেশন এলাকা নিয়ে গড়ে উঠেছে রতনপুর।
একসময় গ্রামের অধিকাংশ ঘর ছিল মাটির। ছন, বাঁশ আর টিনের ছাউনিতে গড়ে ওঠা সেই রতনপুর আজ অনেকটাই বদলে গেছে। নব্বইয়ের দশকে যে বিস্তীর্ণ জমিতে সবজির আবাদ হতো, সেখানে এখন অনেক জায়গায় গড়ে উঠেছে দালানকোঠা। তবুও হারিয়ে যায়নি গ্রামের নিজস্ব সৌন্দর্য আর মাটির গন্ধ।
রতনপুর বাজার আজও গ্রামের প্রাণকেন্দ্র। ভোর হলেই একসময় এখানে বসত সবজির বড় বাজার। দূর-দূরান্ত থেকে আসতেন পাইকাররা। সেই ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতা এখনও টিকে আছে। বাজারের পাশেই রয়েছে রতনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও ঐতিহ্যবাহী ঈদগাহ ময়দান, যা গ্রামের সামাজিক ও ধর্মীয় জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে রতনপুরকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে এখানকার মানুষের সাফল্যগাঁথা।
এই গ্রামেরই সন্তান ড. ফরাস উদ্দিন। তিনি বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর এবং ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার সহোদর অধ্যাপক আশরাফ উদ্দিন আহমদ ছিলেন বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইসলামের ইতিহাস বিভাগের বিভাগীয় প্রধান। বর্তমানে তিনি যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করলেও গবেষণা ও লেখালেখির মাধ্যমে জ্ঞানচর্চা চালিয়ে যাচ্ছেন।
রতনপুরের আরেক কৃতি সন্তান ছিলেন শ্রীমঙ্গল চা গবেষণা ইনস্টিটিউটের মৃত্তিকা বিজ্ঞানী ড. কামরুল আহসান। চিকিৎসা ক্ষেত্রেও গ্রামের রয়েছে উজ্জ্বল উপস্থিতি। সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের অবসরপ্রাপ্ত অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. কামরুল ইসলাম, রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ইউরোলজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. মো. হাবিবুর রহমান টিটু এবং চর্মরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ফারহানা মায়মুনা এই গ্রামেরই গর্ব।
প্রশাসন, গবেষণা, ব্যাংকিং, আইন, সামরিক ও পুলিশ বাহিনীতেও রয়েছে রতনপুরের মানুষের সাফল্যের ছাপ। দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করছেন এ গ্রামের বহু সন্তান। কেউ দেশেই, কেউ আবার বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিজেদের মেধার স্বাক্ষর রেখে চলেছেন।
এই গ্রামের শিক্ষাবিস্তারেও রয়েছে অনন্য কিছু গল্প। শিক্ষক রজব আলী মাস্টার দীর্ঘদিন ধরে রতনপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করে বহু শিক্ষার্থীকে আলোর পথ দেখিয়েছেন। তার পরিবারও আজ শিক্ষার এক উজ্জ্বল উদাহরণ। তার সন্তানরা দেশ-বিদেশে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করে গ্রামের মুখ উজ্জ্বল করেছেন।
গ্রামের জ্ঞানচর্চার পরিধি বাড়াতে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ‘মাহতাব উদ্দিন স্মৃতি পাঠাগার’। যার প্রতিষ্ঠাতা ড. ফরাস উদ্দিন। বইপড়া ও শিক্ষার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে পাঠাগারটি দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে।
ধর্মীয় সম্প্রীতির ক্ষেত্রেও রতনপুর একটি উদাহরণ। গ্রামে রয়েছে সাতটি মসজিদ ও একটি কালীমন্দির। বহু বছর ধরে হিন্দু ও মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সম্প্রীতির মধ্য দিয়ে বসবাস করে আসছেন। উৎসব-অনুষ্ঠানেও দেখা যায় সেই মিলনের চিত্র।
গ্রামের প্রবীণরা বলেছেন, ‘রতনপুরের সবচেয়ে বড় শক্তি এখানকার মানুষের শিক্ষা ও পারস্পরিক সহযোগিতার মনোভাব। একে অপরের পাশে দাঁড়ানো এবং নতুন প্রজন্মকে এগিয়ে যেতে উৎসাহ দেওয়ার সংস্কৃতিই গ্রামটিকে আলাদা পরিচয় দিয়েছে।’
আসন্ন ঈদুল আজহার পর রতনপুরে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে শিক্ষিত, প্রবাসী, চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী ও কৃতী ব্যক্তিদের এক মিলনমেলা। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ পরিবার নিয়ে অংশ নেবেন এ আয়োজনে। দীর্ঘদিন পর গ্রামের মানুষ আবারও মিলিত হবেন স্মৃতি, গল্প আর ভালোবাসার বন্ধনে।
আজকের রতনপুর শুধু একটি ভৌগোলিক নাম নয়। এটি একটি জীবন্ত ইতিহাস, একটি প্রেরণার গল্প। যে গ্রাম প্রমাণ করেছে, একটি জনপদের আসল সম্পদ তার মাটি নয়, তার মানুষ। আর সেই কারণেই রতনপুরের পরিচয় আজ তার কৃতি, শিক্ষিত ও মানবিক মানুষদের মধ্যেই।






